২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি

স্কুলের গ্রুপ স্টাডি এবং যৌনসন্ত্রাস

স্কুলের গ্রুপ স্টাডি এবং যৌনসন্ত্রাস

মাসউদুল কাদির

এত ঘৃণার নয় গ্রুপ স্টাডি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপস্টাডিকে খুব ঘৃণিতমভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তা খুবই লজ্জার। মূলত গ্রুপ স্টাডির নামে চারিত্রিক অধ্বপতনের খড়্গ আমাদের মাথার উপর ঘুরছে। সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন মা-ও ধর্ষক ছেলের পক্ষ নেয়। নৈতিকভাবে হেয় এ প্রজন্ম পরিবার থেকে কিছুই শিখছে না। আফসোস, মা-বাবা নিজের সন্তান নিয়ে কোনো টেনশনই করছে না।

আরও ভয়ঙ্কর চিত্র আমাদের আলেমসমাজের মধ্যকার অবস্থা। সমাজের এ হাল দেখে আমরা কতকিছু লিখছি। কত উগ্রতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছি। প্রিয় নবীজী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা হাদিস বলে নিই। ‘কুল্লুকুম রায়িন ও কুল্লুকুম মাসউলুন আন রায়্যিয়াতিহি, (كلكم راع وكلكم مسئول عن رعيته ) তোমারা প্রত্যেকই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের বিষয়ে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এখন একটা গল্প বলি, হবিগঞ্জ আমার জন্মস্থান। সৌভাগ্যক্রমে সবুজাভ একটা গ্রামে আমার জন্ম। বর্ষায় যেমন পানি থৈ থৈ থাকতো চারপাশ তেমনি গ্রীষ্মে নানা রকম ফলমূল। এখন মানুষ আরও প্রকৃতিবাদি হয়েছে। পাহাড়ি গাছগাছালিও এখন লাগিয়েছে। ফলে ফল কমেছে। হবিগঞ্জ কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাশে। হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু কিছু এলাকায় আগের আমলের সেই মল্লযুদ্ধ এখনো বলবৎ আছে। ছোটবেলা আমি ঢাকা থেকে বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। তক্ষণি এমন একটা ঝগড়ার শুরু হলো ছাতিয়াইন বাজারের সঙ্গে। দুই এড়িয়ায় দুই দল দাঁড়িয়ে গেলো দা, বটি, লাঠি হাতে। কারও কারও হাতে আবার তীর-ধনুকও। পবিত্র ঘর মসজিদের মাইকেও এই ঝগড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য রীতিমতো ঘোষণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, দেশ বাঁচাও আন্দোলন। আমাদের বয়সীদের মধ্যে কৌতূহল ছিল ব্যাপক। অনেকটা দেখার মানসেই গ্রাম ছেড়ে উত্তর-পূর্ব দিকে এসে দাঁড়ালাম। যারা সরাসরি লড়াইয়ের জন্য গেল তারা তো অনেক দূর চলে গেছে। কিন্তু আমার আর সাহস হলো না, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ দেখলাম, আরেকটা গাছের নিচে বিড় বিড় করে কী যেনো পড়ছেন একজন আলেম। কাছে গিয়ে দেখলাম, এ গ্রামেরই একজন বয়োবৃদ্ধ আলেম ইস্তেগফার পড়ছেন। আল্লাহর কাছে রোনাজারী করছেন। যাতে ঝগড়াটা থেমে যায়।

অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম এই হুজুরের দিকে। এতকিছুর পরও একজন মানুষ পেলাম, যিনি ঝগড়াটা চাচ্ছেন না। পারিবারিকভাবে বড় গোষ্ঠীর হলেও কখনো এই ঝগড়া করার অভিজ্ঞতাটা নেই। তবে হ্যাঁ, বাসে ন্যায্য ভাড়া কিংবা ট্রেনে এসব নিয়ে কখনো কখনো বাড়তি কথা বলতে হয়েছে।

গ্রুপ স্টাডির কথা বলছিলাম। গ্রুপ স্টাডির কোনো দোষ নেই। দোষ আমাদের ব্যবস্থাপনার। আমাদের অতি প্রগতিশীল মানসকিতার। কোথায় অবক্ষয় শুরু হয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে। সমাজের বখে যাওয়া তরুণও আমার ভাই। আমার আত্মীয়। আমার পরমবন্ধু। তাকে হেদায়াতের পথে আনার দায়িত্বতো আমারই ছিলো। আমি পারিনি। ব্যর্থ। এ ব্যর্থতা অন্যের কাঁধে তুলে দিতে চাইবো কেন? কারণ, ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হিসাবে আমিও দায়িত্বশীল। হয়তো আমি কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করছি। সামগ্রিক সাফল্য পেলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটতো না। এ চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে যেমন করা প্রয়োজন, তাবলীগের নিসবতে যেমন করা প্রয়োজন, দেশের আদালতে সৎ মানুষ বসানোর পরিকল্পনাও গ্রহণ করা উচিত। আজকে এসকে সিনহাকে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। দুর্নীতি শব্দটি কোথায় নেই? রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ছাপ। তাই আসুন, সবার আগে আমরা শিক্ষায় পরিবর্তন আনি। বিপ্লব আনি।

শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. তনয় ফিদায়ে মিল্লাত আসাদ মাদানী রহ.-এর লন্ডনপ্রবাসী একজন আত্মীয় লিখেছেন, লন্ডনের অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে ফিদায়ে মিল্লাত স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন। প্রথমে কিছু আলেম বিষয়টি মানতে পারেননি। কিন্তু ফিদায়ে মিল্লাত যে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন তা পরে সবাই টের পেয়েছেন।

শিক্ষায় কওমি বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারলে খুন, ধর্ষণ, লিভটুগেদারসহ সব অন্যায় হ্রাস পাবে। কেবল ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা নয়। সমাজের সর্বক্ষেত্রে কাজের মানুষ তৈরির পদক্ষেপ যত তাড়াতাড়ি নেবে কওমি সম্প্রদায় তত দ্রুত রাষ্ট্রের উপকার হবে। মহা বিপর্যয় থেকে বাঁচবে মানুষ।

গ্রুপ স্টাডি বন্ধ নয়, পদ্ধতি নিয়ে আমাদের সতর্ক ও সরব হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, শীলন বাংলাদেশ (শিক্ষা, সাহিত্য ও সামাজিক আন্দোলন)

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com