৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

ঘুষ : সা’দত হাসান মান্টো

ভাষান্তর : কাউসার মাহমুদ

ধনী বেটার ছেলে আহমাদ দীন। মহল্লায় নিজের সমবয়সী ছেলেদের মাঝে সবচেয়ে সুখী মনে করা হয় তাকে। কিন্তু সেই তার জীবনেও এমন এক সময় আসে, যখন সে একেবারে কপর্দকহীন হয়ে পড়ে।

ভালো মার্কস নিয়ে বি,এ পাশ করেছে আহমাদ দীন। ফলাফলে ভীষণ খুশী সে। ওইদিকে তার পিতা খান বাহাদুর আতাউল্লাহর ইচ্ছে, ‘ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাতে পাঠাবেন।’ সে মতে পাসপোর্টও করতে যাওয়া হয়েছিল। স্যুটবুটও বানানো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু হঠাৎই আপাদমস্তক ভদ্রলোক খান আতাউল্লাহ; কোনো এক বন্ধুর প্ররোচনায় জুয়া খেলা শুরু করেন।

প্রথমদিকে এ খেলায় কিছু লাভ হলে, মনেমনে যারপরনাই খুশী সে—’যাক বিলাতে ছেলের পড়াশোনার খরচাটা হয়ে গেল তাহলে।’ কিন্তু লোভ যে বড়ো ভয়ঙ্কর রোগ। একবার কাউকে পেলে, শেষ করেই ছাড়ে তাকে। খান আতাউল্লাহর বেলায়ও হয়েছে তাই। খান বাহাদুর ক্রমশ এ খেলায় লোভী হয়ে ওঠেন— ‘ভাবেন, তার পৃষ্ঠে ভাগ্যের চতুর্গুণ ভর করে আছে; সে কেবল জিতেই যাবে।

এদিকে এ পথে আনা, সেই প্ররোচনাদায়ক বন্ধু প্রায়ই তার পিঠ চাপড়ে বলে, ‘মাশাল্লাহ খান সাহেব! আপনি তো কিসমতের রাজা। মাটিতে হাত বুললােও সোনা ফলবে।’

অবশ্য এ ধরনের চাপলুসি করে খান বাহাদুর থেকে নিত্যই দু’তিনশো টাকা বাগিয়ে নিতো সে। এতে বাহাদুরেরও খুব একটা বাঁধতো না। কারণ কোনরূপ পরিশ্রম ছাড়াই রোজ তার হাজার রুপি মিলছে।

কিন্তু পিতার এরূপ কাজকর্ম কোনভাবেই ভালো লাগে না আহমাদ দীনের। আহমাদ দীন মেধাবী ও শান্ত ছেলে। তাই অগত্যা একদিন সে তার পিতাকে বলেই ফেলে, ‘আব্বাজি! গোস্তাখী মাফ করবেন। তবু বলতে হচ্ছে, আপনি যে জুয়ো খেলা শুরু করেছেন, এর পরিণাম ভালো হবে না কিন্ত।’

ছেলের এমনতর কথায়, খান বাহাদুর তারস্বরে বলে, ‘বৎস! আমার কাজে তোমার কোনো নাক গলানোর অপরাধ না হওয়াই শ্রেয়। যা-কিছু করছি, ঠিকই করছি। যত টাকা আসছে, এসব তো আর সঙ্গে করে কবরে নেবো না আমি। তোমারই কাজে আসবে।’

আহমাদ তখন কোমলভাবে জিজ্ঞেস করে,’তা আব্বাজি! এ টাকা এমন কতদিন আসবে এর কোন নিশ্চয়তা আছে কী? হতে পারে, কালই এর সব চলে যাবে!’

