২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি

সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় জ্বালানি নিরাপত্তা

এই সময় । মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন

সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় জ্বালানি নিরাপত্তা

স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি, স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ তেল কোম্পানি শেল অয়েল এর নিকট থেকে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র- তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ও বাখরাবাদ নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তরের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়ার পর থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানির উৎপাদক হিসেবে এ গ্যাসক্ষেত্রগুলো অদ্যাবধি দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতুলনীয় ভূমিকা রেখে চলছে। বর্তমানে এ গ্যাসক্ষেত্রগুলো হতে মোট সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা এবং দেশের জনগণের সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জাতির পিতার দারিদ্র্যমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি চতুর্থ বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করে বর্তমান সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নতুন নতুন জ্বালানির উৎস উদ্ভাবন, জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

করোনাকালীন সময়ে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎসহ শিল্প কারখানা চালু রেখে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে পেট্রোবাংলা ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। বিশেষত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাস নির্ভর হওয়ায় এর যোগান অব্যাহত রাখাই ছিল একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার ওপর পেট্রোবাংলা ও এর আওতাধীন বিশেষায়িত কোম্পানিসমূহ নিরলসভাবে কাজ করছে। জ্বালানি খাতে সরকারের বর্তমান মেয়াদে (জানুয়ারি, ২০১৯ হতে ডিসেম্বর, ২০২০) অর্জন নিম্নে তুলে ধরা হলো:

নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের লক্ষ্যে সরকারের বর্তমান মেয়াদে ২টি অনুসন্ধান কূপ, ১টি উন্নয়ন কূপ ও ৭টি ওর্য়াকওভার কূপ খনন করা হয়েছে। ২০১৯ হতে ২০২০ সময়কালে বাপেক্স ২,৬৯০ লাইন কিঃমিঃ ২ডি সাইসমিক সার্ভে, ২৬০ বর্গ কিঃমিঃ ৩ডি সাইসমিক সার্ভে ও ১৭৩ লাইন কিঃমিঃ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন করে ২টি নতুন স্ট্রাকচার চিহ্নিত এবং শ্রীকাইল ইস্ট নামে একটি নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের পর তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী গৃহীত কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে দেশীয় উৎপাদিত গ্যাস ও আমদানিকৃত এলএনজিসহ বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক কমবেশি ৩,৭৫২ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে প্রায় ৪৩ লক্ষ গ্রাহকের নিকট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে, যেমন : বেজা, ইপিজেড, বিসিক ইত্যাদিতে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে গ্যাস অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি নিরসনের লক্ষ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) এর পাশাপাশি দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন অপর একটি FSRU হতে ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ তারিখ হতে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্যাস গ্রীডে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে।স্পট মার্কেট হতে এলএনজি আমদানির লক্ষ্যে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পেট্রোবাংলার সাথে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের MSPA স্বাক্ষরিত হয়েছে। সরকারের অনুমোদন অনুযায়ী কক্সবাজারের মাতারবাড়ি এলাকায় দৈনিক ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন ১টি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম চলমান আছে।

দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে প্রাপ্ত গ্যাস কনডেনসেট সমৃদ্ধ হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রে শুরু হতে ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন জাতীয় পেট্রোলিয়াম পদার্থ উৎপাদন করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ৩টি কোম্পানির ৬টি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে প্রক্রিয়া করে ২০১৯ হতে ২০২০ সময়ে মোট ২৩,৪০,৭৮২ ব্যারেল পেট্রোল, ৬,১১,৭৬৫ ব্যারেল ডিজেল, ২,৬৮,৭৪৯ ব্যারেল কেরোসিন এবং ৮,৮৩৩ মেট্রিক টন এলপিজি উৎপাদন করা হয়েছে। বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে লিকুইড রিকভারী ইউনিট (এলআরইউ) স্থাপনের ফলে প্রাপ্ত বর্ধিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণের জন্য রশিদপুরে এসজিএফএল কর্তৃক দৈনিক ৪,০০০ ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম জুন, ২০১৯ মাসে সম্পন্ন হয়েছে।

বাংলাদেশে এযাবৎ ৫টি কয়লা ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে যার মোট সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ প্রায় ৭,৯৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লা খনি বড়পুকুরিয়া থেকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি লংওয়াল টপ কোল কেভিং (এলটিসিসি) পদ্ধতিতে গড়ে দৈনিক প্রায় ৩,০০০-৩,৫০০ মেট্রিক টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। এ খনি থেকে ২০১৯ হতে ২০২০ সময়কালে উত্তোলিত ১৫,১৫,৯৫৬ মেট্রিক টন কয়লার সমুদয় অংশই খনি মুখে স্থাপিত পিডিবি’র আওতাধীন ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কোল বেইজড পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। কয়লার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করে এ খনি হতে কয়লার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যমান খনিটি উত্তর ও দক্ষিণাংশে বর্ধিতকরণের নিমিত্ত পরিচালিত স্টাডি প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে এবং দীঘিপাড়া কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রকল্প মার্চ, ২০২০ মাসে সমাপ্ত হয়েছে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ আগ্নেয় শিলা খনি। ২০১৯ সালে এ খনি থেকে প্রায় ৮.৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদন এবং ৬.৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর বিক্রয় করে এমজিএমসিএল এর রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা। অপরদিকে, ২০২০ সালে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে খনি থেকে প্রায় ৮.৩০ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদন এবং ১১.৯০ লক্ষ মেট্রিক টন পাথর বিক্রয় করে এমজিএমসিএল এর রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ২৫১ কোটি টাকা। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে এমজিএমসিএল ২০১৯ ও ২০২০ সালে সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে মহীসোপানসহ ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের আইনগত স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে।বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় ২২টি ব্লকে মোট ৩২,০০০ লাইন কিলোমিটার 2D Non-Exclusive Multi-Client Seismic Survey পরিচালনার জন্য TGS-SCHLUMBERGER JV এবং পেট্রোবাংলার মধ্যে গত ১১ মার্চ, ২০২০ তারিখ একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় অফশোর মডেল পিএসসি-২০১৯ এর আওতায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে “বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২০” আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নতুন বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করা হবে।

প্রতি বছর গ্যাস খাত হতে সরকারি কোষাগারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ যোগান দেওয়া হয়ে থাকে। ২০১৯ হতে ২০২০ সময়কালে সিডি/অন্যান্য, ডিএসএল, লভ্যাংশ, আয়কর ও এসডি ভ্যাট ইত্যাদি বাবদ সরকারি কোষাগারে ১৪,৪০৩ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী- এ ঐতিহাসিক দুর্লভ মুহুর্তে সুখী, সমৃদ্ধ, কল্যাণমুখী ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে দিনবদলের সনদ রূপকল্প ২০২১ সফলভাবে বাস্তবায়ন, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ২০৪১ সালের মধ্যে জাতির পিতার আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : কলামিস্ট

১১.০১.২০২১

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com