১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য

এই সময়। গাজী শরিফুল হাসান

শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য

সুরভী এবার এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিন ভাইবোনের মধ্যে সুরভী সবার বড়। লেখাপড়ায় বেশ ভালো সে। সুরভীর বাবা মফস্বলে একটি ছোট চাকুরি করেন। তার স্বল্প উপার্জন দিয়ে তিন সন্তানের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। সরকারি সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে এ পর্যন্ত এসেছে সুরভী। সরকার মেয়েদের শিক্ষা ¯œাতক পর্যন্ত অবৈতনিক ঘোষণা করেছে। সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ সুরভীর মতো অসংখ্য দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। উন্নয়নকে গতিশীল ও টেকসই করতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। গত দশ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ সমতা বিধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপবৃত্তির টাকা অনলাইনে প্রদান করেছে।

সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা আর শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে বাংলাদেশে যা, বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্রছাত্রীর সমতাসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতিকে অন্যদের জন্য উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছে। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক।

মানব সম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ হওয়ায় বাংলাদেশ টেকসই ফল বয়ে এনেছে। লাখ লাখ শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, নারী সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়ায় শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গুণগত মান নিয়ে প্রবেশ করছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও যথাসময়ে পাঠ্যবই বিতরণ শিক্ষার অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশ ঘনত্বের দিক থেকে সবচেয়ে জনবহুল। এখনও ২১ ভাগ লোক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে এবং যারা বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। এরপরও দারিদ্র্যের হার এক-তৃতীয়াংশে কমানো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা বিধান এবং মাতৃমৃত্যু ৪০ শতাংশ কমানোর মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

বিশ্বব্যাংক এক মূল্যায়ণ প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষার বহুমুখী অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে বলেছে, প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হারে শতভাগসহ অন্য শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪৪ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১০ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উপবৃত্তি। উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে অধিক সংখ্যায় নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারের শিশু ও মেয়েদের ভর্তির ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বজনীন অভিগম্যতা অর্জন করে।

এদিকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশের নারীরা এখন অন্যদের জন্য উদাহরণ। মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সবার ওপরে। কেবল তাই নয়, বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেখানে ৪৯ শতাংশ সেখানে বাংলদেশে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই ছাত্রী।
বর্তমান সরকারের সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসঙ্গটি সর্বাগ্রে। প্রাথমিক শিক্ষা যুযোপযোগী না হলে শিক্ষা ব্যবস্থা টেকসই হয় না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১০ বছরে ২৫,২৪০টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় গত ১০ বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার ১০০ শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৭.২ শতাংশ, বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ১০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। গত ১০ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার। শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতির শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে ৮৯২৫টি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আরও একটি যুগান্তকারী সাফল্য হল দেশের শিক্ষার্থীর মাঝে দূপুরের খাবার বিতরণ এবং বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ৬৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ের এক কোটি ৩০ লাখ শিক্ষাথীকে উপবৃত্তি বিতরণ বিশ্বজেুড়ে সুনাম ও খ্যাতি বয়ে এনেছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অবসর সুবিধাবোর্ড থেকে ৫৯ হাজার ৪১৪ শিক্ষক-কর্মচারীকে ২ হাজার ৩৬১ কোটি ৬৭ হাজার ৮৮৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি পূরণ করেছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণি পদমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর সংলগ্ন এলাকায় ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সরকারি) স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশে বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার ৪৫০ জনকে সরকারি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদায়ন করা হয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে দক্ষ করার লক্ষ্যে সারা দেশের মোট ৫,০৯,৫৬৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে মোট ৫৫,০১৭ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশনে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রহণ করেছে। ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট ছিল ১ শতাংশের কম। বর্তমানে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপের ফলে এখন তা দাঁড়িয়েছে ১৫.১২ শতাংশ। ২০২০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষায় ২০ শতাংশ এনরোলমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিপ্লোমা কোর্সে আসন সংখ্যা ১২,৫০০ থেকে ৫৭,৭৮০টি করা হয়েছে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। গড়ে ওঠে নতুন নতুন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ২০০৯ থেকে গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। দেশে নতুন ২২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে Accreditation Council আইন পাস করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে গবেষণা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ৬ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ৬২ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে। ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বজ্ঞান ভা-ারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংযোগ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মেধার মূল্যায়ন তথা স্বীকৃতি হিসেবে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ জন্য গত ১০ বছরে ৫০১ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ প্রদান করা হয়েছে। ১৮৫ জন গবেষককে ইউজিসি স্বর্ণ পদক প্রদান করেছে। প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণ পদক প্রদান করা হয়েছে ৮৫৬ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে।

বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে নয়, মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ উন্নয়নের সব সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য আজ আকাশছোঁয়া। স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে মধ্যম আয়ের কাতারে। আমাদের উচিত হবে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করা।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com