এতে খান বাহাদুর আরো উত্তেজিত হয়ে পড়েন, ‘বাজে বকো না তো। ও টাকা আমার আসতেই থাকবে।’

‘আসলেই টাকা আসতে থাকে।’

এবং এরপর হঠাৎই একদিন খান বাহাদুর একসাথে কয়েক হাজার টাকা এক দানে লাগিয়ে দেন। বিধিবাম, ফলাফল আসে উল্টো। ফলে একহাতে দিতে হয় দশ। কিন্তু হেরেও কোন বোধদয় হয় না খানের। পরের বার লটারিতে এসে তিনি একসাথে বিশ হাজার টাকার জুয়া খেলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, এ দানে বাকী টাকা সব উঠে আসবে।কিন্তু এবারও ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। ভোরে পত্রিকা দেখে বুঝতে পারে, এই বিশ হাজারও গেছে।

তবুও খান বাহাদুর দমে না। অত সহজে হিম্মত হারানো লোক সে নয়। অতএব দ্রুত সে নিজের একটি বাড়ি বন্ধক রেখে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার নেয় এবং এর সবই সে আল্লাহর নাম করে স্বর্ণের জুয়োয় লাগিয়ে দেয়।

আল্লাহর নাম তো খায়ের, কিন্তু তা তো আল্লাহরই নাম মাত্র। ওই নাম কী করে সোনারূপোর মার্কেট কন্ট্রোল করবে! সুতরাং নিয়ম মতোই সকালে উঠে খান বাহাদুর দেখে, সোনার বাজার একদম নেমে গেছে। ফলে তারও যা হবার হয়েছে। সর্বোপরি এবার সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ঠিক। সত্যিই কঠিন এক আঘাতে তার মনঃপীড়া শুরু হয়। বুকের ব্যামোও ধরে বসে তাকে।

পিতার এমন গুরুতর অবস্থায় আহমাদ দীন তাকে বুঝিয়ে বলে, ‘আব্বাজি! এবার তো অহেতুক এ জিনিসটা ছাড়ুন।’

খান বাহাদুর তখন রেগেমেগে, ভর্ৎসনা করে ছেলেকে বলে, ‘মূর্খের মতো বকো না তো। যা করছি ঠিকই করছি আমি।’

অধিকিন্ত আহমাদ দীন আরও নরোম স্বরে বলে, ‘কিন্তু আব্বাজান! এই যে আপনার অসুখ শুরু হয়েছে এর কারণ কী!’

‘তা আমি জানবো কী করে! আল্লাই ভালো জানেন। এমন অসুখ মানুষের হয়’ই।’

আহমাদ দীন তখন কিছুক্ষণ ভেবে বলে, ‘জি হ্যাঁ। মানুষের সব রকম অসুখই  হয়ে থাকে। কিন্তু এর কারণও তো থাকে।যেমন আপনি এমন কিছু খেলেন; যাতে কলেরার জীবাণু ছিল এবং…।

ছেলের এমনসব কথাবার্তা খান সাহেবের একদম পছন্দ হচ্ছিলো না। তাই বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘এখান থেকে দূর হও তুমি, দয়াকরে। আমাকে ত্যক্ত করো না। সব ব্যাপারেই বেশ ভালো জ্ঞাত আমি, বুঝলে।’

বেচারা আহমাদ দীনের আর কি করা! অগত্যা কামরা থেকে বেরুতে, বেরুতে বাবাকে শুনিয়ে দেয় সে, ‘এ আপনার ভুল ধারণা আব্বাজান। কোন মানুষই সবজান্তার দাবী করতে পারে না।’

পুত্রের সঙ্গে এই ছোট্ট কথোপকথন পর্বের পর, খান বাহাদুর নিজেও অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে, ভেতরে ভেতরে নিজেকে বিরাট বোকা ভাবতে শুরু করে। কিন্ত নিজের অনুভূতি কোনভাবেই ছেলের কাছে প্রকাশ করতে চান না তিনি। ফলতঃ বিছানায় শুয়ে বারংবার নিজেকেই নিজে তিনি ভর্ৎসনা করেন, ‘খান বাহাদুর আতাউল্লাহ! তুমি খান বাহাদুর সেজে ঘোরো ঠিক। আসলে তুমি একটা প্রথম শ্রেণীর বেকুব। কেন তুমি আপন ছেলের কথা শুনছো না! যখন তুমি বুঝতে পারছো; সে যা বলছে সবই ঠিক।

এতে খান বাহাদুর হঠাৎ কেঁপে ওঠে এবং বিভ্রম তাড়িত’র মতো বিড়বিড় করে বলে, ‘ হ্যাঁ। সব ঠিক। সবই ঠিক। শুধু এক আমিই ভুল। কিন্তু আমার ভুল হওয়াও সঠিক। কখনো ভুলও—শুদ্ধের সামগ্রী প্রস্তত করে দেয়।

