কুরআন–হাদীসের আলোকে রোযার প্রতিদান

কুরআন–হাদীসের আলোকে রোযার প্রতিদান

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : রমযানের সিয়াম কেবল একটি ফরয ইবাদতই নয়; এটি এমন এক আমল যার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে প্রদান করবেন—বিনা হিসাবে, অগণিতভাবে। কুরআন ও সহীহ হাদীস রোযার প্রতিদান সম্পর্কে যে সুসংবাদ দিয়েছে, তা মুমিনের হৃদয়কে আশা ও আলোর দীপ্তিতে ভরে তোলে।

১. রোযার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দিবেন

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

قال الله تعالى: كل عمل ابن آدم له إلا الصوم فإنه لي وأنا أجزي به
“মানুষের প্রত্যেক আমল তার নিজের জন্য, কিন্তু রোযা আমার জন্য; আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব।”
—সহীহ বুখারী: ১৯০৪; সহীহ মুসলিম: ১১৫১

অন্য আমলের সওয়াব দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়; কিন্তু রোযার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। কেননা এটি এমন ইবাদত, যা বান্দা একান্ত গোপনে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পালন করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তিকে সংযত করে সে প্রমাণ করে—তার রবের ভালোবাসাই সর্বোচ্চ।

২. বিনা হিসাবে পুরস্কার

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিতভাবে।”
—সূরা যুমার (৩৯): ১০

রোযা হলো ধৈর্যের মহড়া। তাই অনেক আলেম বলেন, এ আয়াত রোযাদারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার বিনিময়ে আল্লাহ অসীম প্রতিদান দান করবেন—যার পরিমাণ মানুষের কল্পনার অতীত।

৩. গুনাহ মাফের সুসংবাদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

من صام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
—সহীহ বুখারী: ৩৮; সহীহ মুসলিম: ৭৬০

এখানে দুটি শর্ত—ঈমান (বিশ্বাস) ও ইহতিসাব (আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা)। অর্থাৎ রোযা যেন কেবল সামাজিক প্রথা না হয়; বরং অন্তরের ইখলাসের প্রকাশ হয়। তখন রোযা হয়ে ওঠে গুনাহ মোচনের মাধ্যম।

৪. জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজা

নবী করীম ﷺ বলেছেন—

“জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোযাদাররাই প্রবেশ করবে।”
—সহীহ বুখারী: ১৮৯৬; সহীহ মুসলিম: ১১৫২

এটি রোযাদারদের জন্য বিশেষ সম্মান। দুনিয়ায় যারা আল্লাহর জন্য তৃষ্ণা সহ্য করেছে, আখিরাতে তারা চিরতৃপ্তির দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

৫. জাহান্নাম থেকে রক্ষা

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন—

الصيام جنة
“রোযা হলো ঢাল।”
—সহীহ বুখারী: ১৮৯৪

অন্য বর্ণনায় আছে—
“রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল।” (মুসনাদে আহমদ: ১৬২৭৮)

অর্থাৎ রোযা বান্দাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আখিরাতে আগুন থেকে বাঁচার কারণ হয়।

৬. কিয়ামতের দিন সুপারিশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে… এবং তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”
—মুসনাদে আহমদ: ৬৬২৬; মুসতাদরাকে হাকিম: ২০৮০

রোযা বলবে—“হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি, আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।” আর আল্লাহ সেই সুপারিশ কবুল করবেন। এ এক বিরাট প্রতিদান।

৭. দুআ কবুল ও বিশেষ আনন্দ

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন—

للصائم فرحتان…
“রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দ—ইফতারের সময়ের আনন্দ এবং রবের সাক্ষাতে রোযার কারণে আনন্দ।”
—সহীহ বুখারী: ১৯০৪; সহীহ মুসলিম: ১১৫১

এছাড়া ইফতারের সময় রোযাদারের দুআ কবুল হয় (ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩)। দুনিয়ায় সে যে সামান্য ক্ষুধা সহ্য করে, আখিরাতে তার বিনিময়ে পায় অফুরন্ত সুখ।

রোযা এমন এক ইবাদত, যার প্রতিদান সীমাহীন। এটি আল্লাহর সাথে বান্দার একান্ত সম্পর্কের প্রকাশ। এতে আছে গুনাহ মাফ, জান্নাতের সুসংবাদ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, দুআ কবুল এবং সর্বোপরি—আল্লাহর সন্তুষ্টি।

আসুন, আমরা রোযাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা না বানিয়ে তাকওয়ার পথে আত্মশুদ্ধির সোপান করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহীহ নিয়ত ও ইখলাসের সাথে সিয়াম পালনের তাওফীক দান করুন এবং তার অগণিত প্রতিদানের অংশীদার বানান।

আমীন।

Related Articles