২৭শে মে, ২০২০ ইং , ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

সামরিক উর্দি ও আনন্দ নিষ্ঠুরতার বয়ান

সামরিক উর্দি ও আনন্দ নিষ্ঠুরতার বয়ান

আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ ❑ আজকে একটা মন ভালো করা ছবি দেখলাম। নৌ বাহিনীর এক সদস্য এক বৃদ্ধকে ত্রাণ এগিয়ে দেওয়ার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে গিয়েছেন বৃদ্ধের সাথে। বাড়িতে ত্রাণ পৌছে দিয়েই পরে ক্যাম্পে এসেছেন। গায়ে নীল উর্দি। মনে মনে তার জন্য দোয়া করলাম। তবে নৌবাহিনীর নাম শুনলে চোখের সামনে বকের মতো সাদা ধবধবে রংটার কথা মনে পড়ে। ঐ রংটা আমার খুব প্রিয়। তা ছাড়া নৌবাহিনীর প্রতি একটা ভালোবাসা কাজ করে সেই শৈশব থেকে।

আমরা যখন ছোট তখন আমার চাস্তো ভাই শেখ জিয়াউল হক নৌবাহিনীর কমোডর। আর দুই ধাপ পার হলে এডমিরাল তথা নৌবাহিনীর প্রধান হতেন, কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের চক্রান্তে পরে আর হতে পারেননি। গোপালগঞ্জ বাড়ি এই কারণে বিএনপি জামাত সরকার তাঁকে নৌবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করে। কত জঘন্য এবং নীচু মনমানসিকতা হলে একটা সরকার একজন উচ্চ লেভেলের মেধাবী সামরিক কর্মকর্তার সাথে এরকম আচরণ করতে পারে?

আজকাল তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ যারা বিএনপির আমল না দেখে ছাত্রলীগ, যুবলীগকে অভিসম্পাত করে, তারা বিএনপির যুবদল আর জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শিবিরের কর্মকাণ্ড দেখলে ঘৃনায় আফসোসে মারা যেতো বোধহয়। খুন, হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ, সমকামিতা এমন কিছু নেই যা তারা করেনি বা বাদ দেয়নি। শিবির তো রগকাটা ট্যাগই পেয়ে গিয়েছিল।

আমার এক ছাত্র। রামপুরা এলাকায় বাড়ি আছে তার। তার বাসার সামনে একটা সিএনজির পাম্প করবে। সবকিছু ঠিকঠাক। কোন কর ফাঁকি নেই, কোন দুর্নীতি নেই সবকিছু ক্লিয়ার। হঠাৎ তারেক জিয়া টাকা দাবী করে বসলো। ছয়কোটি টাকা। তখনকার সময়ের ছয় কোটি টাকা, বুঝতে পারেন কি ডাকাতি? বেচারা শেষমেশ সিএনজির পাম্প স্টেশনটা আর করতে পারেনি। চোখের পানি ছেড়ে অভিসম্পাত করেছিলো। এরকম অভিসম্পাত আর চোখের পানি এক দুইজন থেকে হয়েছে তা না এই সিরিয়াল অনেক দীর্ঘ। যার পরিণতি এখন আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট। আরো অনেক অপকর্ম আছে যেগুলো যুবলীগ কিম্বা ছাত্রলীগের অপকর্মের কাছে নস্যি।

চিন্তাগত দিক দিয়ে এতোটা বিকলাঙ্গ যে, শুধুমাত্র গোপালগঞ্জ জেলার মানুষ হওয়ার কারণে, জুলুম নির্যাতন, সামাজিক অর্থনৈতিক সবদিক থেকে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত পর্যন্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারবর্গ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা প্রদানের জন্য বাংলাদেশে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। যার মূলে ছিলো দুইজন তার মধ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন। চিন্তাগত দিক দিয়ে এতোটা বিকলাঙ্গ যে, শুধুমাত্র গোপালগঞ্জ জেলার মানুষ হওয়ার কারণে, জুলুম নির্যাতন, সামাজিক অর্থনৈতিক সবদিক থেকে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত পর্যন্ত করেছে। সুতরাং এদের চিন্তা চেতনা আর পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক ভুট্টো কিম্বা আইয়ুব খানের চিন্তার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। খালেদা জিয়া একবার ঘোষণা দিলো, গোপালগঞ্জের নাম পাল্টে দেয়ার এমনকি গোপালী বলে গোপালগঞ্জের মানুষদেরকে তাচ্ছিল্যও করেছে কয়েকবার। আফসোস হয় মহিলাটার জন্য।

