শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৯ অপরাহ্ন

সাংবাদিকতাও নবীওয়ালা কাজ

সাংবাদিকতাও নবীওয়ালা কাজ

ড. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ : সাংবাদিকতাকে আমরা একটা আধুনিক পেশা হিসাবেই জানি; যা প্রধানত ইহজাগতিকতা নিয়েই বৃত্তায়িত হয় এবং তার নেই কোন পারলৌকিক সংশ্লিষ্টতা। কিন্তু আপনারা জেনে হয়ত অবাক হবেন, এই সাংবাদিকতার মূল রচয়িতা হলেন আমাদের ধর্ম বিধাতা। হ্যাঁ, আমিও জেনে অবাক হয়েছি যে, সাংবাদিকতাটা শুধুমাত্র ইহলৌকক পেশা নয়, এটা হলো একটা ধর্মীয় পেশা। তাই এটা শুধু সুনাম, খ্যাতি ও টাকা কামাইয়ের পেশা নয়, বরং এটা বিশাল সাওয়াব বা ঐশী পুরস্কার লাভেরও পেশা। কারণ, এটা ছিলো নবীদের পেশা।

কীভাবে? শুনুন তাহলে এবার : আরবিতে সংবাদকে বলা হয় ‘নাবা’। পবিত্র কুরআনের তিরিশ পারার প্রথম সূরার নাম হলো- ‘সূরাতুন নাবা’ বা সংবাদের সূরা। এ শব্দ থেকেই এসেছে ‘নবী, যার মানে হলো- সংবাদ বাহক বা ‘সংবাদদাতা’। আর ‘সংবাদদাতা’ তাদেরকেই বলে যারা সাংবাদিকতা করেন। আল্লাহ পাক মানুষের মধ্য থেকে বাছাই করা যোগ্যতা সম্পন্ন লোকদেরকেই নির্বাচন করেছিলেন সংবাদদাতা হবার জন্যে এবং এদের নাম দিয়েছেন নবী বা রাসূল। রাসূল শব্দটার সাথেও সংবাদ বহনের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।

আল্লাহর নবী ও রাসূলরা ছিলেন আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে নিয়োজিত মুখপাত্র ও সংবাদদাতা। এই সংবাদ দেওয়া বা সংবাদ প্রচার করা শুধু তাদের পেশা ছিলো না, এটা ছিলো তাদের (নবীদের) নেশা ও মিশন। আধুনিক যুগের সাংবাদিকেরা হয়ত বেতন-ভাতার বিনিময়ে বা কেউ কেউ সুনাম ও খ্যাতির জন্যেও সাংবাদিকতা করেন। কিন্তু আল্লাহ পাকের পাঠানো নবী-রাসূল (সংবাদ দাতারা) দুনিয়ার কারো কাছ থেকে কোন প্রকার প্রশংসা, সুনাম ও টাকার জন্যে এই পেশায় আসেননি। আল্লাহর দেওয়া এই দায়িত্ব পালনের জন্যে তারা কারো কাছ থেকে কোন বেতন-ভাতা এমনকি কোন উপহার নেওয়া তো দূরের কথা, তা কামনাও করেননি। নবীরা এতো মহান ছিলেন যে, তারা যদি কাউকে কিছু খাওয়াতেনও, তখন বলতেনঃ “আমরা তো আপনাদেরকে খাওয়াই আল্লাহ পাককে খুশী করার জন্যে। আপনাদের কাছ থেকে এর জন্যে কোন প্রতিদান বা ধন্যবাদও আশা করি না” (সূরা ইনসানঃ ৯)।

তবে, নবীদের সাংবাদিকতার বিষয়, ধরন ও পদ্ধতি ছিলো আলাদা। সেখানে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংবাদ ছিলো। কিন্তু সবই ছিলো সত্য, নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য। সেই সংবাদগুলো পরিবেশনার ছিলো গভীর মর্ম ও উদ্দেশ্য। তার ভাষা ও ব্যঞ্জনা ছিলো ইতিবাচক ও গঠনমূলক। তাদের সংবাদে ছিলো নতুনত্ব, বৈচিত্র ও ভারসাম্য। তা ছিলো জীবনের একেবারেই বাস্তব ও নিটুট চিত্র। পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে সংবাদ আমাদের কাছে এনেছেন তা গভীর ও নিরপেক্ষ মন নিয়ে পড়লে দেখা যাবে যে, সেখানে এই দুনিয়ার সকল বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। তবে তা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ক। আজকের সংবাদপত্রের পাতায় কোন প্রেমের কাহিনী পড়ে দেখুন আর সূরা ইউসুফের প্রেমের গল্প পড়ে দেখুন। বিস্ময়করভাবে, আল্লাহ পাক সেখানে এমনভাবে যৌনতার বিবরণ দিয়েছেন যে ঘটনার মূল আবেদন একেবারেই চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছে, কোন প্রকার প্রকাশ্য নগ্নতার আচড় ছাড়াই।

