গাজা সিটি দখলে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল

গাজা সিটি দখলে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইসরাইলি বাহিনী গাজা সিটিতে আল-আহলি হাসপাতালে বোমা হামলা চালিয়েছে, এতে সাতজন নিহত হয়েছেন। একই সাথে সামরিক বাহিনী শহরটি দখল করার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং ১০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণের কেন্দ্রীভূত এলাকায় জোরপূর্বক স্থানান্তর করার প্রস্তুতি চলছে। আলজাজিরা।

প্যালেস্টাইন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি অবরোধ ও ত্রাণের অভাবে আরো ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫১ জনে, যাদের মধ্যে ১০৮ জন শিশু। ইসরাইলে হাজার হাজার মানুষ তেল আবিবে বিক্ষোভ করেছে। তারা গাজায় যুদ্ধ বন্ধের এবং হামাসের কাছে বন্দি রাখা ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ নিয়ে নিন্দার ঢেউ চলছে। বিশেষ করে আলজাজিরার সাংবাদিকদের হত্যার পর এই মাত্রা আরো বেড়েছে। ইসরাইলের গাজা যুদ্ধের ফলে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬১ হাজার ৮২৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৫৫ হাজার ২৭৫ আহত হয়েছেন।

গাজা সিটি থেকে ফিলিস্তিনিদের সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইল : ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ গাজা সিটি থেকে দক্ষিণ গাজায় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি উপত্যকাটির বৃহত্তম নগরকেন্দ্র গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ দখলের জন্য নতুন আক্রমণের ঘোষণা দেওয়ার কয়েকদিন পরই এ ঘোষণা এলো। খবর আল জাজিরার।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচায় আদরাই শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো কারেম আবু সালেম বা কেরেম শালোম ক্রসিং দিয়ে বাসিন্দাদের তাঁবু এবং অন্যান্য আশ্রয় সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। জাতিসঙ্ঘ এই পরিকল্পনা বা মানবিক সহায়তা প্রদানে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা দখলের ঘোষণা দেওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে আসা এই বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনীকে হামাসের অবশিষ্ট দুটি শক্ত ঘাঁটি ‘ভাঙা’র জন্য সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। যার একটি উত্তরে গাজা সিটি এবং দক্ষিণে আরো আল-মাওয়াসিতে।

জাতিসঙ্ঘ তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলি ঘোষণার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা এগিয়ে গেলে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হাজার হাজার পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

এদিকে হামাসের মিত্র ফিলিস্তিনি সংগঠন ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এ ঘোষণাকে ‘গাজা সিটি দখলের নৃশংস আক্রমণের অংশ’ এবং ‘আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি স্পষ্ট এবং নির্লজ্জ উপহাস’ বলে বর্ণনা করেছে। পিআইজে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ক্ষুধা, গণহত্যা এবং বাস্তুচ্যুতির মধ্যে মানুষকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। গাজায় অপরাধমূলক আচরণ দখলকৃত পশ্চিম তীরে দখলদারদের সংঘটিত দৈনন্দিন অপরাধের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ’ গত সপ্তাহে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা শহরের উপকণ্ঠে অভিযানের তীব্রতা বাড়িয়েছে। জেইতুন এবং শুজাইয়া এলাকার বাসিন্দারা ইসরাইলি বিমান এবং ট্যাঙ্কের তীব্র গুলিবর্ষণের খবর পেয়েছেন।

ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসরাইলি একটি ড্রোন পূর্ব গাজার জয়তুন এলাকার আসকাউলায় আঘাত হানে, এতে দু’জন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায়ও শনিবার হামলা চালানো হয়। যুদ্ধের শুরুর দিকে এ এলাকাকে তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু তারপরও এখানে একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গাজার বাসিন্দাদের জন্য সব ধরনের ভ্রমণ ভিসা স্থগিত : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক চরম দক্ষিণপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারের একের পর এক পোস্টের পর গাজাবাসীদের জন্য সব ধরনের ভ্রমণ ভিসা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দেয়। খবর এএফপির। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে এক পোস্টে বলেছে, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সীমিতসংখ্যক অস্থায়ী চিকিৎসা-মানবিক ভিসা দেওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া ও নীতিমালা ব্যবহার করা হয়েছে, আমরা তার পূর্ণ ও বিস্তারিত পর্যালোচনা করছি। এ সময় গাজার বাসিন্দাদের জন্য সব ভ্রমণ ভিসা বন্ধ থাকবে।’

