২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা মাদানী ইতিহাসে উপেক্ষিত কেন?

ফিরে দেখা । মানজুম উমায়ের

স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা মাদানী ইতিহাসে উপেক্ষিত কেন?

আল্লামা সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদানী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ত্যাগী নেতার নাম। ব্রিটিশ আন্দোলনের পরতে পরতে যিনি রেখেছেন যুগান্তকারী সাক্ষর। তার ত্যাগের বিনিময়ে মুসলিম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতে। ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন ইংরেজদের অধীনে চাকুরি করা যাবে না। দখলদারদের অধীনে চাকুরি করা হারাম। কেবল তিনি একজন রাজনীতিক বা সাহসী সিপাহসালার ছিলেন এমন নয়। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা বিবেচনা করলে আর কোনো অবদান নিয়ে কথা বলার দরকার হয় না। কারণ, একজন মানুষ আর কতটা গুণ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেন।

রাজনীতিতে এত বেশি অবদান রেখেছেন, এত বেশি মুসলিম জাগানিয়া কাজ করেছেন, এত বেশি ইংরেজবিরোধী অবদান রেখেছেন- আর কোনো অবদান নিয়ে আলোচনার কি-বা দরকার পড়ে। অথচ যদি তাকে একজন উস্তাদ, হাদিসবেত্তা, আধ্যাত্মিক রাহবার- এসব গুণ নিয়ে আলোচনা করি তাহলে যে কারও বিস্ময়ের অন্ত থাকবে না।

জীবেনর দীর্ঘসময় তিনি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের ‘সদরে মুদাররিস’ (পরিচালক) এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল ‘জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ -এর সভাপতি ছিলেন। যুগশ্রেষ্ঠ সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) ১৯ শাওয়াল ১২৯৬ হিজরিতে (১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের উত্তর প্রদেশের ‘উন্নাও’ জেলার ‘বাঙ্গারমৌ’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তারঁ পিতা সাইয়্যিদ হাবিবুল্লাহ নাম রাখেন হোসাইন আহমদ। তবে তাঁর পারিবারিক নাম ছিল ‘চেরাগে মহাম্মদ’। তিনি ছিলেন হোসাইন (রা.)-এর বংশধর। ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁর পূর্বপুরুষরা মদিনা থেকে তিরমিজ হয়ে লাহোর আসে এবং সেখান থেকে ভারতের ফয়জাবাদ জেলার এলাহাবাদে বসতি স্থাপন করে।

পারিবারিক পরিমণ্ডলেই শুরু হয় শায়খুল ইসলাম মাদানি (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন। বাবা-মায়ের কাছেই তিনি হিফজ সমাপন করেন। ১৮৯২ সালে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। এখানে তিনি শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান রহ.-এর অধীনে পড়াশোনা করেন। পরে অবশ্য তার প্রভাবই বেশি পড়ে তার জীবনে।

পড়াশোনা সমাপ্ত করে তিনি মুফতী রশিদ আহমদ গাঙ্গোহির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি ছিলেন মাহমুদুল হাসান রহ.এর পীর। সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানিকে মাহমুদুল হাসান রহ. মুফতী রশিদ আহমদ-এর শিষ্য হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার মাধ্যমে হুসাইন আহমদ মাদানির আধ্যাত্মিক শাখা আলাউদ্দিন সাবির কালিয়ারি পর্যন্ত পৌঁছায় যিনি চিশতি তরিকার চিশতি-সাবিরি শাখার মূল ছিলেন। তার আধ্যাত্মিক শাখা নকশবন্দি তরিকার সাথেও যুক্ত কারণ হুসাইন আহমদ মাদানি একজন পূর্ববর্তী পীর নকশবন্দি তরিকার অনুসারী সৈয়দ আহমদ শহীদের শিষ্য ছিলেন। তাই হুসাইন আহমদ নকশবন্দিয়া ও চিশতি উভয় তরিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে তিনি মূলত চিশতি-সাবিরি মতের সাথে যুক্ত ছিলেন।

পড়াশোনা শেষ করে শাইখুল ইসলাম মাদানি রহ. মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি আঠার বছর অবস্থান করেন। যদিও এরমধ্যে তিনি তিনবার ভারতে এসেছিলেন। ভারতের প্রতি একটা টান তিনি অনুভব করতেন। মসজিদে নববীতে সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী হাদিস পড়াতেন। তিনি ১৮ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মুবারকের পাশে হাদিস পড়িয়েছিলেন। এরপর তিনি সিলেট, কলকাতাসহ ভারতের অনেক জায়গায় শিক্ষকতা করেন ৷ তারপর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক এবং শাইখুল হাদিস নিযুক্ত হন। এই পদে তিনি প্রায় ২৮ বছর দায়িত্বপালন করেছেন।

মদিনার সময়টায় বহুবর্ণের মানুষদের সঙ্গে মিশবার সুযোগ পান হোসাইন আহমদ মাদানি। ফলে জীবনে একটা ভারসাম্য তিনি আনতে পেরেছিলেন বলে গবেষকগণ মনে করেন। মদিনায় অবস্থানের সময় পৃথিবীবিখ্যাত সব দার্শনিক পণ্ডিতদের সঙ্গেও একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল তার।

ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের প্রতি কৈশোরেই দুর্বলতা অনুভব করেছিলেন। জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তখন থেকেই ইংরেজবিরোধী চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন।

রেশমি রুমাল আন্দোলনে তার শিক্ষক মাহমুদুল হাসান দণ্ডিত হয়ে মাল্টা দ্বীপে নির্বাসিত হলে হোসাইন আহমদ মাদানি তার দেখাশোনার জন্য স্বেচ্ছায় তার সাথে যান। তিনি তিন বছরের জন্য কারারুদ্ধ ছিলেন।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করতে থাকেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পেছনে তার ভূমিকা রয়েছে। মুসলিমদের উপর তার বড় প্রভাব ছিল বিশেষত উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মুসলিমদের উপর। তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধী ছিলেন। তিনি জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com