এসব কিছু বিবেচনা করে আধুনিক যুগের ইসলামী স্কলাররা সাংবাদিকতা ও মিডিয়ায় কাজ করাকে ফরজ বলে অভিহিত করেছেন। বুখারী শরীফে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে, ‘আমার কাছ থেকে একটা কথা শিখলেও তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দাও’। সাংবাদিকতা ও মিডিয়া হলে সেই দায়িত্ব পালন করার অন্যতম মাধ্যম। যদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে লেখালেখির তেমন প্রচলন ছিলো না, তবুও রাসূলুল্লাহ (স) কলম ও জিহবার যুদ্ধকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি তাঁর সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদেরকে সাহিত্যের মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরকে অন্যদের কাছে তুলে ধরার উৎসাহ দিয়েছেন।

যেহেতু সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা, তাই এই পেশায় নিয়োজিতদের অশেষ সাওয়াব লাভের সুযোগ আছে। লেখকের কলমের একটু খোচায় যদি কেউ আলোর সন্ধান পান, তাহলে লেখকও সেই আলোর জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন।

এই পেশা নবীদের পেশা। তবে, তা যদি হয়ঃ

১- এই পৃথিবীর মহাসত্য আল্লাহ পাকের একত্ববাদের স্বপক্ষে।
২- নৈতিকতার ও মানবতার পক্ষে।
৩- নিখুঁত ও সত্য।
৪- ইন্সাফ, সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তিতে।
৫- পেশাগত দক্ষতায় ভরপুর।

মনে রাখতে হবে, মসজিদের ওয়াজ মাহফিলের ভাষা আর পত্রিকা, টিভি-রেডিওর ভাষা এক নয়।

দায়িত্বশীল ও সৎ সাংবাদিকতা সমাজকে সংশোধন করে ও উন্নত করে। কিন্তু এই পেশা যদি মিথ্যা ও ভন্ডামিতে আক্রান্ত হয় তাহলে তা সমাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সৎ সাংবাদিকতা করে জান্নাতে যাওয়া যেমন সহজ, অসৎ সাংবাদিকতা করে জাহান্নামেও যাওয়া আরো সহজ- যদি আমাদের সাংবাদিক সমাজ তা অনুধাবন করতেন !!

ফলে, একজন ইসলামী দাঈ যদি সাংবাদিকতাকে পেশা, নেশা ও দাওয়াতী কাজ হিসাবে নেন এবং ইসলামী নীতিমালাকে মেনে চলেন তাহলে তাঁর এই সাংবাদিকতার কাজ হবে সাওয়াবের কাজ, দাওয়াতের কাজ এবং জিহাদের কাজ। নির্ভয়ে, জীবনের ঝুকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করা এবং নিজের ও পরিবারের জীবন বাজী রেখে কোন সংবাদ পরিবেশনা করাও হতে পারে তাঁর জন্যে একটা জিহাদ।

আলেমরা যদি সাংবাদিক হন অথবা মুত্তাকীরা যদি সাংবাদিক হন তাহলে অসৎ সাংবাদিকরা আর ময়দান দখল করতে পারতো না। যেহেতু, এই দুনিয়াটা এখন সাংবাদিকতার যুগ। সেহেতু এই ময়দান থেকে আমাদের দূরে সরে থাকা যাবে না।

যারাই দাওয়াতী কাজ করেন, পড়েন ও পড়ান তাদের জন্যে সাংবাদিকতা বিষয়টা থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগে সাংবাদিকতা একটা সাবজেক্ট থাকা দরকার। সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণও হওয়া দরকার। সাংবাদিক হওয়ার জন্যে নয়, বরং সাংবাদিকদের ভাষাটা বুঝার জন্যে।

লেখক : গবেষক ও ইসলামের দা’ঈ, লন্ডন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com