২৫শে নভেম্বর, ২০২০ ইং , ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৯ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

সদা প্রাণবন্ত যে মসজিদ | তানজিল আমির

বছর ঘুরে আবার এলো বিশ্ব ইজতিমা।বিশ্ব মুসলিমের ঈমানী এ মিলনমেলাকে উপলক্ষ করে গোটা বাংলাদেশে বিরাজ করে ঈমানী আবহ। লাখো মানুষের এ সম্মেলন টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হলেও মূলত তা পরিচালিত হয় কাকরাইল মসজিদের দিকনির্দেশনায়। তাবলীগ জামাতের বাংলাদেশের মার্কাজ (প্রধান কেন্দ্র) এ মসজিদটিই।

কাকরাইল মসজিদটি দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে বিভিন্ন কারণে অতি সুপরিচিত। এর নাম কাকরাইল মালওয়ালি জামে মসজিদ। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সাল তারিখ পাওয়া না গেলেও এটি নির্মাণের ব্যাপারে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। কাকরাইল মসজিদের মুরুব্বিদের কাছ থেকে জানা যায়, বর্তমান মসজিদ নির্মাণের পূর্বে এখানে নবাব পরিবারের নির্মিত স্বল্প পরিসরে একটি মসজিদ ছিল। যার অস্তিত্ব এখন নেই।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন বলেন, তিনি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওসমান গনি-এর কাছে থেকে শুনেছেন এ মসজিদ নির্মাণে উদ্যোগী ছিলেন প্রখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ডা. টি আহমদ ও সমমনা কতিপয় ব্যক্তি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের অনুমতি ও জায়গা চেয়ে আবেদন পাঠানো হলে দীর্ঘদিনেও কোনো অনুমতি পাওয়া যায়নি। সরকারের অনুমতি ছাড়াই এক রাতেই শতাধিক লোক মিলে চারদিকে ইটের গাঁথুনি, বাঁশ ও টিন দিয়ে সেখানে তারা মসজিদ তৈরি করে ফজরের নামাজও আদায় করেন। বিষয়টি সরকারের নজরে এলে ডা. টি. আহমদ ও তার সহযোগীদের কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। পরে তিনি উকিলের মাধ্যমে জবাব দিলেন All land belongs to Almighty Allah, and as such, the construction of House of Allah, in the land of Allah, does not require the permission of anybody. পরে এ বিষয়টি নিয়ে আর কেউ উচ্চ বাচ্চ্য করেনি। এভাবেই কাকরাইল মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মার্কাজ হিসেবে বিশ্বব্যাপি পরিচিতি লাভ করেছে।

ষাটের দশকে কাকরাইল মসজিদের মুরুব্বিগণের সমন্বয়ে ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজি আব্দুল মুকিত সাহেবের তত্ত্বাবধানে তিন তলা মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন। দুই একর জমিতে তিনতলা মসজিদ, পাঁচতলা মাদরাসা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।

স্থাপত্য : বর্তমান মসজিদটি অন্যান্য মসজিদ থেকে একটু নান্দনিক ও আকর্ষণীয় নকশায় তৈরি। এ মসজিদ নির্মাণের স্থাপত্য নিদর্শন দেখলে মনে হবে ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজি আব্দুল মুকিত সাহেব মনপ্রাণ ঢেলে মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। মসজিদের ছাদ সংলগ্ন ত্রিভুজ আকৃতির নকশা রয়েছে।

পিলারগুলো চৌকোণা আকৃতির। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালটি ঢেউ খেলানো। এছাড়াও মসজিদটির তিন দিকে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর পাশে রয়েছে ওজুখানার জন্য ছোট্ট দুইটি পুকুরসাদৃশ্য হাউজ। এ পুকুরের চতুষ্পার্শে শতাধিক লোক একত্রে ওজু করতে পারেন। মসজিদের বাইরে রয়েছে ওজুখানা। মসজিদ থেকে একটু দূরে উত্তর পাশে প্রশ্রাব ও বাথরুমের জন্য রয়েছে দোতলা একটি ভবন। তবে এই মসজিদের বাহ্যিক কাঠামো চমৎকার হলেও এর ভেতরে তেমন কোনো জৌলুস নেই।

