মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:০৭ অপরাহ্ন

শিশুদের ক্লাবফুট বা মুগুর পা : চিকিৎসার মাধ্যমে শতভাগ প্রতিকারযোগ্য

সচেতনতা । সেলিনা আক্তার

শিশুদের ক্লাবফুট বা মুগুর পা : চিকিৎসার মাধ্যমে শতভাগ প্রতিকারযোগ্য

রাজু ও সোনিয়া (ছদ্মনাম)দম্পতির সন্তান আছওয়াদ নাফ বয়স আড়াই বছর। দেখতে অনেক সুন্দর। কিন্তু সে যখন জন্ম নেয় তখন তার পায়ের সমস্যা ধরা পড়ে। সোনিয়া তার বাচ্চার এই অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। পরে ডাক্তাররা তাকে আশ্বস্ত করল যে, এটা কোনো সমস্যা না, আর্থোপেডিক ডাক্তার দেখালেই বাচ্চার পায়ের সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। পরে ওই দম্পতি তাদের সন্তানকে নিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে যান এবং সেখানকার একজন আর্থোপেডিক ডাক্তার দেখান। ডাক্তার বলেন, প্রতি সপ্তাহে প্লাস্টার করাতে হবে এবং পা ঠিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।

প্রকৃতি তার বিচিত্র খেয়ালে প্রাণীকূলকে সৃষ্টি ও প্রতিপালন করছে। মানুষ তার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি হলেও পৃথিবীর সকল জনগোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে একজনকে অন্যজনের কাছ থেকে পৃথক করে রেখেছে প্রকৃতি। মেধা, মনন, গাত্রবর্ণ, আকার কর্মশক্তিত এবং সার্বিক গঠনে এ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। মুগুর পা (ক্লাবফুট) সম্পন্ন শিশুরা জন্মদানে মাতা-পিতার কোনো ভূমিকা না থাকলেও সারা জীবনের জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের বোঝা ভাবা হয়ে থাকে। সমগ্র জীবনে তারা করুণার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুদের জন্মগত ত্রুটিগুলো মধ্যে অন্যতম একটি ত্রুটি হচ্ছে ক্লাবফুট ইংরেজিতে একে সিটিইভি (CTEV) কনজেনিটাল টেলিপেস ইকুইনো ভেরাস বলে। এর ফলে পায়ের একটি অথবা ২টি পাতা গোড়ালির অস্থিসন্ধির হাড়ের অবস্থাগত তারতম্যের জন্য ভিতরের দিক ভাজ হয়ে থাকে। প্রতিবছরই আমাদের দেশে ক্লাবফুট বাচ্চা জন্মগ্রহণ করছে এবং মা-বাবারা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।

জন্মগতভাবে শিশুর পা এমনভাবে বসানো থাকে, যা গল্ফ খেলার স্টিক বা ক্লাবের মতো দেখায়। তাই এর নামকরণ ক্লাবফুট হয়েছে। রোগটি মুগুর পা বা জন্মগত পায়ের পাতা বাঁকা নামেও পরিচিত। সামাজিক কুসংস্কারের ফলে এ অবস্থাকে অভিশাপ ভাবা হলেও এটা কোনো অভিশাপ বা পাপের কারণে হয় না। আমাদের মা-বাবারা ক্লাবফুট বাচ্চাদের সমাজ থেকে আড়াল করে রাখেন সচেতনতার অভাবে। অথচ তাদের আধুনিক ও সহজ চিকিৎসা বিনামূল্যে এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে।

প্রকৃতির বৈরি আচরণের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামরত মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের কল্যাণে এমন শিশুদের জীবনেও এখন হাসি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে নিরলস গবেষণা চালিয়ে প্রখ্যাত মার্কিন চিকিৎসক মহামতি ইগনেসিও পনসেটি এমন শিশুদের লাঞ্ছনা থেকে পরিত্রাণের অতি সাধারণ অথচ বৈপ্লবিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার ফলশ্রুতিতে সমগ্র বিশ্বে জন্ম নেয়া এমন হাজার হাজার বিকলাঙ্গ শিশু মাত্র কয়েক মাসের চিকিৎসায় সারা জীবনের জন্য সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পেয়েছে।

৯৮ ভাগ জন্মগত এই ত্রুটির পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। আর বাকি ২ ভাগ কারণ অন্যান্য। একটি শিশু জন্মের সময় শারীরিক গঠন, কার্যকারিতা বা কোনো অস্বাভাবিকতার জন্য জন্মগত সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে। তবে কিছু বিষয় অনাগত শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে আর তা হলো গর্ভকালীন সংক্রমণ, বিশেষ করে রুবেলা বা জার্মান মিজলস্, সাইটোমেগালো ভাইরাস, টক্সোপ্লাজমা ইত্যাদি জীবাণুর সংক্রমণ। এমনকি সাধারণ জলবসন্তও বাড়িয়ে দিতে পারে এ ঝুঁকি। এছাড়াও নানা রকমের ঔষুধ, অ্যালকোহল ও নেশাদ্রব্যসহ প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং তেজস্ক্রিয়তার ফলে ক্লাবফুট শিশু জন্ম নিতে পারে।

