৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৭ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

সোনালী আলোয় ভরে যাক স্বপ্নময় কৈশোর

সোনালী আলোয় ভরে যাক স্বপ্নময় কৈশোর

জিনাত আরা আহমেদ : থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে। কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে- এই কবিতার লাইনগুলোর মতোই কিশোরদের ভাবনা। তারা নতুনকে আবিস্কার এবং জরাজীর্ণকে পিছনে ফেলে সামনে এগোতে চায়। দু’চোখে তাদের অপার সম্ভাবনা ও স্বপ্ন। এই স্বপ্নের বাস্তবায়নেই একটি সমাজ পরিপূর্ণ উঠে।

বর্তমানে কিশোরদের নিয়ে সংঘটিত কিছু ঘটনার পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট সমাজ সচেতনদের ভাবিয়ে তুলেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিশোরদের সংঘটনে বেশ কিছু হত্যা এবং অপরাধ সমাজের জন্য যেন অশনি সংকেত। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট যেমন ‘উড়াল সড়কে ছিনতাই করে কিশোর গ্যাং’( প্রথম আলো-৭ আগষ্ট ), দকিশোর গ্যাং এর বিবাদে প্রাণ গেল দু’জন ছাত্রের’ (প্রথম আলো-১২ আগস্ট ), বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে শত শত মানুষের সামনে স্কুল ছাত্রকে হত্যা (বাংলাদেশ প্রতিদিন-৬ আগস্ট )। ঘটনাগুলো পত্রিকায় ছাপার কারণে আমরা উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন দিন কিশোর অপরাধীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখনই উপযুক্ত উদ্যোগ না নিলে এটা সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে।

কিছুদিন আগে যশোরে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে দু’জন কিশোরকে হত্যা করা হয়। এ ধরণের ঘটনা আমাদের ভীষণভাবে মর্মাহত করে। গত ২৫ জুলাই প্রথম আলোর শেষ পাতায় দউড়াল সড়কে রশি বেঁধে ছিনতাই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয় ফেব্রুয়ারির পর গত দু’মাসে ৫০ টির মত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব ছিনতাইকারীদের বেশিরভাগই কিশোর, এরা নেশার টাকার জন্য ছিনতাই করে। এগুলো ছাড়াও দেশের আনাচে কানাচে রয়েছে কিশোর অপরাধীদের অসংখ্য নেতিবাচক কর্মকা-। এসব ঘটনার জন্য অনেক কিছু দায়ী।

সবার জীবনেই কিশোর বয়সটা খুব আবেগপূর্ণ একটা সময়। এসময় মনে অনেক স্বপ্ন থাকে এবং অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হয়। কিছুটা স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে মন। এসময় বাধা পেলে তাই কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিশোর অপরাধীরা এমনিতেই অপরাধী হয়ে ওঠে না, এর পেছনে থাকে নানা ধরনের পারিপার্শ্বিক ও মনস্তাত্বিক কারণ। কোন কোন শিশু পরিবারে অশান্তি, দারিদ্র অথবা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে মনে মনে কষ্ট পায় এবং বিষয়গুলো অবদমন করে রাখে। কোন একসময় এই অবদমিত রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট অপরাধের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনেক পরিবারে বিত্তবৈভব এবং বিলাসিতার কারণেও শৈশব থেকে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে কিছু কিশোর। কখনো আবার সঠিক পরিচালনার অভাবেও কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দেখা গেছে শৈশব ও কৈশোরে সঠিক মনোযোগের অভাব অনেককে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। বর্তমানে স্বচ্ছলতার জন্য বাবা-মায়েদের দীর্ঘসময় কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাবা-মায়ের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশু যেমন ভাল-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে না, তেমনি কাজের মানুষের থেকে ভুল ধারনা পেয়েও শিশুরা অনেক ধরনের অন্যায় করে। এভাবে দিনে দিনে নীতিহীন হয়ে ওঠে কিশোরেরা।

