শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৯ অপরাহ্ন

হযরত ফিদায়ে মিল্লাতের উদারতা

সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী, সাবেক সভাপতি, জমিয়তে উলামা হিন্দ

হযরত ফিদায়ে মিল্লাতের উদারতা

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.- এর কথা বারবার স্মরণ হয়। তাঁর সেই চেহারাটা যেন আমার চোখে সব সময় ভেসে বেড়ায়। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল চেহারাখানি ফুটে ওঠে। বিশেষ করে তিনি যে কত সাদামাটা ছিলেন, কত নিরহংকার, সেটা বারবার মনে হয়।

তিনি তো কোন সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। যিনি আরব- আজমের শায়েখ। বিশ্বের ইসলামী রেঁনেসার অগ্রদূত, আওলাদে রাসুল, লক্ষ লক্ষ মুসলিমের আধ্যাত্বিক রাহবার। যার পদচারণা ছিল বিশ্বব্যাপি। সেই মহান ব্যক্তিটি ছিলেন, একজন সাদাসিধে মানুষ। নিরহংকার। কোন অহমিকা বোধ ছিল না তাঁর।

আমার কেমন যেন বারবার মনে পড়ে ফেদায়ে মিল্লাতের ফরিদপুর সফরের কথা। তিনি যে সেই ২০০০ সনে ফরিদপুর এসে ছিলেন, সে সব দৃশ্য স্মৃতি পটে ভেসে ওঠে।

একদম কাছে বসে ছিলাম তাঁর। অত কাছে আগে কোন দিন যেতে পারেনি। সেদিন সব সময় তাঁর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে ছিলাম।

ফরিদপুরের সব চেয়ে বড় মাদ্রাসা, জামেয়া আরাবিয়া শামসুল উলুমে ফেদায়ে মিল্লাতের আগমন ঘটে ছিল। তখন শামসুল উলুম মাদ্রাসার মোহতামিম ছিলেন, মুফতি আব্দুল কাদের সাহেব রহ.।

মুফতি আব্দুল কাদের রহ. একজন মর্দে মুজাহিদ আলেম ছিলেন। পুরো ফরিদপুরসহ দক্ষিণ বঙ্গের একজন মুরুব্বী ছিলেন। দেশ- বিদেশের আলেম- উলামা এবং বুজুর্গদের আমন্ত্রণ করে তিনি আনতেন। আর গোটা ফরিদপুরের সকল মাদ্রাসায় দাওয়াত পৌছাতেন। সকল আলেমদের দাওয়াত দিতেন সে প্রোগ্রামে।

একদিন চিঠি পেলাম মুফতি আব্দুল কাদের সাহেবের। তাতে লেখা, অমুক তারিখে ফরিদপুরে ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সাহেব আসবেন। চিঠিটা পেয়ে খুশিতে মনটা ভরে গেল।

আমার মনে আছে, আমি একদিন আগে রাজবাড়ি থেকে ফরিদপুর যেয়ে বসে ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম শায়েখের জন্য।
ফেদায়ে মিল্লাত এলেন শামসুল উলুম মাদ্রাসায়। সরাসরি মুফতি আব্দুল কাদের সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করলেন।

মুফতি আব্দুল কাদের সাহেবের বসার জায়গাটা খানিকটা উঁচু ছিল। মানে উঁচু গদ্দি বিছানো। মুফতি সাহেব ফেদায়ে মিল্লাতকে অনুরোধ করলেন, উঁচু গদিতে বসার জন্য। কিন্তু তিনি বসলেন না। ফেদায়ে মিল্লাত বললেন, ওটা আপনার স্থান। আপনি বসুন! এই বলে তিনি সাধারণ আলেম- উলামা যেখানে বসা আছে, সেখানে গিয়ে বসে পড়লেন।

মুফতি আব্দুল কাদের সাহেবের কাছে একটা হরিণের চামড়া সংরক্ষিত ছিল। হরিণের চামড়াটি বিছিয়ে দিতে চাইলেন তাঁর জন্য। কিন্তু ফেদায়ে মিল্লাত বললেন, কোন প্রয়োজন নেই। এভাবেই আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করছি।

যত সময় তিনি শামসুল উলুম মাদ্রাসায় ছিলেন, একেবারে সাধারণ মানুষের মত বসে ছিলেন। কোন অহমিকা বোধ দেখলাম না একটুও।

ফরিদপুর থেকে ঢাকা ফেরার পথে সাভার রাজফুলবাড়িয়া মাদ্রাসায় যাত্রা বিরতী দিয়ে ছিলেন ফেদায়ে মিল্লাত। এখানে গিয়ে দেখলাম একই অবস্থা। সাধারণ ভাবে আলেমদের কাতারে বসে পড়লেন। আলীশান জায়গায় নয়। কোন স্পেশাল ব্যবস্থাপনায় তিনি বসলেন না।

কথা- বার্তায় ও দেখে ছিলাম সাধারণ মানুষের মত। কোন গোমড়া মুখ তাঁকে দেখিনি। বা কোন ভাব নিয়ে তাঁকে থাকতে দেখি নাই। বরং তিনি সব সময় হাসি খুশি এবং খোলা- মেলা কথা বলেছেন। এমন এমন কথা তিনি বলতেন, যার দ্বারা মজলিসটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। এবং সে সব কথার মধ্যে ভক্তদের শিক্ষণীয় বিষয় থাকত।

দেওবন্দে যখন ছিলাম, তখনও ফেদায়ে মিল্লাতকে দেখেছি, একজন সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করতে।দারুল উলুমের সামনের রাস্তা দিয়ে তাঁকে একাকি হেঁটে যেতে দেখেছি। কোন দল – বল বা সাঙ্গ- পাঙ্গ তাঁর সাথে কখনো দেখিনি।

আজকাল মানুষ একটু উপরে উঠলে কত লোকজন, পাইক- পেয়াদা সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কত খাদেম- খুদ্দাম রাস্তা ক্লিয়ার করার জন্য সঙ্গে থাকে। কিন্তু ফেদায়ে মিল্লাতকে দেখেছি, একদম সাদামাঠা চাল- চলন। নিরবে হেঁটে যাচ্ছেন একাকি।

অথচ তিনি এমন এক ব্যক্তি, লক্ষ -কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন ছিলেন তিনি। যার অবদান ছিল বিশ্বময়। মানুষের খেদমতে বিরামহীনভাবে ছুটে চলতেন। বছরের পুরো টা সময় কেটে যেত মানুষের কল্যাণে। অসহায় নিপীড়িত- নিস্পেষিত মানুষের বন্ধু ছিলেন যিনি। সেই মানুষটি ছিলেন একদম নিরহংকার। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দুআ করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com