পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে দুই মাস ধরে চলা যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ইরান সর্বশেষ যে প্রস্তাব পাঠিয়েছে তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। এতে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটানো, মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়া ও কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ডেকে আনা সঙ্ঘাতটির সমাধানের আশা আবারো ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা তুলে রেখে পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজ চলাচলের অচলাবস্থা নিরসনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, এসব প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্ট না হওয়ারই কথা, কারণ যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপরই মূল জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। আর এ কারণেই ইরানের এ প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্প সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ‘(কোনো প্রস্তাব) গণমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করবে না’ আর ‘আমাদের রেডলাইনগুলো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে’।
জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় দেশের ভেতর থেকেই যুদ্ধ শেষ করার চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। জনসাধারণকে যুদ্ধের কারণ হিসেবে যা যা বলেছিলেন তা বারবার পরিবর্তন করেছেন তিনি। রাশিয়া সফরকালে গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে না পারায় ট্রাম্প আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছেন।
পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত শনি ও রোববার আরাকচির পক্ষ থেকে ইসলামাবাদের কাছে দেয়া প্রস্তাবে ধাপে ধাপে আলোচনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, যার শুরুতে পারমাণবিক বিষয়টি একপাশে সরিয়ে রাখা হবে। শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে আর তারা আবার তা শুরু করবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। এরপর আলোচকরা ইরানের বাণিজ্যের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ আর হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন যা ইরান নিজের নিয়ন্ত্রণের অধীনে ফের চালু করতে চায়। এসব ধাপ পার হওয়ার পর ইরান অন্য সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করবে। যেগুলোর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছিল। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে; কিন্তু ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে তা বিফলে যায়।
শান্তি প্রচেষ্টার আশা আরো কমে যায়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের গত সপ্তাহের পাকিস্তান সফর বাতিল করেন। অন্য দিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গত সপ্তাহান্তে দু’বার ইসলামাবাদ সফর করেছেন। আরাকচি ওমান এবং রাশিয়াও সফর করেছেন, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে দেখা করেন এবং দীর্ঘদিনের মিত্রের কাছ থেকে সমর্থনের আশ্বাস পান।
এ দিকে, যুদ্ধরত পক্ষগুলো সমঝোতা থেকে অনেক দূরে থাকায় এশিয়ার বাজারে গতকাল মঙ্গলবার তেলের দাম আবারো বেড়েছে। সিটি ইনডেক্স এবং ফরেক্স ডটকমের বাজার বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা এক নোটে বলেছেন, ‘তেল ব্যবসায়ীদের কাছে এখন আর কথার লড়াই বড় বিষয় নয়; বরং হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেলের প্রকৃত সরবরাহ কতটা হচ্ছে, সেটাই আসল। বর্তমানে সেই প্রবাহ মারাত্মকভাবে সীমিত।’
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানি তেলবোঝাই অন্তত ছয়টি ট্যাংকার গত কয়েক দিনে ইরানে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে একে ‘উন্মুক্ত সমুদ্রে জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতির বৈধকরণ’ বলে অভিহিত করেছে। শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু গত এক দিনে মাত্র সাতটি জাহাজ পার হয়েছে এবং সেগুলোর কোনোটিতেই বিশ্ববাজারের জন্য তেল ছিল না।
জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইন মানতে বাধ্য নয় ইরান
ইরান জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইন বা ‘আনক্লজ’ মেনে চলতে আইনিভাবে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছেন, জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি। সোমবার দেয়া এই বিবৃতিতে তিনি হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সাম্প্রতিক কঠোর নৌ-পদক্ষেপগুলোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
ইরাভানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ নৌ-চলাচলের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতেই তেহরান এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেছে। মিডল ইস্ট আই-এর খবরে ইরানের এই অনড় অবস্থানকে বর্তমান সঙ্ঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’ অবলম্বনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইরাভানি অভিযোগ তোলেন যে, ওই দেশগুলো ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া অবৈধ নৌ-অবরোধের বিষয়ে নীরব থেকে কেবল ইরানের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
তার মতে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর এই উদ্বেগ কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে এই উদ্বেগের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই মূলত আন্তর্জাতিক আইন বেশি লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তেহরান মনে করে, আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইন নিয়ে ইরানের এই প্রকাশ্য বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। যেহেতু ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির সব ধারায় স্বাক্ষর করেনি বা তা অনুমোদন করেনি, তাই তারা নিজেদের নৌসীমায় নিজস্ব নিয়ম কার্যকর করতে চায়। এই কূটনৈতিক লড়াই এখন কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সরাসরি সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পর হরমুজ প্রণালীতে মোতায়েন থাকা পশ্চিমা সামরিক জোটের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক বিশ্বের।
হরমুজ নিয়ন্ত্রণর পূর্ণ অধিকার ইরানের আছে : রাশিয়া
জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে। একই সাথে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’ ও ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগ তুলেছেন।
জাতিসঙ্ঘে দেয়া বক্তব্যে নেবেনজিয়া বলেন, ‘ইরানের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে দেয়ার একটি চেষ্টা চলছে, যেন মনে হয় ইরানই তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা করেছে; কিন্তু যুদ্ধের সময় কোনো উপকূলীয় দেশ আক্রান্ত হলে নিরাপত্তার স্বার্থে তারা নিজ জলসীমায় জাহাজ চলাচল সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ পশ্চিমা দেশগুলোকে জলদস্যুদের সাথে তুলনা করে রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলায় সমর্থন দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আইন লঙ্ঘন করছে।
নেবেনজিয়া আরো বলেন, ‘জলদস্যুরা যেমন জাহাজে কঙ্কাল আঁকা কালো পতাকা উড়িয়ে আক্রমণ করে, পশ্চিমা দেশগুলো তেমনটা করে না। তারা তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে একতরফা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার (নিষেধাজ্ঞা) আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করছে।’
সৌদিতে উপসাগরীয় নেতাদের বৈঠক
এ দিকে রয়টার্স জানায়, ইরানি হামলার পাল্টা জবাব নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে সৌদি আরবের জেদ্দায় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বিশেষ বৈঠক শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জিসিসি নেতাদের ওই বৈঠক শুরু হয়েছে।
দুই মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরান যুদ্ধের অন্যতম নিশানায় পরিণত হওয়ার পর এই প্রথম উপসাগরীয় নেতারা সশরীরে বৈঠকে বসেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা বলেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। সেই হামলার সম্মিলিত জবাব তৈরির লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
যুদ্ধের ইরানি হামলায় জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বেসামরিক অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামলার ঘটনা কিছুটা কমেছে। তবে সঙ্ঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা এখন পর্যন্ত অনিষ্পন্ন থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলো পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়া নিয়ে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এ দিকে, যুদ্ধের বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করার অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমালোচনার মুখে পড়েছে জিসিসি। সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজিত এক সম্মেলনে দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, এটি সত্য, লজিস্টিক বা কারিগরিভাবে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো একে-অপরকে সমর্থন করেছে; কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আমার মনে হয় তাদের অবস্থান ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, আরব লীগের কাছ থেকে এমন দুর্বল অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল এবং আমি এতে অবাক হইনি; কিন্তু জিসিসির কাছ থেকে আমি এমন আশা করিনি এবং আমি এতে বিস্মিত হয়েছি।