বিএনপির আমলে চাকরিচ্যুত না হলে কমোডর শেখ জিয়াউল হক তথা আমাদের জিয়াউল দাদা নৌবাহিনীর এডমিরাল হতে পারলে আমাদের বলাকইড় গ্রামের জন্য একটা গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু সেটা আর হলো না। আফসোস হয় ভীষণ।

আমাদের বলাকইড় গ্রামে সামরিক বাহিনীর উচ্চ পদমর্যাদার কয়েকজন অলংকৃত করেছেন। সর্বপ্রথম যিনি আমাদের গ্রামের নামকে উচ্চে তুলেছেন তিনি হলেন আমার দাদাভাই আলহাজ্ব সৈয়দ আহমদ বেগ। পাকিস্তান আমলে বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ ছিলেন। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে বর্নাঢ্য কর্মময় জীবনের ইতি টেনেছেন। এরপরে বাকী জীবনটা আল্লাহর রাস্তায় অতিবাহিত করছেন। তাবলীগে সময় লাগিয়েছেন। নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স কিন্তু এখনো তার হাঁটাচলা যুবকদের মতো। সাক্ষাৎ হলে গর্ব করে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা করেন। আমাদেরকে তাঁর জন্য দোয়া করতে বলেন। অনেক স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। এই দোয়ার মাধ্যমে হয়তো সেসব ভালোবাসার ঋণ শোধ করছেন। আল্লাহ পাক বঙ্গবন্ধুর কবরকে সুখময় করুন।

সামরিক উর্দি কিম্বা পোষাকের ভিতরে নৌবাহিনী আর সেনাবাহিনীর পোষাক আমার হৃদয় কাড়ে সবচেয়ে বেশি। এই পোশাক পছন্দ হওয়ার পিছনে শৈশবের দারুণ একটা স্মৃতি আছে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। পাশের গ্রামে সেনাবাহিনী এসেছে রেশনের চাল দেয়ার জন্য। তো আমাদের ঘরের পাশে একজন ভাবী আছে, টিটুর মা। ভালোই বয়স হয়েছে। তো গ্রামদেশে একটা চল আছে, কারো কোন প্রয়োজন পড়লে ঐ বাড়ির যারা ছোট পোলাপান সবাই এগিয়ে আসে। কাজ শেষে সবার হাতে হাতে এক প্যাকেট বিস্কুট কিম্বা একটাকা দামের একটা চকলেট হাতে ধরিয়ে দিলে আনন্দের আর সীমা থাকে না। অনেকে গাছের নারকেল পেড়েও খাওয়ায়। টিটুর মার যে বয়স তাতে রেশনের চাল এতদূর থেকে বয়ে নিয়ে আসতে পারার মতো সক্ষমতা নেই। সুতরাং আমাদের দর্জি বাড়ির কয়েকজন গেলাম তাকে হেল্প করার জন্য। বনগ্রাম হাইস্কুলে চাল বিতরণ হচ্ছে। সেনাবাহিনীর দায়িত্ব তখন রেশন বিতরণের। দুই গাড়ি ভর্তি আর্মি এসেছে। যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ। মাথায় জাল দিয়ে জড়ানো হেলমেট। তাদের মুখে আগুন আগুন কাঠিন্য ভাব। চতুর্দিকে সুনসান নীরবতা কারণ সেনাবাহিনীর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সবাই অবগত। আমরা যখন গিয়েছি তার আগে দামড়া একজনকে পানিতে নামিয়ে চুবিয়েছে। দশমিনিট ছিলো পানিতে। লাইন ভেঙে আগে যেতে চেয়েছিলো।

