রাজধানী ঢাকার আফতাব নগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসা মসজিদে পাঁচ দিন (১-৫ রমজান) নফল ই’তিকাফে বসেছেন জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার, মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
সোমবার (৩ মার্চ) ২য় রমজানে তারাবিহ নামাজের পর নফল ইতিকাফরত আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসল্লিদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করেন তিনি। পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য বয়ানের সারাংশের বঙ্গনুবাদ তুলে ধরা হলো–
গতকাল আল্লাহ তায়ালার মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে কথা বলছিলাম। আরও আলোচনা হয়েছিল ফিতনার ব্যাপারেও। আমি বিশ্বাস করি যে, সকল ক্ষমতা ও সকল সিদ্ধান্ত মহান আল্লাহর হাতে। এটাই আমাদের ঈমান। যদি এই আকিদা বা বিশ্বাস না থাকে, তাহলে ঈমান থাকবে না।
আপনারা জানেন, কিছু জিনিসের স্বীকৃতি দেওয়ার নাম ঈমান। যেমন কিছু বিষয় মানা ঈমানের অংশ, তেমনি কিছু জিনিস অস্বীকার করাও ঈমানের অংশ। উদাহরণস্বরূপ—
আল্লাহ তায়ালার কোনো শরীক হতে পারে না।
নবী ﷺ-এর পরে আর কোনো নবী আসবে না।
কুরআন পরিপূর্ণ, এতে কোনো সংযোজন বা পরিবর্তন সম্ভব নয়।
কোনো ইমাম নতুন কোনো আয়াত নিয়ে আসতে পারেন না।
মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম হবে না।
এই বিষয়গুলো আমরা কখনোই স্বীকার করি না। যেমন কিছু জিনিস মানা জরুরি, তেমনি কিছু জিনিস অস্বীকার করাও জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেন:
“হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর।”
অর্থাৎ, দ্বীনের একটি অংশ মানা এবং আরেকটি অংশ না মানা যাবে না। যদি আমরা ইসলামের কিছু অংশ মানি আর কিছু অংশ না মানি, তাহলে দ্বীনের অপূর্ণতা থেকে যাবে এবং সমস্যা সৃষ্টি হবে।
আমাদের অন্তরের অবস্থা সব সময় একই রকম থাকে না। কখনো দ্বীনের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, আবার কখনো কমে যায়। এর মূল কারণ হলো, আমাদের অন্তর পরিবর্তনশীল। এটি দ্রুত অবস্থান বদলায়।
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন:
“আমি অন্তরের চেয়ে বেশি পরিবর্তনশীল কিছু দেখিনি। কারণ এটি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।”
যেমন, রমজান মাস আসলে আমরা ভালো কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ি। চারদিকে ভালো কাজের পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষ বাধ্য হয়ে অনেক ভালো কাজ করে। কারণ, এখন আর কেউ প্রকাশ্যে খেতে পারে না, যা অন্তরেও পীড়াদায়ক মনে হয়। রমজানের কারণে খারাপ কাজ থেকেও অন্তর বেঁচে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই অন্তরকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? কিভাবে এটিকে সঠিক পথে রাখা যায়? যাতে এটি পথ হারালে আবার সহজেই ফিরে আসতে পারে?
এর উত্তর হলো, নবী ﷺ-এর আদেশ ও সুন্নতের অনুসরণ করা।
নবী ﷺ আমাদের জন্য এমন একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, যা অনুসরণ করলে মানুষ সহজেই ভালো কাজে অভ্যস্ত হতে পারে এবং অন্তরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কারণ, অন্তর এমন এক বস্তু, যা ব্যাঙের মতো লাফিয়ে চলে—এটি সহজে বশ মানতে চায় না।
আর অন্তরকে স্থির রাখতে সাহায্য করে আল্লাহর জিকির।
আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে রুহের প্রশান্তি আসে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। তিনি বলেন:
“তুমি আমাকে একবার স্মরণ করলে, আমি তোমাকে দশবার স্মরণ করব। তুমি যদি জনসমক্ষে আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাকে আরও বৃহৎ জনসমক্ষে স্মরণ করব। তুমি যদি আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসো, আমি তোমার দিকে দশ হাত এগিয়ে আসব।”
যারা জিকির করে না, তাদের জন্য যে কঠিন শাস্তির কথা এসেছে, তা এখানে উল্লেখ করলাম না। কারণ, অনেকে বলে থাকেন যে, এসব শাস্তি কাফেরদের জন্য, মুমিনদের জন্য নয়। অথচ প্রকৃত মুমিন সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকে।
জিকির করার সঠিক নিয়ম কী?
