২৭শে মে, ২০২০ ইং , ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

শিয়া দেশের সুন্নী কবি এবং ষড়যন্ত্রের আখলাকে মুহসিনী কিতাব

শিয়া দেশের সুন্নী কবি এবং ষড়যন্ত্রের আখলাকে মুহসিনী কিতাব

সগীর আহমদ চৌধুরী :: ষোড়শ শতাব্দীর আগে ইরান তথা ফারেস বা ফারস্য আজকের আজারবাইজানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ সুন্নী মতাদর্শ ও ফিকহে হানাফীর অনুসারী রাষ্ট্র ছিল। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে শাহ ইসমাইল প্রথম কর্তৃক সাফাওয়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে স্থানীয় সুন্নী মুসলমানদের ওপর স্পেনিশ স্টাইলে বর্বরতা চালানো হয়, শিয়া মতাদর্শ গ্রহণে বাধ্য করা হয় এবং অস্বীকৃতিতে গণহত্যা চালিয়ে জাতিগত নিধন করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শোড়শ শতাব্দীর পূর্বের ফারিসিয়ান কবি-সাহিত্যক, সুফি, ফকীহ, মুহাদ্দিস ও সাধকগণ ছিলেন সুন্নী, খুব কমসংখ্যকই ছিলেন যারা শিয়া ছিলেন।

বড় দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সাফাওয়ী আমলে সুন্নীদের মূলোৎপাটিত করা হয়েছিল। বর্তমানে ইরানের নব্য সাফাওয়ী আমলে শোড়শ শতাব্দীর পূর্বেকার সুন্নী সুফি-ফকীহ ও কবি-সাহিত্যকদের শিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। পরিকল্পিতভাবে তাঁদের রচনায় মিশেল ঢোকাচ্ছে, নিদেনপক্ষে তাঁদের রচনাগুলো শিয়া আদলে প্রকাশ করছে।অনেকটা ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার করে তৈরি বাংলা ইনজিলের মতো। আহলে বায়তদের নামে যেখানে লেখক ‘রাযিয়াল্লাহু আনহু’ লিখেছেন সেখানে শিয়া চিন্তাধারা অনুযায়ী ‘আলাইহিস সালাম’ লেখা হচ্ছে। এমনই একটি রচনার নাম আখলাকে মুহসিনী।

আখলাকে মুহসিনী হচ্ছে, মোল্লা আলী ইবনে হুসাইন ওয়ায়িয কাশিফী (মৃত: ৯১০ হি.)-এর কিতাব। তাঁর একটি তাফসীরের কিতাব আছে, المواهب العلية নামে। উপমহাদেশে সেটি তাফসীরে হুসাইনী নামে প্রসিদ্ধ ছিল। ফারসি ভাষার এই তাফসীরটি অনেকটা তাফসীরে জালালাইনের মতো। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহ.)-এর ফারসি তারজমা ও মোল্লা ওয়ায়িয কাশিফীর তাফসীরের সমন্বয়ে প্রকাশিত তাফসীরটি মোগল আমলে বেশ জনপ্রিয় ছিল। ঢাকার লালবাগ কেল্লার সংরক্ষণে এর একটি শাহী নুসখা আমি নিজে দেখেছি। সম্ভবত কিতাবটি ঢাকাস্থ মোগল শাসনকর্তারা ব্যবহার করতেন।

মোল্লা ওয়ায়িয কাশিফীর আখলাকে মুহসিনীর উদ্ধৃতি আমাদের আকাবেরে দীনের কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। বহুদিন থেকে কিতাবটি সংগ্রহের চেষ্টা করছিলাম, আল-হামদু লিল্লাহ ইরানে প্রকাশত কিতাবটির একটি আধুনিক নুসখার সফট কপি হাতে পেলাম। একটি উত্তম কিতাব, এতে আছে চরিত্র গঠন ও জীবন বিনির্মাণের অনুপম ব্যবস্থাপত্র। তবে দুঃখ পেলাম কিতাবটির সম্পাদক ভূমিকায় তাঁকে শিয়া সাবিত করার অপপ্রয়াসে এবং কিতাবের প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে বা বিষয় বস্তুর অনুকূলে [] বন্ধনীর ভেতর শিয়া উপাত্ত থেকে বিভিন্ন বক্তব্যের সংযোনে। কিতাবটি কতোটা উপকারী তা অনুধাবনে আমি এখানে লেখকের সূচিপত্র সংযোজন করছি।

পড়ার জমানায় একটা কথা সহপাঠীরা প্রায় বলতো, ‘ফারসি, ধরেছি, ছেড়েছি।’ দুঃখ হয় এখন, কেন ফারসির প্রতি অবহেলা করেছি! কতো জ্ঞান-সম্পদ ও মুক্তো-মণি সেখানে সাজিয়ে রেখে গেছেন পূর্ববর্তী সাধকগণ, আজকে যা বাতিলদের হাতে বিকৃত হতে চলেছে। এই জাতীয় কিতাবগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে মানুষের ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার পাশাপাশি জাগতিক সৌন্দর্য, উন্নত জীবনবোধ ও সভ্য সমাজ গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। এ কিতাবটির বিষয়বস্তুর মধ্যে علوّ همّت, ثبات و استقامت, عدالت , مشاورت و تدبير , حزم و دورانديشى , شجاعت , فراست , رعايت حقوق, سياست, غيرت ইত্যাদি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, এগুলো জাগতিক, উন্নত জীবনবোধ ও সভ্য সমাজ-ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনাপত্র।

লেখক : তরুণ গবেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com