মূলত কিশোর অপরাধী কথাটি শোনার সাথে সাথে আমাদের মনে যেমন আশঙ্কা জেগে ওঠে, তেমনি আশার জায়গাটিও বড় রকমের ধাক্কা খায়। এই কিশোরেরা একদিন বড় হবে। মিশে যাবে সমাজের ভাল-মন্দ মানুষের সাথে। ওদের কাছে জিম্মি হবে সাধারণ মানুষ। এই বয়সেই ওরা সমবয়সীদের কাছে আতঙ্ক, তারপর আবার সমাজের জন্য বিপদসংকেত। এমনি চলতে থাকলে আমাদের জন্য যে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে তা বলাই বাহুল্য। তাই দেশের কল্যাণে কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বয়স কম থাকায় কিশোর অপরাধীরা বড় ধরনের শাস্তির আওতায় আসে না। এতে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে পড়ে কিশোর অপরাধীরা। স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে ক্রমান্বয়ে বড় বড় অপরাধে যুক্ত হয়। অনেকসময় শিশু-কিশোরদের মাদক আনা নেয়ার কাজে জড়িত করে কিছু মাদক ব্যাবসায়ী। কখনও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এলাকার মাস্তানরা কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করায়। এছাড়া মোবাইলে ভিডিও গেম কিংবা অপরাধ সংক্রান্ত মুভি থেকে উৎসাহিত হয়েও কিছু কিছু কিশোর অপরাধী হয়ে ওঠে। আজকাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু বখে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দেখা যায় ক্ষমতা জাহির করতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ তৈরী করছে। শুধু তাই না, এদের ফিল্মি কায়দায় এলাকায় মহড়া দিতেও দেখা যায়। ওদের জন্য শুধু সমবয়সীরাই আতঙ্কে থাকে না, রীতিমত এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি হয়।

বিশ্লেষকরা অনেকেই বলছেন, তথ্য-প্রযুক্তির কারণে শিশু-কিশোরদের নৈতিক স্খলন হচ্ছে। মূলত আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ। পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০টি এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন জেলা শহরের কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক নানারকম অপরাধমূলক কর্মকা-ে। তারকাখ্যাতি, হিরোইজম, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্কতা, অর্থলোভ, শিক্ষাব্যবস্থার ঝুঁকি এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ায় তাদের সামাজিকীকরণ ও মানসিক বিকাশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে সমাজের বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে কিশোরেরা। যেখানে শিশু-কিশোরদের সামাজিকীকরণের প্রথম ধাপ ছিল পরিবার, সেখানে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের স্যোশাল মিডিয়া।

কিশোরদের গ্যাং কালচার এবং কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টিকটক এবং লাইকিতে বিভিন্ন ধরনের কিশোর গ্যাং-এর পদচারণা এবং তাদের কর্মকা- সহজেই দৃশ্যমান হচ্ছে সমাজের মানুষের নিকট। তাই এই সমস্যা নিরসনে দরকার সামাজিক আন্দোলন। এক্ষেত্রে পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে বেশি, কারণ পরিবার মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজ জীবনের মূলভিত্তি। পরিবারের ছেলেমেয়েরা কার সাথে মিশছে, কিভাবে বড় হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। শহরের শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এর ফলে তারা মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবারের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। শিশু কিশোরদের জন্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা এবং তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থাকতে হবে। কিশোরদের সমাজের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।

শিশুর সুস্থ মানসিক গঠনের জন্য নৈতিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আজকের শিশু আগামী দিনের কিশোর, ভবিষ্যতের সুনাগরিক। এই সুনাগরিকেরাই গড়ে তুলবে উন্নত বাংলাদেশ। প্রতিটা ঘরকে শিশুর জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবা- মায়েদের প্রশিক্ষণ জরুরি। সন্তান জন্মের আগেই সন্তানের লালন পালন বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে, বিশেষতঃ মায়েদের। শৈশব থেকেই শিশুকে নৈতিক শিক্ষার পাঠ দিতে হবে। এক্ষেত্রে বাবা-মাকেও তা মেনে চলতে হবে। অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং মানবিক চেতনার অধিকারী হতে ওদের বাস্তব জীবনের অনুশীলন দরকার। এর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদর্শ মানুষ গড়ার কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানবিক চেতনাকে উজ্জীবিত করে এমন ধরনের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও খেলাধুলার তুলনা নেই। এগুলোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরেরা ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের স্বপ্নকে উজ্জ্বল করে তুলতে আমাদের বাবা-মায়েরা ওদের যেন একটু সময় দেন। তাহলেই গ্যাং কালচারের এই বিপথগামী তরুণদের অপরাধমুক্ত রাখা সম্ভবপর হবে এবং আগামী প্রজন্ম রক্ষা পাবে এক অসুস্থ সমাজ থেকে।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com