সহীহ নিয়তের সঙ্গে নিয়মিত জিকির করা সবচেয়ে উত্তম।
একবারে হাজার লিটার পানি ঢেলে দিলে পাথরে কোনো প্রভাব পড়ে না, কিন্তু প্রতিদিন একটি করে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তে থাকলে তাতে দাগ তৈরি হয়।
তাই জিকিরেও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
অতিউৎসাহী হয়ে একদিন অনেক জিকির করা এবং পরের দিন কিছুই না করা কাম্য নয়।
বরং উচিত প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জিকির করা এবং তা অব্যাহত রাখা।
যদি কেউ ধারাবাহিকভাবে জিকির করে, তবে সে নিজেই পার্থক্য অনুভব করবে। কারণ তখন সে নিজের ইচ্ছায় আল্লাহকে স্মরণ করবে, বাধ্য হয়ে নয়।
যারা জিকিরের মাধ্যমে একবার একটি ভালো অবস্থান তৈরি করে, কিন্তু পরে তা ছেড়ে দেয়, তারা সেই অবস্থান হারিয়ে ফেলে। তবে, তারা যদি তাওবা করে ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহ তাদের মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন।
জিকিরের সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি কী?
কুরআন হলো সর্বোত্তম জিকির।
তাই নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত।
অন্যান্য জিকিরও ভালো, তবে কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব সবার আগে।
এ বিষয় ২টা কথা বলতে চাই। প্রথমত অবশ্যই জিকির করতে হবে এবং নিয়মিত করতে হবে। যদি নিয়মিত জিকির না করা যায় অথবা জিকির ছুটে যায়, তাহলে বুঝতে হবে অন্য কোনো সমস্যা হচ্ছে আমাদের জীবনে।
আমাদের প্রত্যেকের সাথে মোবাইল আছে। আমার সাথে আছে। আপনাদের সাথে আছে। সবার সাথে আছে। আগে গুনাহ করতে হলে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো। এখন গুনাহের আসবার আপনার-আমার পকেটে চলে এসেছে। আগে আমাদের মধ্যে ভালো লোকেরা ঘরে টিভি রাখতেন না। এখন তো টিভিরও দরকার নেই। খারাপের দিক দিয়ে যদি মোবাইল ও টিভির প্রার্থক্য করা হয়, তাহলে দেখা যাবে মোবাইলের তুলনায় টিভি অনেক ভালো জিনিস। অবশ্যই টিভিও খারাপ জিনিস। কিন্তু টিভির তুলনায় মোবাইল আরও খারাপ। সুতরাং আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে আপনার দ্বারা কোনো গুনাহ হচ্ছে না তো? সেই গুনাহ বাজারে গিয়ে হোক অথবা মোবাইলের কারণে হোক।
মোবাইলের মাধ্যমে অজান্তেই গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মোবাইলে ভালো জিনিসও চলে আসে। মানুষকে অস্থির করে তোলে। মনযোগ নষ্ট করে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে ব্যঘাত ঘটায়।
এ হলো এক বিষয়। জিকির কেন ছুটে যাচ্ছে? অথবা কেন জিকিরে মন বসছে না তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। যদি আমরা কারণ খুঁজে পাই, তাহলে সামনে আগানো এবং এর উপর অটল থাকা সহজ।
জিকিরের মাধ্যমে রূহানী ফায়দা তো অবশ্যই হবে। সাথে সাথে শারীরিক ফায়দা অনুভব করতে পারবেন। জিকিরের মাধ্যমে অনেক শারীরিক রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। আজকের জামানায় যেসব নতুন রোগের আগমন হচ্ছে, তার অর্ধেকের বেশি রোগ মানুষের ভুল চিন্তার কারণে হয়ে থাকে। যদি চিন্তা ঠিক হয়ে যায়, চিন্তার ডাইরেকশন ঠিক হয়ে যায়, অন্তরে সুকূন চলে আসে, আত্মিক শান্তি লাভ হয়, তবে বেশিরভাগ রোগ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। রূহানী বিমারী থেকে মুক্তির প্রভাব শরীরের মাঝেও দৃশ্যমান হবে।
বিষয়টাকে এভাবে বুঝে নিন। যদি অন্তরে হিংসার পরিমান কমে যায়, পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেলে তো সুবহানাল্লাহ। সবচেয়ে বড় রোগ বদ নিয়্যতের কারণেই হয়ে থাকে। অন্তরে হিংসার পরিমান কমে গেলে আল্লাহ তাআলা সেই বড় রোগ থেকেই বাঁচাবেন। অন্তরে হিংসা নিয়ে সেই বড় রোগ থেকে কীভাবে বাঁচবেন?