দরজার পাশে একজন আর্মি পাহারায়। কাঁধে বন্দুক। মাথায় জাল জড়ানো হেলমেট। আমি একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছি। কোন ভয় নেই, ডর নেই। গাঢ় সবুজ রঙের উর্দি।

দশমিনিট পরে হাবুডুবু খেয়ে যখন একদম কাহিল অবস্থা তখন তাকে পানি থেকে তুলেছে। তারপর একদম সবার শেষে তাকে সিরিয়াল দিয়েছে এরপর থেকে সুনসান নীরবতা এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাস। সুষ্ঠু বন্টন। কোন হাউকাউ নেই। টিটুর মার সিরিয়াল আসতে আসতে যখন একদম দরজার কাছে তখন আমিও তার সাথে। দরজার পাশে একজন আর্মি পাহারায়। কাঁধে বন্দুক। মাথায় জাল জড়ানো হেলমেট। আমি একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছি। কোন ভয় নেই, ডর নেই। গাঢ় সবুজ রঙের উর্দি। অনেক ভালো লাগছিলো। পোশাকটা একটু ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। আমার মনোভাব আর্মির লোকটা বুঝতে পারছিলো কি না কে জানে। তিনি আমাকে হাতের ইশারায় ডাক দিলেন। এতোক্ষণ ভয় না পেলেও এবার ভয় পেয়ে গেলাম। আমার সাথে টিটুর মাও ভয় পেয়ে গেলো। আমাকে জিগ্যেস করলো, তুই কিছু করেছিস নাকি? কাম হইছে সাড়া। পানিতে চুবোই নাকি আল্লাই-ই জানে। টিটুর মা সবসময় একটু বেশি কথা বলে। ছোটখাটো জিনিস ঘটলেও এমন চিৎকার দেয়, মনে হয় বিরাট কিছু ঘটে গেছে, এই হলো টিটুর মার প্রধান চরিত্র। আমি ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলাম আর্মিটার কাছে। সাতার জানিনা সুতরাং কান্না আসছিলো। ডুবেই মরতে হবে বোধহয় আজকে। আমি কাছে যেতেই মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলো। অবিশ্বাস্য। আমি অবাক হয়ে লম্বা আকৃতির আর্মির মুখের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে ছিলাম। জিগ্যেস করলেন, নাম কি?
নাম বললাম, কিন্ত উচ্চারণ করতে পারলেন না। আমার নামটা অনেক কঠিন। যে যত উচ্চ শিক্ষিত সে তত এই নামটা উচ্চারণ করতে ভুল করে। হাসপাতালে যেয়ে অনেকবার বিড়ম্বনার শিকার হয়েছি। আগে নাম ছিলো শুধু আবুদ্দারদা। পরে বিরক্ত হয়ে আবুদ্দারদার পরে আব্দুল্লাহ যুক্ত করেছি।

কলম হাতে ডাক্তার বলেন, নাম কি? আবুদ্দারদা।
কি, আবার বলেন?
আবুদ্দারদা।
ডাক্তার হতাশ। আমিও নামটা দুইবার বলি। তারপর যখন দেখি অবস্থা বেগতিক তখন বলি আব্দুল্লাহ। তখন ডাক্তার সহ অনেকে বলেন, হ্যা, এইবার লাইনে এসেছেন। কিন্তু শৈশবে আর্মির সাথে যখন কথোপকথন হয়েছিল তখন আব্দুল্লাহ আমার নামের অংশ ছিলো না। তা না হলে বেচারাকে একটু সন্তুষ্ট করতে পারতাম। শেষমেশ সেই আর্মি আমার নাম উচ্চারণ করতে না পেরে হতাশ হয়ে, বাপ রে কি কঠিন নাম বলে হো হো করে হেসেছিলেন। আর্মিরা যে হাসতে পারে সেটা ঐদিনের আগে, ঐ ঘটনার আগে বিশ্বাসই করতাম না। শেষমেশ ঐ আর্মির অনুমতি নিয়ে সবুজ রঙের উর্দিটা স্পর্শ করেছিলাম। আমার শৈশবে যেসব আনন্দ পেয়েছি তার মধ্যে সবুজ উর্দি স্পর্শ করার আনন্দটা অন্যতম।

লেখক : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com