তাবলিগ জামাতের (প্রধান কেন্দ্র) হিসেবে বিশ্বজোড়া পরিচয় থাকলেও মসজিদটি একেবারেই সাদামাটা। নেই সুউচ্চ মিনার। মিনারের চূড়ায় আর সব মসজিদের মতো চারমুখী মাইক নেই। সারি সারি এয়ারকুলার বা দামী ফ্যান নেই। নরম গালিচা, ঝাড়বাতি, অজুখানা কোনো কিছুতেই বিলাসিতা নেই।
সব মসজিদে বেতনধারী ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম থাকলেও এই মসজিদে নেই। তাবলিগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই পালাক্রমে এ দায়িত্ব পালন করেন। তাবলিগে অংশগ্রহণকারীদের জন্য মসজিদ আঙিনায় প্রতিদিন যিনি খাবার রান্না করেন তারও কোনো বেতন নেই। এই মসজিদের সবথেকে বড় ব্যতিক্রমটা হল, এটির কোন দরজা নেই। রাত দিন খোলা সবার জন্য। এমন আরও নানা কারণে এই মসজিদটি অন্য মসজিদগুলা থেকে ব্যতিক্রম|

এ মসজিদ থেকে সারা বিশ্বে ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম তাবলিগ জামায়াতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তাবলিগ জামায়াতের মূল কথা হলো: নিজে সৎকর্ম করা ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকা এবং অন্যকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা। তাবলিগের জন্য বিভিন্ন সময়ে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যেহেতু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে আর কোনো নবী আসবেন না, তাই এ দাওয়াতের কাজের দায়িত্ব তার উম্মতকে দেয়া হয়েছে।

সমস্যা : বিশ্ব ইজতেমাসহ বিভিন্ন সময়ে কাকরাইল মসজিদে অতিরিক্ত মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। অনেক সময়েই জায়গার সংকুলান হয় না। সরকারের কাছে মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য জায়গা চাওয়া হলেও সরকার তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। অথচ গত ত্রিশ বছর ধরে মসজিদ সংলগ্ন পশ্চিম দিকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়ে আসছেন। যেহেতু তাবলিগের কাজটি একটি আন্তর্জাতিক কাজ। অনতিবিলম্বে মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিতে সর্বস্তরের মুসল্লিগণ জোর অনুরোধ জানিয়েছেন। বর্তমানে মূল ভবনের পাশে খানার যে জায়গাটি ছিলো ,সেখানে নতুন ভবনের কাজ শুরূ হয়েছে। তবু বাংলাদেশের মারকাজ হিসেবে এতটুকু জায়গা পর্যাপ্ত নয়।

বিভিন্ন কার্যক্রম : মসজিদে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাবলিগ জামায়াতের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফজরের নামাজের পর এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিশেষ বয়ান। এরপরই মুসল্লিদের নিয়ে হেদায়েতের বয়ান। তাবলিগ জামায়াতের কাজ কিভাবে করবে সে বিষয়ে হেদায়েতের বয়ানের মাধ্যমে দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়। দোয়া, তালিমে বসা, জিকির করা, নামাজ পড়া, খেদমত করা এবং মহল্লার লোকজনকে মসজিদে এনে তাবলিগের কাজে উদ্বুদ্ধ করা। সব শেষে দোয়া ও মোসাফা করে তাদের নির্ধারিত স্থানে জামায়াত নিয়ে যাওয়া। এ হেদায়েতের বয়ানে যারা জামায়াত থেকে ফিরে আসবে, তাদের কাজের বিষয়ে বিস্তারিত শোনা এবং তারা স্ব স্ব এলাকায় গিয়ে কিভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেয়া। জোহরের নামাজের পরে তালিম। তালিমের মধ্যে তিনটি বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১। কিতাব/ হাদীস থেকে পড়া (ফাজায়েলে আমল ও মুন্তাখাব হাদীস) ২। সুরা-ক্বেরাতের মশ্ক করা। ৩। ছয় নম্বরের/ ছয়টি গুণের ওপর আলোচনা। গুণ ছয়টি: কালিমা (ঈমান), সালাত (নামায), ‘ইল্ম (জ্ঞানচর্চা) ও জিকর, ইকরামূল মুসলিমীন (মুসলমানদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য), ইখলাসে নিয়ত (সংকল্পের একনিষ্ঠতা) এবং তাবলিগ।