যদি হিংসা থেকে বেঁচে থাকা যায়, তাহলে জাহেরী-বাতেনী অনেক রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। আপনার ব্যাক্তিত্বই বদলে যাবে। আপনার ব্যাপারে মানুষের ধারণা পাল্টে যাবে। অন্যদের মাঝেও আপনার ব্যক্তিত্বের প্রভাব ভেসে উঠবে। এসব কিছু হবে যদি শুধু হিংসা থেকে বেঁচে থাকা যায়। আমাদের কী নিয়ে মোকাবেলা? হিংসার কারণেই অহংকারের সৃষ্টি হয় অথবা অহংকারের কারণে হিংসার সৃষ্টি হয়। ২টার মধ্যে কোনো একটা তো অবশ্যই।
গুরুত্বের সাথে আমরা খুঁজে দেখবো আমাদের মাঝে কীসের কমতি আছে? কোন রোগ আছে? কী দুর্বলতা আছে? কেন আমার রাগ হলো? তখন বুঝতে পারবেন আমাদের মাঝেও দুর্বলতা আছে। সেই দুর্বলতাকেই দূর করতে হবে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাজ করতে হবে। আমাদের অন্তর ঘুমিয়ে আছে। উদাসীনতার মধ্যে আছে। তাকে উদাসীনতার বাইরে নিয়ে আসতে হবে। ঘুমন্ত এই অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
যত বেশি আপনি আল্লাহর জিকিরে অথবা দ্বীনের খেদমতে থাকবে,ন বিপদের আশঙ্কা ততোই বেশি। যতবেশি মেহনত করে আপনার আত্মিক উন্নতি সাধন হবে, শয়তান আপনার ব্যাপারে ততো বেশি তৎপর হবে। সে পেরেশান হয়ে যাবে। স্থির থাকতে পারবে না। বিভিন্ন উপায়ে আপনাকে বুঝাবে, ওয়াসওয়াসা দিবে—অমক অনেক বড়ো মাদ্রাসা দিয়েছে। তুমি পেছনে রয়ে গেছো। কে বলেছে আমি পিছিয়ে আছি? আল্লাহ তাআলা আমার ছোটো খেদমতকেও কবুল করে নিতে পারেন। যদি অনেক বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে ফেলি, আমাদের কী লাভ তাতে যদি কবুলেই না হয়। যদি ছোটো একটা কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায় তাহলেই আমরা কামিয়াব। আমাদের উদ্দেশ্য বড় কাজ করা নয়, আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর দরবারে কাজকে কবুল করানো। এটাই আমাদের তামান্না হওয়া উচিত।
হযরত মীর যুলফিকার সাহেব দা. বা. বলেন—ব্যক্তির যোগ্যতার দরকার নেই, কুবুলিয়্যাত থাকাটাই বড় কথা। যদি কেউ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়, তাহলে তো আল্লাহ তাআলা নিজে যোগ্যতা পয়দা করে দিবেন। আমি কোনো এক জায়গায় কারো লেখা একটি দোয়া পড়ছিলাম। সেখানে লেখা ছিলো—হে আল্লাহ, আপনি আমার যোগ্যতা অনুসারে কাজ নিয়েন না। আপনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ নিন। এখন আল্লাহ যদি ফায়সালা করেন, তিনি তো বড় ফায়সালাই করবেন। তিনি তো সবার বড়ো। বাদশাহের বাদশাহ। তিনি কীভাবে ছোটো ফায়সালা করবেন? আপনি এমন কথা কেন বলবেন যে, হে আল্লাহ আপনি আমার মাঝে কাজের যোগ্যতা দিয়ে দিন। আমি তো বলবো—হে আল্লাহ, আপনি শুধু ফায়সালা করুন এবং সেই অনুযায়ী আমার দ্বারা কাজ নিন। আমি তো কিছুই না। আমার তো কোনো ক্ষমতাই নেই।
এ ২টি বিষয় খুবই জরুরী। ধারাবাহিকতা ও গুরুত্ব। এই ২টার মধ্যে সবচেয়ে জরুরী ধারাবাহিকতা। যদি ধারাবাহিকতা না থাকে তাহলে কোনো লাভ নেই। শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সে ধারাবাহিকতাকে বন্ধ করে দেয়।
আপনি নিজের মাঝে খুঁজে দেখুন আপনার কোনো রূহানী রোগ রয়েছে? আপনি হিংসা করছেন। এর মাধ্যমে রূহানী রোগ তো হচ্ছেই, শারীরিক রোগও হচ্ছে। সবসময় আপনি মিথ্যা বলছেন। লোক দেখানোর জন্য কাজ করছেন। লোক দেখানো কাজ করলে তো আল্লাহর কাছে কিছুই পাবেন না। একটি আমল না-মঞ্জুর হয়েছে বিষয়টা এতটুকুই নয়। এটার চেয়ে বড় ক্ষতি এই যে, না-মঞ্জুর হওয়ার সাথে সাথে শাস্তিও পেতে হবে। বলা হবে, তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দাও। সে দেখানোর জন্য কুরআন পাঠ করেছিলো। সে সম্পদ ব্যায় করেছে লোক দেখানোর জন্য। সে জিহাদ করেছে দেখানোর জন্য যেন তাকে গাজী বা শহীদ বলা হবে।
আপনি নিজেকে নিয়ে ভাবুন। নিজেকে নিয়ে ভাবলেই লাভ। নিজেকে সংশোধন করুন। নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে সংশোধনের কাজ করুন। কখনো ছেড়ে দিবেন না। সবসময় জিকির করবেন। চোখের হেফাজত করবেন। হালালের সাথে থাকবেন। সুন্নতের উপর অটল থাকবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের কামিয়াব করুন। আমীন


