২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

সহজিয়া কবিতা ও প্রেমের মুগ্ধস্রোত ‘ক্যাকটাস’

সহজিয়া কবিতা ও প্রেমের মুগ্ধস্রোত ‘ক্যাকটাস’

আদিল মাহমুদ ❑ ক্যাকটাস। একটি কাব্যগ্রন্থের নাম। লিখেছেন তকিব তৌফিক। যাকে আমি তরুণ কথাসাহিত্যিক হিসেবে চিনি। তবে তিনি যে কবিতা লেখেন সেটাও জানি। ফেসবুক ও বিভিন্ন সাহিত্য পোর্টালে তাঁর কিছু কবিতা পড়েছি। এখন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ক্যাকটাস’ পড়ে কবিস্বভাবটাও আমার কাছে পরিস্কার হয়েছে। ‘ক্যাকটাস’ এ জলের মতো সহজ ও বিপুল সুন্দরের অনুভবে তিনি গড়ে তোলেছেন কবিতার ইমারত। শুরুতে চলুন তকিব তৌফিকের ছোট দু’টি কবিতা পড়ি—

১.
একদিন সব অবহেলা
দিগুণ করে তোমায় তাড়া করবে,
আমি কি তাকিয়ে থাকবো?
না, আমি আবার সব অবহেলা আগলে নেব।
আমি আবার অবহেলিত হবো,
তবুও অনন্ত তুমি ভালো থাকো।

সেদিনও বলবো না
আমাকেই ভালোবাসতে হবে
বলবো না তোমাকে
আমার এই হাতটাই ধরতে হবে।

আমি তোমার প্রতি যে শ্রদ্ধা রাখি
রাখি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা
সেটুকুর জোরেই—
তোমাকে আমি আগলে রাখবো।
[গ্রহণ/ পৃষ্টা ৫৩]

২.
এই তো সেদিন
এমন— ই এক উজ্জ্বল চাঁদ
শেষবার দেখেছিলাম দু’জনে
সেদিনও ভাবিনি এভাবে বিচ্ছেদ হবে!
ঠিক আলাদা আলাদা মন
আহা প্রিয়তম প্রিয়জন
ব্যথাতুর গুঞ্জন।

এখন আমাদের
একসাথে চাঁদ দেখার নেই সাধ
আমরা একে অন্যের জন্য
একেবারেই ব্যাকুল নই— নই উন্মাদ।
সব আজ আলাদা আলাদা
চাঁদনি রাত, সোনালী প্রভাত
এমন কি— দু’জনের এখন আলাদা দু’টো ছাদ।
[পৃথক/ পৃষ্টা ৫২]

তকিব তৌফিক তাঁর কাব্যগ্রন্থে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, দ্রোহ-প্রেম ও সমাজচিত্র কথা বলেছেন অবলীলায়। কবিতার মাধ্যমে তিনি কখনো আমাকে আচ্ছন্ন করছেন নিদারুণ মানবিকতায়, কখনো কাতর করেছেন দ্রোহে ও দেশাত্ববোধে, আবার কখনো প্রেমের মায়ায়। তাঁর প্রেমের কবিতা মানেই মনের মধ্যে উথাল-পাতাল ঢেউ, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, কল্পনার ফানুস উড়িয়ে প্রেয়সীর ঠোঁটে চুমু খাওয়া কিংবা মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকা কয়েক ঘন্টা। কবির এক একটি প্রেমের কবিতা এক একটি আকাঙ্ক্ষার নাম, যে আকাঙ্ক্ষা গোগ্রাসে গিলে খায় একের পর এক অমীয় কবিতার পাতা। কবির ভাবনার জগতে আপনাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেমের কিছু কবিতার কবিতাংশ উল্লেখ করছি—