এই অদ্ভুত ঘটনায় টানা পনেরো দিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন খান বাহাদুর। চিকিৎসা করানোর পর কিছুটা সুস্থ হতেই, আবারও পঁচিশ হাজার টাকায় সে তার আরেকটা বাড়ি বিক্রি করে দেয়। আর এ সব টাকাই তিনি জুয়োয় লাগিয়ে দেন। এবার তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, এটি দিয়ে সে তার পুরনো সমস্ত ক্ষতি পুষিয়ে আনবে। কিন্তু এবারো তার ভাগ্য প্রসন্ন হয় না। এই টাকাও হেরে যান বাহাদুর।

এদিকে পিতার এমন অবস্থায় আহমাদ দীন হতাশ হয়ে পড়ে। বুঝতেই পারে না, আর কীভাবে বাবাকে বোঝানো যায়! উনি তো কোন কথাই শুনেছেন না।

অবশেষে বিষন্ন আহমাদ দীন শেষ চেষ্টাটি করে। একদিন যখন তার পিতা ঘরে বসে আনমনে হুঁকো টানছিলো এবং গভীর কোন চিন্তায় ডুবেছিলো—আহমাদ তখন ভয়ে ভয়ে পিতাকে ডাকে, ‘আব্বাজি!’

খান বাহাদুর এতটোই মগ্ন ছিলেন যে ছেলের ডাক শুনতেই পাননি।

আহমাদ তার স্বর আরেকটু উঁচু করে ডাকে, ‘আব্বাজি, আব্বাজি!’

খান বাহাদুর চমকে ওঠে, ‘কী!’

আহমাদও কেঁপে ওঠে, ‘কিছু না আব্বাজি! তারপর তোতলাতে তোতলাতে সে বলে, আমার…আমার আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।’

খান বাহাদুর ধীরে হুঁকোর নলটি মুখ থেকে সরায়,’বলো,কী বলতে চাও।’

‘আমার আবেদন…আমার দরখাস্ত হলো, দয়াকরে আপনি জুয়ো খেলা বন্ধ করে দিন।’

আহমাদ কথা শেষ করতেই, হুঁকোর নলটি রেখে খান সাহেব ছেলের উপর চড়াও হন—’তুমি কে হে, আমাকে উপদেশ দেবার? আমি আমার কাজ ঠিক জানি। তা এখন অবধি তোমার মশওয়ারা নিয়েই কী সব কাজ করেছি আমি! দেখো! এই তোমাকে শেষবার বলে দিচ্ছি, ভবিষ্যতেে আমার কোন কাজে নাক গলাবে না। এমন বেয়াদবি আমার একেবারেই পছন্দ নয়। বুঝলে!’

হতাশ আহমাদের আর কোনো আশাই বেঁচে থাকে না আর। বেচারা মাথা নীচু করে, ক্ষীণকণ্ঠে বলে, ‘জি বুঝেছি।’ বলেই সে পিতার রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

জুয়োর নেশা, মদ পানের অভ্যেস থেকেও বেশী ভয়ঙ্কর। আর সে নেশাতেই খান বাহাদুর এমন মত্ত হয়েছে যে, নিজের সহায়সম্পদ সব ওই ভয়ঙ্কর খেলায় খুইয়েছে সে।এমনকি পরলোকগত বউয়ের অলঙ্কারটুকুও বিক্রি করা হয়েছে তার। আর শেষতক সবকিছুর ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে, তার সে অসুখটি, এমন এক আকৃতিই ধারণ করেছে যে, একদিন ভোরে সে গোসলখানায় ঢুকতেই ধপ করে পড়ে যায়। এবং মুহুর্তেই দম বন্ধ হয়ে মারা যায়।