শুধু তাই নয় মায়ের অনিয়ন্ত্রত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা কোনো জটিল রোগ, মায়ের অপুষ্টি, বিশেষ করে ফলিক অ্যাসিড বা আয়োডিনের অভাব, পরিবারে জিনগত রোগ যা রক্তসম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে দেখা দিতে পারে এবং মা-বাবার ক্লাবফুট থাকলে শিশুরও তা হওয়ার আশংকা থাকে। গর্ভকালীন নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্লাবফুট নির্ণয় করা যায়। ক্লাবফুট বাচ্চাদের যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা উচিত। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে সফলতার হার তত বেশি। জন্মের ৩ সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করলে ভাল ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ক্লাবফুট বাচ্চা শনাক্ত করার পর দ্রুত একজন অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তার চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। খুব বেশি ঘাবড়ানো বা বাচ্চাকে আড়াল করার কোনো কারণ নেই। শিশুর এ কারণের জন্য মা-বাবা দায়ী নয়। ক্লাব ফুট চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি, তাই মা-বাবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

মুগুর পায়ের চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ চিকিৎসা না করালে তা সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গতা বা পঙ্গুত্ব বয়ে নিয়ে আসে। এসব শিশু পরবর্তীতে পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যায়। ক্লাবফুট এর প্রকারভেদে এর চিকিৎসাও ভিন্নতর হবে। বর্তমানে Ponseti method খুবই জনপ্রিয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই পদ্ধতিতে সাধারণত ৫-৭টি প্লাস্টার করা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে ১০-১৫টি প্লাস্টার করা হয়ে থাকে। প্রতি সপ্তাহে প্লাস্টার পরিবর্তন করা হয় এবং এর সাথে pirani score করে রাখা হয়। যখন স্কোর কমে অপারেশন এর পর্যায়ে আসে তখন লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে ছোটো একটি অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে মূল চিকিৎসা শেষ হয়।

তারপর বাচ্চাটিকে ৩ সপ্তাহের জন্য একটি প্লাস্টার করে দেওয়া হয়। এরপর বাচ্চাটি চলে আসে মেইনটেনেন্স পর্যায়ে। বাচ্চাটিকে FAB (Foot Abduction Brace) দেওয়া হয় যা প্রথম তিন মাস ২৩ ঘণ্টা এবং পরবর্তীতে রাত্রিকালীন সময়ে ১২ ঘণ্টা করে পরাতে হয়। শিশুর চতুর্থ জন্মদিনে বা চার বছর বয়সের পর FAB আর পরাতে হয় না। তবে নিয়ম মেনে না চললে পূর্বের অবস্থায় চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সার্জারির প্রয়োজন হয়।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার শিশু এ সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং বিশ্বে প্রতি ১০০০ জনে ২/১ জন শিশুর এ সমস্যা হয়। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। ৫০% শিশুর উভয় পায়েই এ সমস্যা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ক্লাবফুটের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া স্বল্পমূল্যেও এর চিকিৎসা করানো সম্ভব। সপ্তাহে মাত্র দেড়শ টাকা ব্যয় করে ৫ থেকে ৬ সপ্তাহ নিয়মিত প্লাস্টার করালে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো শিশুর এ ক্ষেত্রে অস্ত্রপাচার করার প্রয়োজন হয়, তবে সেটির খরচও ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যেই।

এত কিছুর পরও আমাদের সমাজে মুগুর পা নিয়ে জন্মানো শিশু এবং বয়ঃপ্রাপ্তরা সমাজে পরিহাস ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হয়। শৈশব থেকেই তাদের ব্যপারে সমাজে এক ধরণের পৃথকীকরণ শুরু হয় বন্ধুদের সাথে ছুটোছুটি, খেলাধুলা বন্ধের মাধ্যমে। পায়ের ব্যাথার কারণে বেশিক্ষণ হাঁটতে পারে না তারা। চিকিৎসা না করালে এ বিকলাঙ্গতা নিয়ে এবং শিক্ষার অভাবে তারা চাকুরি কিংবা জীবিকা উপার্জনের কোনো সম্মানজনক উপায় খুঁজে পায় না।

নারীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। একটি মেয়ের যত গুণই থাকুক, মুগুর পা তার বিয়ের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে গ্রাম-গঞ্জে অনেক মানুষ আছে, যারা এখনও জানে না বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ক্লাবফুট চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। গ্রামের অনেক পল্লিডাক্তার আছেন, তারা একটা প্লাস্টার করতে অনেক টাকা নেন। এছাড়া শহরের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতেও এর চিকিৎসা ব্যয়বহুল।

বর্তমান সরকার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। ক্লাবফুটের চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ স্বাস্থ্যকর্মী ও সজ্জা সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসায় সফলতার হার অনেক বেশি। ক্লাবফুট শিশু এখন আর পরিবার বা সমাজের বোঝা নয়। এক্ষেত্রে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এদের যথাযথ যত্ন নিলে এবং অভিভাবকরা সচেতন হলে ক্লাবফুট নিয়ে জন্মানো শিশুরাও হতে পারে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com