৩১শে মে, ২০২০ ইং , ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৮ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

হযরত পালনপুরী রহ. এর তিরোধান; এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি

স্মরণ । সলিমুদ্দিন মাহদি কাসেমী

হযরত পালনপুরী রহ. এর তিরোধান; এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি

(প্র্রিয় উস্তাদ দারুল উলুম দেওবন্দের ক্ষণজম্মা শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. স্মৃতি ও স্মরণ-১)

বুখারী শরিফের তুলনাহীন ভাষ্যকার, দারুল উলুম দেওবন্দের সম্মানিত শায়খুল হাদীস, প্রিয় উস্তাদ আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. আজ ১৯-০৫-২০২০ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ২৫ শে রমযান ১৪৪১ হিজরী (মঙ্গলবার) আনুমানিক সকাল ৭ ঘটিকার সময় পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ হযরতকে জান্নাতু ফিরদাউস দান করুন, আমীন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়ে ছিল ৮১ বছর। হযরত দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন এবং শায়খুল হাদীস ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবত দারুল উলুম দেওবন্দে বুখারী শরিফ, তিরমিযী শরীফ সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির সুনামের সাথে দরস প্রদান করে আসছেন।

শিক্ষা-দীক্ষা 

তিনি প্রাথমিক পড়া-লেখা তাঁর মামা মাওলানা আব্দুর রহমান শিরা রহ. নিকট সমাপ্ত করেন। অতঃপর আরবীর প্রাথমিক কিতাবাদি মুসলিহুল উম্মাত হযরত মাওলানা নজীর মিয়া পালনপুরী রহ. এর মাদরাসায় সমাপ্ত করেন। ১৩৮০ হিজরীতে দারুল উলূম দেওবন্দে মেশকাত জামাতে ভর্তি হন। ১৩৮২ হিজরী মোতাবেক ১৯৬২ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হন এবং ১৩৮৩ হিজরীতে দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ থেকে ‘তাকমীলে ইফতা’ সমাপ্ত করেন। অতঃপর কিছুদিন তিনি ‘মুঈনে মুফতি’ হিসেবে দারুল উলূম দেওবন্দের ফতওয়া বিভাগে কাজ করেন।

দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলীর ক’জন হলেন, হযরত আল্লামা ইব্রাহীম বলীয়াভী রহ., মাওলানা ফখরুল হাসান মুরাদাবাদী রহ., হযততুল আল্লামা মাওলানা ফখরুদ্দিন রহ. হযরতুল আল্লামা মাওলানা কারী তৈয়র রহ., মুফতি সৈয়্যদ মাহদি হাসান রহ., শায়খুল হাদিস মাওলানা নসীর আহমদ রহ.। তাঁর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ.এর সাথে। তাঁর বিশেষ তরবিয়্যতে তিনি আধ্যাত্মিকতায়ও একজন শায়খে কামেলে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।

তাঁর তুখোড় মেধা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, চৌকশ প্রতিভা ও উপস্থিতবুদ্ধির কথা ছোট বেলা থেকেই প্রসিদ্ধ ছিলো। তাই, দারুল উলূম দেওবন্দে আসার পর অনেক মেধাবী ছাত্রদের মধ্যেও নিজেকে প্রথম স্থানে উপনিত করতে সক্ষম হন।

কর্মজীবন 

দারুল উলূম আশরাফিয়া রানদীর, সূরাত, গুজরাত-এ শিক্ষাকতার মধ্যদিয়ে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। সেখানে তিনি আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির দরস প্রদান করেন। সেখানে প্রায় নয় বছর পর্যন্ত খেদমাত আঞ্জাম দিয়ে যান। সেখানে তিনি দরসের পাশাপাশি লেখালেখির কাজও চালিয়ে যান। বিশেষত হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতবী রহ. এর কিতাবাদিকে সহজকরণের কাজ চালিয়ে যান। ‘ইফাদাতে নানুতুবী’ শিরোনামে মাসিক আল-ফোরকানে প্রকাশিত হয়। তা সকলের নিকট সমাদৃত হয়, আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।

১৩৯৩ হিজরিতে দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শুরার অন্যতম সদস্য, খ্যাতমান আলেমে দীন মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী রহ. এর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষক নিযুক্ত হন এবং মুত্যু অবধি দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসীনের দায়িত্ব পালন করে যান। দারুল উলূমে বিভিন্ন জটিল কিতাবাদি পড়ানোর পাশাপাশি তিরমিযী শরীফ প্রথম খণ্ড ও তাহাবী শরীফের পাঠ দান করতেন।

তাঁর দরস ছিল খুবই প্রাণবন্ত ও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। তাই, সকলের নিকট তাঁর দরস ছিল খুবই জনপ্রিয়। যে কোন জটিল বিষয়কে সহজ থেকে সহজতর করে উপস্থাপন করতে তাঁর তুলনা তিনিই। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি ছিল খুবই স্থির ও স্বচ্ছ। যে কোন শিক্ষার্থী চাইলেই তাঁর দরসের নোট তৈরী করতে পারতেন। দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীন আল্লামা নসীর আহমদ খাঁন সাহেব (১৪২৯ হিজরী ২০০৮) নিজের অসুস্থতার কারণে বুখারী শরীফের পাঠদানের দায়িত্ব আলামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. এর উপর অর্পণ করেন। তারপর থেকে তিনি দেওবন্দের শাইখুল হাদীস পদে সমাসীন হন।

আজ হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর সংবাদে হৃদয় প্রকম্পিত হল। যেন, আকশা ভেঙ্গে মাথায় পড়ল। কিন্তু ভাগ্য মেনে নিতে হয়। মুত্যু সকলের জন্য অবধারিত। তবে, হযরত পালনপুরী রহ. এর তিরোধান একটি যুগের সমাপ্তি। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দারুল উলুম দেওবন্দে যথাযোগ্য হাদিসের দরস দিয়েছেন। আকাবিরে দেওবন্দের উত্তম উত্তসূরী ছিলেন।

তিনি কেবলমাত্র বিভিন্ন শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন না, বরং অনেক বছর ধরে তিরমিযী শরীফ ও বুখারী শরিফের যথাযোগ্য দরস প্রদান করে আসছেন। তাঁর মৃত্যুতে জ্ঞান-গবেষণার জগতে যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করা সহজ হবেনা। আল্লাহ তা’য়ালা হযরতের কবরকে জান্নাতে পরিণত করুন এবং তাঁর পরিবার পরিবজনকে ধর্য্য ধারণ করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

একটি অনুরোধ

আমরা যারা হযরতের দাফন-কাফনে শরীক হতে পরছি না, সকলে মিলে হযরতের জন্য ঈসালে সাওয়াব তো করতে পারি। তাই, পরিবত্র রমযানের মাসের এই পবিত্রদিনগুলোতে হযরতের জন্য তিলাওয়াত ও সদকা ইত্যাদির মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াব করবো। অশ্রু শিক্ত নয়নে আল্লাহর দরবারে ফরিআদ করবো, আল্লাহ যেন আমাদের প্রিয় উস্তাদকে জান্নতুল ফিরদাউস নসীব করেন এবং তাঁর খেদমাতগুলো কবুল করেন।

(হযরতের অনেক স্মৃতি আছে। ধারাবাহিকভাবে লিখে যাব, ইনশাআল্লাহ)

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com