পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের দেয়া নতুন গাজা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার ইসরাইলের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হাতে বন্দী থাকা ইসরাইলিদের পরিবারের সদস্যদেরকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি উইটকফের প্রস্তাবে রাজি আছেন।
ইসরাইলের চ্যানেল ১২, কান, ১২৪ এবং হারেৎজ এ খবর জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় পরে চ্যানেল ১২কে ‘প্রপাগান্ডা চ্যানেল’ আখ্যা দিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া, চ্যানেলটির এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রেকর্ডিং ডিভাইস পাচারের চেষ্টারও অভিযোগ করেছে। ইসরাইলি বন্দীদের পরিবারের সাথে নির্ধারিত একটি বৈঠকের আগে দিয়ে এই পাচারের চেষ্টা চলে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে বিবৃতিতে উইটকফের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে নেতানিয়াহুর রাজি থাকার খবর সরাসরি অস্বীকারও করা হয়নি। চ্যানেল ১২ থেকেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হামাস জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি এখনো পর্যালোচনায় রেখেছে, তবে বর্তমান রূপে এটি কার্যকর করা হলে এটি গাজায় ‘হত্যাকাণ্ড ও দুর্ভিক্ষের ধারাবাহিকতাই বজায় রাখবে।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বৃহস্পতিবার জানান, ইসরাইল প্রস্তাবটিতে সম্মতি দিয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ এই প্রস্তাব হামাসের বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছেন। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য বাসেম নাঈম রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব ‘আমাদের জনগণের কোনো দাবিই পূরণ করেনি, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুদ্ধ বন্ধ করা’। তিনি আরো বলেন, ‘তবুও আন্দোলনের নেতৃত্ব জাতীয় দায়িত্ববোধ থেকে প্রস্তাবের জবাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছে।’ হামাসের সিনিয়র নেতা সামি আবু জুহরি জানান, এই প্রস্তাবে ইসরাইলের যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা কিংবা অবরুদ্ধ এলাকায় মানবিক সহায়তা অবাধে প্রবেশের নিশ্চয়তা কিছুই নেই।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী দখলদার ইসরাইলের সাথে হামাসের ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হবে। এই সময়ে ১০ জীবিত ইসরাইলি বন্দীকে মুক্তি এবং ১৮ মৃত বন্দীর লাশ ফেরত দেবে হামাস। বিপরীতে দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিনি বন্দীদের তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দেবে। এ ছাড়া যেসব ফিলিস্তিনির লাশ তারা আটকে রেখেছে সেগুলোর কিছু ফেরত দেবে। হামাসের এক কমান্ডার বিবিসিকে গতকাল শুক্রবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া এ প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, প্রস্তাবটিতে যুদ্ধ স্থায়ী বন্ধের সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা নেই। এ ছাড়া গাজা থেকে দখলদার সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। যুদ্ধবিরতি চলার সময় কিভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে, কতটা প্রবেশ করবে সেটিও নির্দিষ্ট নয়।
বিবিসির গাজা প্রতিনিধি রুশদি হামাসের এই কমান্ডারের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি বর্তমানে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছেন। হামাসের যে প্রতিনিধিদলটি যুদ্ধবিরতি আলোচনা করছে সেটির অংশ এ কমান্ডার। সাংবাদিক রুশদি জানিয়েছেন, হামাস কমান্ডার তাকে বলেছেন- প্রথমত: প্রস্তাবে স্পষ্ট করে বলা নেই এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিটি একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘ যুদ্ধবিরতিতে পরিণত হবে কি না। যেটির মাধ্যমে যুদ্ধ স্থায়ী বন্ধ হবে। দ্বিতীয়ত: মানবিক সহায়তা কিভাবে প্রবেশ করবে, কোনো কোনো সহায়তা প্রবেশ করবে সেটি স্পষ্ট নয়। তৃতীয়ত: সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির সময় ইসরাইলি সেনারা যেখানে ছিল সেখানে ফিরে যাবে কি না তাও স্পষ্ট নয়। হামাস জানিয়েছে, এতদিন যেসব শর্ত নিয়ে তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে, নতুন প্রস্তাবে সেগুলোর অনেক কিছুই নেই। যেগুলো নিয়ে পূর্বে আলোচনা হয়েছে সেগুলো প্রস্তাবে রাখা হয়নি। হামাসের ওই কমান্ডার বিবিসির এই সাংবাদিককে বলেছেন, ইসরাইল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ‘বিনামূল্যে’ তাদের বন্দীদের ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। এই ফাঁদে হামাস পা দেবে না।
গাজায় ইসরাইলি হামলায় আরো ১৮ জন নিহত
গাজায় ইসরাইলি হামলায় আরো ১৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা। উত্তরাঞ্চলে শুক্রবার সকালে ইসরাইলি বাহিনী লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য আদেশ দেয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গাজায় আরো ১৮ জনের প্রাণ গেছে। ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় তারা নিহত হয়েছেন। গাজা উপত্যকায় উত্তর দিকে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি বোমা হামলায় অন্তত দু’জন নিহত হয়েছেন। আল জাজিরার সংবাদদাতা বিষয়টি জানান। ইসরাইলি বাহিনী বৃহস্পতিবার উত্তর গাজার আল-আওয়াদা হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দেয়। গাজায় বোমা হামলা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ক্ষুধার্ত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। এদিকে মধ্য গাজায় বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের স্থাপন করা ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে সাহায্যপ্রার্থীদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালিয়েছে। গুলিতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি ফ্রান্সের
গাজায় তীব্র মানবিক সঙ্কট নিরসনে পদক্ষেপ না নিলে ইসরাইলি নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দেয়ার হুমকি দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। শুক্রবার সিঙ্গাপুর সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওয়াংয়ের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মানবিক অবরোধ একটি অস্থির ও অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। যদি কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আরো কঠোর করতে হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইসরাইলের তিন মাসব্যাপী অবরোধে গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, প্রতি পাঁচজনের একজন চরম খাদ্যসঙ্কটে রয়েছে।
উত্তর গাজায় নতুন উচ্ছেদ নির্দেশ ইসরাইলি সেনাবাহিনীর
ইসরাইলি সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার উত্তর গাজার বেশ কয়েকটি এলাকার ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ছেড়ে পশ্চিম দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে ইসরাইল গাজা উপত্যকার স্থায়ী দখলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেল আনাদোলু এজেন্সি জানায়, ইসরাইলি সামরিক মুখপাত্র আভিচায় আদরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এক বার্তায় একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। সেখানে আল-আতাত্রা, জাবালিয়া, শুজাইয়া, দারাজ এবং জেইতুন এলাকাগুলোকে ‘উচ্ছেদ অঞ্চল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, এই এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযান তীব্রতর হবে। তাই এখানকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জোরালো আহ্বান জাপান-কুয়েতের
ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্কট নিরসনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা এবং কুয়েতি যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ। গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত বোমা হামলার মধ্যেই সঙ্কট নিরসনে তারা এই আহ্বান জানালেন। তারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন। এ তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর। বৃহস্পতিবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা এবং কুয়েতি যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ টোকিওতে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।