ক. হারিয়ে ফেলার চেয়ে/ হারিয়ে ফেলবো সেই শঙ্কা গুরুতর,/ হারিয়ে ফেলা না জানি/ আঘাত হিসেবে কতটা বড়সড়। [ক্যাকটাস/ পৃষ্টা ৮]
খ. আমার এই স্পর্শ যদি তোমাকে পবিত্র রাখে,/ বুঝে নিও এই ভালোবাসা সমৃদ্ধ/ শুধু আমাদের এক থাকাটাই হবে না। [প্রেমাধিকার/ পৃষ্টা ২১]
গ. তবুও তো আমার জানা দরকার/ একটা মানুষকে আঘাত দেয়া যায় কতোবার!/ শুরুই যদি নাই বা থাকে/ তবে আর কিসের উপসংহার। [সমাপ্তি/ ২৭]
ঘ. আমি ছুঁয়ে দিলেই পাপ হয় ভাবো/ ছুঁয়েছি মানেই নয় ছুঁড়ে ফেলে দেব/ আল্পনা আঁকি না ক্ষনস্থায়ী তাই/ স্থায়ীভাবে তোমাকেই আল্পনা করে নেব। [স্পর্শ/ ৩২]
ঙ. যেখানেই যাই, যতদূর আমি যাই/ তুমি ভাসাও আমাকে/ ভালোবাসার ঝর্ণাধারা হতে/ নির্গত ভালোবাসার অঝোরধারায়। [পরাস্ত/ পৃষ্টা ৪২]
চ. তুমিও কী আর প্রেম বুঝবে!/ তুমিই বা আর কী প্রেম ব্যাখা করবে!/ তুমি মোহ, তুমি ঘোর/ তুমি বদলাও খুব/ বদলানোতেই রবে। [অনুরোধ/ পৃষ্টা ৫১]
ছ. চলো ভালোবাসি, ভালোবাসি/ যেভাবে সবাই ভালোবাসে/ সেভাবে নয়/ সেভাবেই ভালোবাসি/ যেই ভালোবাসা সবার চেয়ে/ আলাদা হয়/ চলো, ভালোবাসি, ভালোবাসি। [চলো ভালোবাসি/ পৃষ্টা ৬৭]
জ. এই বৃষ্টি মানেই তোমার স্মৃতি/ স্মৃতি হয়ে আমার পাশে রয়/ তুমি নাই ভেবে হন্ন হলে/ বৃষ্টিই হয় আমার অভয়।
ঝ. দু’হাত জুড়ে কাঁচের চুড়ি/ অঙ্গে তোমার জামদানি/ আমি কিন্তু বেলী ফুল হাতে/ ভীষণরকম প্রেমটুকু জানি। [ভয়ঙ্কর প্রেমানুভূতি/ পৃষ্টা ৯১]
ঞ. এখন এই স্পর্শে অপবিত্রতা/ তুমিও বেশ গোছানো হয়েছো দেখি/ এখন খুব মেনে চলো সমাজ-সভ্যতা। [প্রাক্তন প্রিয় হাত/ পৃষ্টা ৯৬]

৯৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে আছে ৬০টির বেশি কবিতা। সবগুলো ভালোলাগার, ভালোবাসার। তবে কবির ‘সংসার’ কবিতাটি আমাকে অভিভূত করেছে। ভাবিয়েছে এবং দুলিয়েছে। মধ্যবিত্ত সংসারের নিরব হাহাকার, বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্ট, জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও সাংসারিক প্রেমের চিত্র সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই কবিতায়। একটু পড়ে নেয়া যাক তাহলে—

‘হয়তো অনেক টাকার প্রসাধনীতে
সাজবে না তোমার আদল
যে টাকায় আমি বাসায় ফিরবো
তাতে জুটবে চোখের কাজল।
তুমি তো কাজলই বেশি ভালোবাসো।

টানাপোড়েনর সংসারে পার্টি ড্রেসে টাকা জুটিয়ে নিতে
যদি ব্যর্থই হই; তাতে কিই বা যায় আসে?
শাড়ীতেই তো তোমকে মানায়
বাঙালী নারী তুমি, শাড়ীতেই মানানসই।’

‘ক্যাকটাস’ পড়ে মনে হয়েছে ‘তকিব তৌফিক’ দীর্ঘ কবিতায় অভ্যস্ত। রহস্যলোক, গভীরতর বোধ, প্রকাশবৈচিত্র্য ও শব্দের দারুণ ব্যঞ্জনায় এসব দীর্ঘ কবিতা যেকোন পাঠকের মন জয় করবে। ‘বেপজা গেইট’, ‘সাবলেট’, ‘প্রেমাধিকার’, ‘দীর্ঘশ্বাস’, ‘নব’, ‘নিবন্ধিত প্রেম’, ইত্যাদি তাঁর সংক্ষিপ্ত কবিতা ভিন্ন ভিন্ন নাম। এসব কবিতায় তিনি প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্য, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অনুভূতি তুলে ধরেছেন নতুন নতুন আঙ্গিকে।

‘ক্যাকটাস’ মনে হয় ‘তকিব তৌফিক’ এর পঞ্চম বই ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এতে তিনি বেশ ভালো ভালো কবিতা লিখেছেন। তবে আমার কাছে কিছু কিছু কবিতায় কবির শব্দের ব্যবহার জুতসই মনে হয়নি, সেই সাথে প্রচুর অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহারও করেছেন তিনি। শেষমেশ একজন পাঠক হিসেবে কবির জন্য রইলো কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

নোট: ‘ক্যাকটাস’ প্রকাশ করেছে ‘পুস্তক প্রকাশন’। প্রকাশক ‘মাজহারুল ইসলাম সালমান ফারসী’। প্রচ্ছদ করেছেন ‘সাহাদত হোসাইন’। ৯৬ পৃষ্টার এই বইয়ের মুদ্রিত মূল্য ২০০ টাকা। বইটি সংগ্রহ করতে পারেন বাতিঘর, রকমারি, বুকমার্ক, বইঘর ইত্যাদি থেকে। এছাড়া ৩৫% ছাড়ে অর্ডার করতে ইনবক্স করুন পুস্তক প্রকাশনের ফেসবুক পেইজে। ধন্যবাদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com