১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১লা সফর, ১৪৪২ হিজরী

শীতের পিঠাপুলিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন

এই সময়। শান্তনু শেখর রায়

শীতের পিঠাপুলিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন

প্রকৃতির অপরূপ ষড়ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বিচিত্র রূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আমাদের এ দেশ। উষ্ণ প্রকৃতিকে দূরে ঠেলে শীত নামে ধীরে ধীরে। শীতের শুরুতে কুয়াশার চাদর ঢেকে দেয় বাংলার পথপ্রান্তর। শিশির ঝরে, পত্র পল্লবে শিহরণ জাগায়। শহরের চেয়ে গ্রামের চেহারা তাড়াতাড়ি পাল্টে যায়। মাঠে, ঘরের আঙিনায় শীকালীন বাহারি শাকসবজির সবুজ সমারোহ মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। বাগানে ফোটে গাঁদা, সূর্যমূখীসহ হরেক রকমের ফুল। এক সময় গ্রামবাংলায় পথে প্রান্তরে দেখা যেতো খেজুর গাছের সমারোহ। শীতের শুরুতেই গাছিদের খেজুর গাছ কাটার ধুম পড়ে যেত। খেজুর গাছ কেটে গাছের সাথে হাঁড়ি বেঁধে রস সংগ্রহ করত তারা। খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। টাটকা খেজুর গুড়ের তৈরি পিঠা পায়েসের স্বাদই আলাদা।

সময়ের সাথে সাথে দেশে অশংকাজনক ভাবে কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। আবহাওয়ার পরিবর্তনে মরে যাচ্ছে অনেক খেজুর গাছ। গৃহ নির্মাণ বা জ্বালানির প্রয়োজন মেটাতেও কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ। খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা গাছিদের সংখ্যাও কমে গেছে। তারা বেশিরভাগই পেশা পরিবর্তন করেছে। তারপরও যশোর, মাদারীপুর, ঝিনাইদহ, রাজশাহীসহ কিছু অঞ্চলে খেজুর গাছ রয়েছে। সেখানকার খেজুর গুড় ও পাটালি রাজধানীসহ সারাদেশে সরবরাহ করা হয়। অনেক ব্যবসায়ীরা শীত মৌসুমে খেজুর গুড় ও পাটালি সংগ্রহ করে রাখে এবং সারা বছর বিক্রি করেন। শীতের পিঠার প্রধান উপকরণ খেজুরের গুড় ও পাটালি।

জরিনা বেগম এবং তার স্বামী ইলিয়াস আলী যাত্রাবাড়ি বাসস্ট্যান্ডের পাশে বেশ কয়েক বছর ধরে শীত এলেই বাহারি পিঠাপুলির পসরা সাজিয়ে বসেন। এক লাইনে সাতটি চুলো বসিয়ে তৈরি করেন ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, পাকান পিঠা ইত্যাদি। চালের গুড়ো, খেজুরের গুড়, নারিকেল, দুধ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় এসব পিঠা তৈরিতে। চিতই পিঠার সাথে শুটকি ভর্তা, ধনে পাতা ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা, বেগুন ভর্তাসহ হরেক রকমের ভর্তা দেয়া হয়। প্রত্যেক দিন বিকেল থেকে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত পিঠা বিক্রি হয়। উপার্জনও হয় বেশ। শীতের মৌসুমে দরিদ্র বা নি¤œ আয়ের নারীদের ভালো রেজগারের ব্যবস্থা হয় পিঠা বিক্রি করে।

আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের এই উৎসব ধরে রাখতে পাড়ায় মহল্লায় এমনিক শহরেও চলছে নানা আয়োজন, পিঠা উৎসব। নতুন ধানের নতুন চালের নানা স্বাদের বাহারি পিঠাপুলি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। প্রত্যেক শীতে গ্রামের বাড়িতে তো বটেই শহরের বাসাবাড়িতেও চলে পিঠাপুলির আয়োজন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শীতের শুরুতেই শহর এলাকায় রাস্তার পাশে নারীরা দুপুরের পর থেকে বাহারি পিঠাপুলি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় অনেক দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান হয়। সামান্য পুঁজিতে এ ব্যবসা করা যায়। শহুরে মানুষের শীতের গ্রামীণ ঐতিহ্যের বাহারি পিঠার স্বাদ আস্বাদনে অনেকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সহজেই যে কোনো মানুষ শীতের এসব পিঠার স্বাদ নিতে পারেন। দামেও কম। পাঁচ থেকে বিশ টাকায় মেলে এসব পিঠা। বাসার পাশে, শহরের পথে পথে বা মোড়ে মোড়ে এসব পিঠাপুলি পাওয়া যায়।
শীতকালই পিঠা খাওয়ার উত্তম সময়। শীতে পিঠা খেতেও খুব স্বাদ। হেমন্তে নতুন ধান ঘরে ওঠে। ধান মাড়াই, সিদ্ধসহ প্রক্রিয়াজাত করা শেষ হতে না হতেই শীত এসে হাজির হয়। হরেক রকম পিঠা বানানো হয় গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। মেহমানেরও কমতি নেই। পিঠপুলির মজা পেতে শহর থেকেও আত্মীয়স্বজনরা গ্রামে বেড়াতে আসে। পিঠা খাওয়া উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে গেলে আরেকটি বাড়তি আনন্দ পাওয়া যায়। গ্রামের পাড়া-পড়শীদের দেখা সাক্ষাত পাওয়ার সাথে সাথে বহু আত্মীয়-স্বজনদেরও একসাথে দেখা পাওয়া যায়। আজকাল মোবাইলের যুগে মুহুর্তেই একটি মিলনমেলা হয়ে যায়, সাথে হয় পিঠা উৎসব।