ওই ইনফ্লুয়েন্সারের নাম লরা লুমার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। লুমার গত শুক্রবার এক্সে গাজার ফিলিস্তিনিদের যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ ভিসা দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে একের পর এক পোস্ট দেন। লুমার বর্ণবাদী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার ও ৯/১১ হামলা ‘ভেতরের কাজ’ ছিল বলে দাবি করার জন্যও পরিচিত। লরা লুমার এক্সে শুক্রবার তার পোস্টগুলোতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি গাজার ফিলিস্তিনিদের ভ্রমণ ভিসা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের ‘হামাসপন্থী… মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কাতারের কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্ত’ বলে বর্ণনা করেন। যদিও তিনি তার এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

লুমারের সমালোচনার তির ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা হিল প্যালেস্টাইন। গত সপ্তাহে সংস্থাটি বলেছে, তারা গাজার গুরুতর আহত ১১টি শিশুকে নিরাপদে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার জন্য পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। ওই শিশুদের সাথে তাদের পরিচর্যাকারী ও ভাইবোনেরা রয়েছে। লুমারের সমালোচনার তির ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা হিল প্যালেস্টাইনের দিকে। গত সপ্তাহে সংস্থাটি বলেছে, তারা গাজার গুরুতর আহত ১১টি শিশুকে নিরাপদে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার জন্য পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। ওই শিশুদের সাথে তাদের পরিচর্যাকারী ও ভাইবোনেরা রয়েছে। হিল প্যালেস্টাইন তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, এটা গাজা থেকে একবারে বেশিসংখ্যক আহত শিশুকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ঘটনা।

এ নিয়ে এক্সে এক পোস্টে লুমার লেখেন, ‘সত্যিই অগ্রহণযোগ্য। মার্কো রুবিও (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) যখন খুঁজে বের করবেন কে ওই ভিসাগুলো অনুমোদন করেছে, তখন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউকে বরখাস্ত করতে হবে।’ তিনি আরো লেখেন, ‘কাতার গাজার এসব বাসিন্দাকে কাতার এয়ারওয়েজে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে। কাতার আক্ষরিক অর্থেই আমাদের দেশ ‘সন্ত্রাসী’ দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে।’ লুমার সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের স্টাফদের সঙ্গে কথা বলার কথাও বলেছেন। তিনি বলেন, ওই গাজাবাসীরা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার ভিসা পেলেন, তারা তা খতিয়ে দেখছেন। ভিসা স্থগিতের ঘোষণার পর রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র‌্যান্ডি ফাইন স্পষ্টভাবে লুমারের প্রশংসা করেছেন। রথ্যান্ডি ফাইন এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ‘এটি উদ্ঘাটন করার জন্য এবং আমাকে ও অন্য কর্মকর্তাদের সচেতন করার জন্য লরা লুমার বড় প্রশংসার দাবিদার। ভালো কাজ, লরা।’

কাতার গাজার এসব বাসিন্দাকে কাতার এয়ারওয়েজে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে। কাতার আক্ষরিক অর্থেই আমাদের দেশ ‘সন্ত্রাসী’ দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক ও অমানবিক’ বলে বর্ণনা করে তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, গত ৩০ বছরে তারা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘গাজার শিশুদের বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম একটি উপায়, তাদের চিকিৎসার জন্য উদ্ধার করা। অন্যথায় গাজার ধসে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতে তাদের কল্পনাতীত কষ্ট সহ্য করতে হবে বা তারা মারা যাবে।’

ইসরাইলি বর্বরতায় গাজায় আরো ৭০ ফিলিস্তিনি নিহত : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বর্বরতা চলছেই। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে আরো ৭০ জন ফিলিস্তিনি হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। আহত হয়েছেন আরো কমপক্ষে ৩৮৫ জন। এর মধ্য দিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬১ হাজার ৮৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে আটটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া আরো ৩৮৫ জন আহত হয়েছে, যার ফলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের গণহত্যামূলক আগ্রাসনে মোট আহতের সংখ্যা এক লাখ ৫৫ হাাজার ৬৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে বা রাস্তায় আটকে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী মানবিক সাহায্য নিতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ত্রাণ নিতে গিয়ে ২৬ জন নিহত এবং ১৭৫ জন আহত হয়েছে। গত ২৭ মে থেকে ইসরাইলি বাহিনী এক হাজার ৯২৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ১৪ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছে।

Related Articles