পিতৃ মৃত্যুশোকে—বাস্তবেই আহমাদ দীন নুহ্য হয়ে পড়ে। পিতার অন্তর্ধান তাকে এতোটাই আঘাতগ্রস্থ করে যে, কয়েকদিন তো সে একেবারে ক্লান্ত, অবসন্ন, ব্যথাতুর ও বিমর্ষ হয়েই পড়ে থাকে। এমন কুল-কিনারাহীন জীবনে কি করবে না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। ক’দিন আগেও বি,এ পাশ করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিলো। কিন্তু এখন কেমন সমস্ত চিত্রই বদলে গেছে। একটি ফুটো কড়িও তার জন্য রেখে যাননি বাবা। যে ঘরটিতে সে একাকী থাকে; ওটাও ভাড়ায় ছিল। অগত্যা কিছুদিন পর এ ঘরটিও ছাড়তে হয় তাকে। ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র বেচে,সাকুল্যে চার-পাঁচশো টাকা আসলে, ওটুকু সম্বল নিয়েই দূরের নোংরা বস্তিতে, ভাড়ায় ছোট্ট একটি খুপরিতে গিয়ে উঠে আহমাদ।  কিন্তু নামমাত্র ওই পাঁচশো টাকা কতদিন সঙ্গ দেবে তাকে! সর্বোচ্চ্য একবছর কষ্টেসৃষ্টে ওই দিয়ে কোনমতে চলা যেতে পারে। এর বেশী তো নয়। কিন্তু এরপর কী হবে! তাই দীনহীন আহমাদ ভাবে, ‘যেকোনো একটি চাকুরী আমাকে করতেই হবে। তা যত নিম্নমানেরই হোক না কেন! মাসিক পঞ্চাশ-ষাট টাকা হলেও একটা হিল্লে হবে অন্তত।

ঘোর আমাবস্যার মত এমন দুঃখের মাঝে প্রায়ই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে তার মায়ের কথা। যতদিন সে বেঁচে আছে, প্রায় অত দিন তার মায়ের তিরোধান বয়স। জন্মের পর মায়ের মুখখানাও  দেখা হয়নি তার। অভাগার ভাগ্যে না জুটেছে মাতৃদুগ্ধ, না জুটেছে মায়ের স্নেহময় স্পর্শ। তবুও প্রায়শই মায়ের কথা মনে পড়ে তার চোখ ভিজে আসে।

কিন্তু ওই মুষ্ঠি গরমের জিনিস সে পাবে কোথায়?

এদিকে চাকুরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলেও কোনভাবেই সফল হয় না সে। চারপাশে এত এত বেকার আর বেরোজগার যে, সে নিজে এই বেকারত্ব ও বেরোজগারের সমুদ্রে নিজেকে একটি ক্ষুদ্র বিন্দু মনে করে। কিন্তু এই চরম দুর্দশা ও দুঃখকষ্টের পরও সাহস না হারিয়ে,  নিজের চেষ্টা অব্যাহত রাখে আহমাদ। এবং অনবরত চেষ্টার বহুদিন পর সে বুঝতে পারে, ‘এভাবে ঘুরে ঘুরে কাজ হবে না। যদি কোন অফিসারের মুষ্টি গরম করা যায় তবেই তার চাকুরী মেলার একটা সুযোগ হতে পারে। কিন্তু ওই মুষ্ঠি গরমের জিনিস সে পাবে কোথায়?’

এর আগে এক অফিসে চাকুরীর জন্য গেলে, হেডক্লার্ক তাকে খুব ভদ্রস্থ হয়ে বলে, ‘দেখো বাবা! এভাবে বিনে পয়সায় কোন কাজ চলে না। যে চাকুরীর জন্য তুমি দরখাস্ত দিয়েছ, তার জন্য প্রথমেই দুশো পঞ্চাশ টাকা উসুলি হয়ে গেছে। আমি বড়ো নির্ভেজাল মানুষ। তা ভাই, যদি তুমি পাঁচশো টাকা দিতে পারো, তাহলে নিশ্চিত তোমার এ চাকুরী হবে।’

এখন এই পাঁচশো টাকা আহমাদ পায় কোথায়! তার কাছে সাকুল্যে বিশ তিরিশ টাকা হবে মাত্র। তাই সে হেডক্লার্ককে কাকুতি করে বলে, ‘জনাব! আমার কাছে তো অত টাকা নেই। আপনি আপাতত চাকুরীটার ব্যবস্থা করে দিন দয়াকরে। পরে বেতন থেকে অর্ধেক টাকা নিয়ে নেবেন ক্ষণ।