সারাবছরই কোনো না কোনো ধরনের পিঠাপুলি খাওয়ার রেওয়াজ সেই আদিকাল থেকেই বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে। তবে শীতকালের মতো জমে না। নানী দাদীদের হাতে পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। ভাপাপিঠা, চিতই পিঠা, দুধচিতই, কুলিপিঠা, সমুচাপিঠা, ফুলপিঠা বা নক্সাপিঠা, ঝুরি পিঠা, পাটিশাপটা পিঠা, চুইপিঠা, কলাচুইপিঠা, তালের বড়া, তালের রুটিপিঠা, পাকানপিঠা, গোকুলপিঠা, জামদানীপিঠা, হাঁড়িপিঠা, চাপড়িপিঠা, পাতাপিঠা, জিলাপিপিঠা, রসপিঠা আরো নানা রকম পিঠা। ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির একটা অংশ। আবহমানকাল থেকে চলে আসা পিঠাপুলির উৎসব এবং শতাধিক রকমের পিঠা তৈরির মধ্যদিয়ে এদেশের নারীদের শিল্পী সত্ত্বার পরিচয় মেলে। এদেশের নারীরা কত যে গুণের অধিকারী, ধৈর্য্যশীলা ও কঠোর পরিশ্রমী তার পরিচয় পাওয়া যায় তাদের তৈরি পিঠার নক্সা, রকমারি ডিজাইন ও বানানোর পদ্ধতি দেখলে।
সময়ের পরিক্রমায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পিঠাপুলি আজ শহরে এসে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু শীতকালেই নয়, বছর জুড়েই খেজুর গুড়ের পিঠা শহরে বসে কিনে খাওয়া যায়। ফুটপাত থেকে অভিজাত এলাকায় পাটিসাপটা, চিতই, ভাপা পিঠার মনকাড়া স্বাদ নেয়া যায়। ঢাকার বেইলি রোড, গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় এসব পিঠাপুলি।

রাস্তার ধারে গরিব নারী-পুরুষ এ পিঠা তৈরি করে বিক্রি করে। শীত মৌসুমে ভালোই চলে পিঠার ব্যবসা। ধনী, গরিব, ছাত্র-ছাত্রী, রিক্সাওয়ালা অনেকেই এসব পিঠা সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার বা বিকালের নাস্তা হিসেবে খেতে পছন্দ করে। এ সময় পরিবার পরিজন নিয়ে পিঠা বিক্রয়ের আয় দিয়েই চলে অনেকের সংসার। এতে আরেকটি লাভও হয়। এ সময় ফাস্ট ফুডের দিকে ঝোঁক সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কম দেখা যায়।
প্রতি বছরই ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, এনজিও এসব পিঠামেলার আয়োজন করে। এসব মেলায় লোকের ভিড় থাকে প্রচুর। নক্সিপিঠা, ঝুরিপিঠা, নারকেলের লাড্ডু, বরফীপিঠা বিদেশেও যায়। তবে তা বাণিজ্যিকভিত্তিতে নয়। আমাদের দেশের নানারকম পিঠা কয়েক মাস সংরক্ষণ করা যায়। সেসব পিঠা বাজারজাত করাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব।

আমাদের দেশের মেলাগুলোতে পিঠার উৎসবে অনেক বিদেশিদের দেখা যায় মজা করে পিঠা খেতে। নক্সা করা পিঠার বাহারি ডিজাইন দেখে তারা অবাক হয়। বাংলাদেশের গ্রামের গরিব নারীরা এত সুন্দর নক্সা করতে পারে, সুস্বাদু পিঠাপুলি তৈরি করতে পারে। দেশ বিদেশে পিঠা শিল্পের বাণিজ্যিকিকরণ করতে পারলে দেশের সুনাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দরিদ্র বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের মধ্যদিয়ে তাদের জীবন মানেরও উন্নতি ঘটবে।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com