৩১শে মে, ২০২০ ইং , ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৮ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

স্মৃতীতে অম্লান শায়খ সাঈদ আহমদ পালনপুরি

স্মৃতীতে অম্লান শায়খ সাঈদ আহমদ পালনপুরি

মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ সকাল ঘুম থেকে উঠেই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ চেক করা আমার অভ্যেস। কিন্তু আজ যে কেন চেক করতে গেলাম, নিজের উপর নিজের খুব রাগ হচ্ছে! মেসেজ চেক না করলে হয়তোবা দিল ভাঙা সেই সংবাদ পড়তে হতোনা। আমার অতি মোহাব্বতের প্রিয় শায়খ, যুগ শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ, মুফতিয়ে আজম, দারুল উলূম দেওবন্দের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব, সারাবিশ্বের অগণিত মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের গড়ে তোলার আদর্শ ও দক্ষ কারিগর হযরাতুল আল্লাম মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি রহ. এই জগতের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মাওলায়ে কারিমের স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে চলে গেছেন। ‘ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন’

যে সব কারণে আমার দারুল উলূম দেওবন্দে যাওয়া তার অন্যতম প্রধান দিক হচ্ছে শায়খের শিষ্যত্ব লাভে ধন্য হওয়া। হুজুরের প্রতি মুগ্ধতা সেই কাফিয়ার বছর থেকে। ‘মাবাদিউল উসূল’ পড়ে তো আমি হুজুরের প্রতি পুরাই ফেদা! প্রচন্ড অর্থসংকট থাকা সত্ত্বেও দাওরার বছর শুরুতেই হুজুরের তিরমিজির জগদ্বিখ্যাত উর্দু শরাহ তোহফাতুল আলমায়ী কিনে ফেলি। যা থেকে ছাত্র জীবনে অত উপকৃত না হলেও যখন তিরমিজি শরীফ পড়াতে গেলাম তখন তোহফা ই ছিল আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।

দারুল উলূমে যেয়ে দাখেলা পরিক্ষায় চান্স পেলামনা। হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কিন্তু হাল ছাড়লাম না। দেওবন্দে থেকে ঈদগাহ রোডে খায়রাবাদি সাহেবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইফতায় ভর্তি হয়ে গেলাম। আর নিয়মিত শরিক হতে থাকলাম পালনপুরি সাহেবের বুখারীর দরসে। দারুল উলূমের তখনকার বর্তমান প্রায় আকাবির আসাতেযায়ে কেরামের মজলিস বসত আসর বাদ। সেই সুবাদে তখনকার শায়খে সানি শায়খ আব্দুল হক্ব আজমি রহ. মুহতামিম সাহেব দা.বা. বাহরুল উলূম দা.বা, ও আব্দুল খালেক মাদ্রাজী দা.বা. উনাদের মজলিসে বার কয়েক গেলেও পালনপুরি সাহেবের মজলিসে প্রায় যেতাম।

আমি আর ইফতার সাথি আব্দুল হান্নান ভাই প্রায় প্রতিদিনই আসরের আগে আগেই হুজুরের বাসার দিকে রওনা করতাম। আশপাশের এক মসজিদে নামাজ পড়েই যায়গা দখল। একটু দেরি হলেই সেদিন আর মজলিসে বসার সুযোগ নেই। দারুল উলূম থেকে ছাত্ররা আছরের নামাজ পড়েই দলবেঁধে ছুটে আসত হুজুরের বাসার খাস কামরায় ইলমি মজলিসে।

কেমন ছিল শায়খের মজলিস?

শায়খের মজলিসে সাধারণত ইলমি আলোচনাই বেশি হতো। মাঝে মাঝে একটু আধটু বর্তমান রাজনীতির কথা অন্যরা উঠাতেন বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংবাদ দিতেন। হুজুরের মজলিসে কেউ কিছু জানতে চাইলে পর্চা লিখে দিত। পর্চা পড়ে হুজুর উত্তর দিতেন। বাঙালী ছাত্রদের পর্চা দেওয়া নিষেধ ছিল। হুজুরের মতে এদের উর্দু ঠিক নাই। লিখতেও জানেনা, পড়তেও জানেনা। আর আমরা বাঙালীরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই। মজলিস থেকে বের হয়েই ‘হেরা (ইন্ডিয়ান ছাত্ররা) যে, আরবি পারেনা মোটেও হেইডা কয়না কেন? আমরা তো তাও ভালই উর্দু পারি হেগো মতো তো আর পাডা না।’

আমি দমে যাওয়ার পাত্র না। প্রত্যেকদিন পর্চা লিখে নিয়ে যেতাম। একবার ঘটে গেল মজার এক ঘটনা। আমি পর্চায় লিখলাম যে, সুরা বনী ইসরাঈলের চার নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দুইটি বিপর্যয় আসার কথা বলেছেন। এর প্রথমটার কথা তো পরের আয়াতে বলা হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় বিপর্যয়ের কথা তো উল্লেখ নাই তাহলে সেই বিপর্যয়টা কি?
হুজুর তাঁর হাতের কাছে থাকা স্বরচিত বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘হেদায়েতুল কুরআন’ থেকে প্রশ্নের স্থান বের করে বললেন, কৌন পুঁছা?
আমি ভয়ে ভয়ে হাত তুললাম।
হুজুর কিতাবখানা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেখো।
আমি হুজুরের হাত থেকে কিতাব নিয়ে কিছুক্ষণ পড়েই সমাধান পেয়ে গেলাম।
এবার হুজুর বললেন: কিয়া ছমঝা বাতাও?
‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত পোহায়’ বলে একটা প্রবাদ আছে না?! এ যাত্রায় প্রবাদটা আমার বেলায়ই খেটে গেল। যেখানে বাঙালিদের পর্চা দেওয়া নিষেধ সেখানে আমি পর্চা দিয়ে ধরা খেয়ে গেলাম। একদম ‘মুখোমুখি আলাপ’। দুরূ দুরূ বুকে মতলব বয়ান করলাম। হুজুর আর কিছু বললেন না।

সেদিন আমার ছিল ঈদের দিন। পালনপুরি সাহেবের সাথে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব বলে কথা। আল্লাহুমা লাকাল হামদু কুল্লুহু।

প্রবন্ধ দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে এখানেই ক্ষ্যান্ত। দিচ্ছি পাঠক সমীপে একটি করজোড় অনুরোধ। আমি এই মুহূর্তে এতিকাফে বসা। হুজুরের জন্য টাটকা এক খতম কুরআন পড়ব। দশপারা অলরেডি শেষ। সুতরাং আপনিও আপনার জায়গা থেকে সাধ্যমতো হুজুরের মতো জগদ্বিখ্যাত এক আল্লাহর ওলীর জন্য কিছু করুন। এর বরকত আপনিই উপভোগ করবেন ইনশাআল্লাহ।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com