এ ছয়টি গুণ নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করা। আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত দ্বীনের কাজের জন্য উত্সাহ বিষয়ক বয়ান। বাদ মাগরিব সূরা ইয়াছিন পড়ে ইজতেমায়ি দোয়া, যারা জামায়াত থেকে ফিরেছে তাদের থেকে কারগুজারি শোনা এবং তাদের কাজের ধরন জানা। মাগরিবের পরে কাকরাইলে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষায় বয়ান বুঝিয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশি লোকদের সাথে মিলিয়ে দেয়া এবং যে সব মাসতুরাত জামায়াত রয়েছে সে সব জামায়াতের মহিলা সদস্যদের আগত মেহমানদের ভাষায় পর্দার আড়ালে রেখে মাইকের মাধ্যমে বয়ান শোনানো হয়। এশার নামাজের পরে হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থ থেকে পড়ে শুনানো হয়। দোয়া শেষে সবাই বিশ্রামে চলে যায়।

বিদেশি মেহমান : কাকরাইল মসজিদের বিদেশি মেহমানদের জন্য রয়েছে থাকা খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা। বিশ্ব ইজতেমার সময়ে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার বিদেশি মেহমান এ মসজিদে অবস্থান করেন। বছরের অন্যান্য সময়ে এক থেকে দুই শতাধিক বিদেশি মেহমান থাকেন। বিদেশি মেহমানদের থাকা খাওয়ার বিষয়টি মসজিদের মুরুব্বিদের মাধ্যমে পরিচালিত ও মুসল্লিগণের স্বেচ্ছাশ্রমে হয়ে থাকে। বিদেশি মেহমানদের মসজিদে আনা-নেয়ার জন্য রয়েছে ভাড়াবিহীন একাধিক মাইক্রোবাস।

মাদরাসা : পাঁচতলা ভবনে কাকরাইল মসজিদের মাধ্যমে একটি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্রদের থাকা-খাওয়া ও পড়ালেখার যাবতীয় খরচ মসজিদের মুরুব্বিদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। ছাত্রদের পড়ালেখার ব্যাপারে নিয়োজিত শিক্ষকগণ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। কায়দা থেকে মেশকাত শরীফ পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থা রয়েছে। মাদ্রাসায় একশো বিদেশি ছাত্রসহ মোট তিন শতাধিক ছাত্র রয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য হাদীস, কুরআন ও তাফসিরসমূহ সরবরাহের জন্য মসজিদের একটি লাইব্রেরি রয়েছে।

পরিচালনা কমিটি : ১৯৪৬ সালে মাওলানা আব্দুল আজিজ কলকাতা থেকে বাংলাদেশে তাবলিগের কাজ নিয়ে আসেন। শুরু থেকে কাকরাইল মসজিদে তাবলিগের কাজ পরিচালনার জন্য রয়েছে ছয় সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। মাওলানা আব্দুল আজিজ, মাওলানা মুনির আহমদ শাহ, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, দাদা ভাই, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মুকিত ও মাওলানা আলী আকবর এবং কমিটিতে ছিলেন ১৫ জন শুরা সদস্য। বর্তমানে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা ওমর ফারুকসহ অন্যান্য আলেম ও শুরাদের পরিচালনায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com