দীনের এমন আবেদনে হেডক্লার্ক হাসে, ‘তুমি আমাকে বেকুব বানাতে চাচ্ছো হ্যাঁ! যাও অন্য কোথাও ঘুরেফিরে দেখো।’

আহমাদ দীন বহু জায়গায় ঘোরে। এখানে,ওখানে যায়।  কিন্তু কোথাও নিশ্চিন্তে একদন্ড বসার সুযোগ মেলে না তার। যেখানেই যায় সবার আগে ঘুষের প্রশ্ন সামনে আসে। সে ভাবে, পৃথিবী বুঝি এ ঘুষের কারণেই মহাবিশ্বের অস্তিত্বে এসেছে। হয়তো খোদাকে কেউ কোন ঘুষ দিয়েছে, আর তিনি এই দুনিয়া বানিয়ে দিয়েছেন।

যাহোক, এর-ওর কাছে যেতে যেতে, শেষে, তার কাছে যখন আর কোন কানাকড়িও অবশিষ্ট নেই, তখন সে মজদুরি শুরু করে। এবং রোজ এক-দু টাকা কামিয়ে নেয়। এদিকে সবকিছুর দাম বড়ো বাড়ন্ত। তার ওপর দু’বেলার খাবারই খেতে হয় সরাইখানায়। ফলে খরচা একটু বেশীই পড়ে যায়। তাই সব বাদে, বেশীর থেকে বেশী এক আনা বাঁচে তার।

আহমাদ মজদুরি করে ঠিক কিন্তু তার মন মস্তিস্কে শুধু কেবল ঘুষের চিন্তাই ঘোরে। এ যেন বিরাট এক অভিশাপ। যেকোন উপায়ে এ অভিসম্পাত থেকে মুক্তি চাচ্ছিল সে। এবং মজদুরি ছেড়ে তার সঙ্গে মানানসই একটা ভালো চাকুরীও খুঁজছিল। তাছাড়া যেহেতু প্রথমশ্রেণী পেয়ে বি,এ-পাশ করেছে তাই ভাবে, এখন থেকে নামাজ পড়া শুরু করবে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ তার প্রার্থনা শুনবেন। সুতরাং নিয়মতান্ত্রিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করে সে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার এ নামাজ পড়া জারি থাকে, কিন্তু এর কোন ফল দেখতে পায় না আহমাদ! তবে এদিকওদিক করে ইতোমধ্যে তার কাছে প্রায় তিরিশ টাকা জমে গেলে, ওই নিয়ে একদিন ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করে সে পোস্টঅফিসে যায়। তিরিশ টাকার পোস্টাল অর্ডার নেয় এবং তা একটি খামে ঢুকিয়ে, সাথে একটি চিঠিও রেখে দেয়।

যার বিষয়বস্তু কিছুটা এরকম ছিল—

‘আল্লা মিঞা। আমার মনে হয়, তুমিও ঘুষ নিয়ে কাজ করো। আমার কাছে তিরিশ টাকা আছে, যেটা তোমাকে পাঠাচ্ছি। দয়া করে আমাকে কোথাও ভালো একটা চাকুরী মিলিয়ে দাও, খোদা। জীবনের এই বোঝা উঠাতে উঠাতে আমার কোমড় বাঁকা হয়ে গেছে।’

তারপর সুন্দর করে খামের ওপর সে ঠিকানা লিখে দেয়,

‘বখেদমতে আল্লাহ মিঞা, মালিকে কায়েনাত’

বিধিবাম! এর কিছুদিন পরই কায়েনাত পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে আহমাদ দীনের কাছে একটি চিঠি আসে। সম্পাদক মুহাম্মদ মিঞা আহমাদ দিনকে জরুরী সাক্ষাতে তাদের অফিসে ডেকেছেন।

আহমাদ—কায়েনাত অফিসে যায়। সেখানে অনুবাদক হিসেবে মাসিক একশো টাকা বেতনে তার একখানা চাকুরী মেলে। আহমাদ ভাবে,’যাকগে শেষতক ওই ঘুষই কাজে এলো।’

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com