নূর নবীজীর দেশে।। পর্ব-২

নূর নবীজীর দেশে।। পর্ব-২

  • মুহাম্মাদ আইয়ুব

ইমিগ্রেশন শেষ করে একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। শুভ্র- সফেদ ইহরামের কাপড় পরা মুরব্বি গোছের দু’জন আল্লাহর মেহমান কার জন্য যেন অপেক্ষা করছেন। আশ্চর্য! জীবনের এই পড়ন্ত বেলায়ও মুখে নির্মল হাসি লেগে আছে। হাল পুরসির পর জানলাম তারা পাকিস্তানের পেশোয়ারের বাসিন্দা। কৌতূহলী হয়ে ইমরান খান, কাদিয়ানীদের বর্তমান অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চাইলাম।

কিন্তু তাদেরকে এ ব্যাপারে একদম বেখবর মনে হল। কিছুটা অবাকই হলাম। তবে আমাকে হতাশ না করে খুশি করে দিলেন তাদের কম বয়ষ্কজন। ফোকলা দাঁতে দারুণ এক কথা বলে ফেললেন, তুমি তো খুব ভাগ্যবান। নবীজীর দেশে নেমেই লাইভে বাইতুল্লাহর ফজরের আজান শুনে ফেললে! তাঁর কথা শুনে মনে হল, আকাশের চাঁদখানা যেনো আমার হাতে তুলে দিলেন। জাযাহুল্লাহু খাইরান আহসানাল জাযা।

চেইন থেকে লাগেজ নামাতে দেরি হল অনেক। কাফেলায় আমরা যুবক মাত্র দুইজন। বাকি সব মুরব্বি আর নারী সদস্য। তাই খেদমতের সৌভাগ্য আমরা আমাদের মালিকানায় নিয়ে নিলাম। এবার ফজরের নামাজ পড়ে নিতে হবে। আরবের বুকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আনন্দ! বোকার মত কেন দেরি করছি? অযুর জন্য পুরুষদের ওয়াশব্লকে গিয়ে চটজলদি বের হয়ে এলাম। ভাবলাম এটা শুধুই ওয়াশব্লক, অজুখানা অন্যখানে। অনেক তালাশ করে জানলাম এখানেই অযু এখানেই ওয়াশ। মনমরা আমি আবার ঢুকলাম সেখানে। মাত্র দুইটা বেসিন মানুষ অনেক। প্রচণ্ড ভিড়ে তাড়াহুড়ো করে হাজ্বীগণ অযু করছেন। দৃশ্যটা অসুন্দর। পা ধুতে বেসিনে যখন পা তুলছেন তখনই বাঁধছে যত বিপত্তি। আলজেরিয় এক হাজ্বী সাহেবের নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত ঝরছে দেখে মায়া হল। আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে নূর নবীজীর দেশের সমালোচনা করা বেমানান। তাই নীরবতাকে অলংকার বানিয়ে নিলাম। হাজ্বী সাহেবদের কষ্ট না দিয়ে অযু সারলাম তবে দেশীয় অভ্যেস কি এক সফরে ভুলা যায়!

আরবের আলো গায়ে মাখার আনন্দে আমি আত্মহারা। মনে হচ্ছে এ আলো জান্নাত থেকে এসেছে।

দেয়াল ঘেঁষে এক জায়গায় ফজর নামাজ আদায় করলাম। নবীর দেশে নামাজ পরার যে আনন্দ পাঠক সেটা তো কলম কালি দিয়ে প্রকাশ করা অসম্ভব। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ঠাণ্ডা শরবতের আনন্দ উপভোগ্য তবে বিবরণযোগ্য নয়। বিমানবন্দর থেকে হাজ্বী সাহেবদের বের হওয়ার দৃশ্য ছিল অসাধারণ। আচ্ছা! আমি ও তাহলে এই পুন্যবান মানুষদের কাতারের একজন? মনে হল, জান্নাতে যাওয়ার মিছিল এমনই হবে। (আহ! আল্লাহ কবুল কর। যারা আমার সাথে, আমার লেখার সাথে তাদেরকে ও কবুল কর। )

কারো মুখে বিষাদ, কষ্টক্লেষ বেদনা কিছুই নেই। সবার দৃষ্টি খুঁজে ফিরছে পরম কাঙ্ক্ষিত আলোকিত সেই বস্তু প্রাপ্তির। জান্নাতি আনন্দে সবাই আহ্লাদিত উচ্ছ্বসিত। এইতো খানিকবাদে তৃষিত চোখ নিবারিত হবে কালো গিলাফে আবৃত আল্লাহর ঘরের দিদারে। সব শোক গ্লানি কষ্ট মুছে যাবে এক নিমিষে। কেমন হবে মনের অবস্থা তখন! আবেগের আতিশয্যা কোথায় পৌঁছবে? অন্যান্য হাজ্বীদের খেদমতে নিজেকে সঁপে দিলাম। দুই তিন জনের ট্রলি একাই ঠেলে নিয়ে চললাম। যুবক বয়সে হারামাইন শরিফাইনের সফরে আসতে পেরে বারবার আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করছিলাম। আর শ্রদ্ধেয় কামাল ভাইয়ের জন্য দোয়া করা সেটা তো স্বয়ংকৃত হয়ে গিয়েছে।

কারো মুখে বিষাদ, কষ্টক্লেষ বেদনা কিছুই নেই। সবার দৃষ্টি খুঁজে ফিরছে পরম কাঙ্ক্ষিত আলোকিত সেই বস্তু প্রাপ্তির। জান্নাতি আনন্দে সবাই আহ্লাদিত উচ্ছ্বসিত।

বাহিরে পা রাখতে রাখতে ভোরের আঁধার কেটে চারিদিক ফর্সা হয়ে গিয়েছে। ঝকঝকে তকতকে পরিচ্ছন্ন আরব ভূমি। আরবের আলো গায়ে মাখার আনন্দে আমি আত্মহারা। মনে হচ্ছে এ আলো জান্নাত থেকে এসেছে। এ আলো মুক্তির আহবান করছে। এ আলো পরিশুদ্ধ করার নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এ আলো পবিত্র জীবনের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

এ আলো গায়ে মাখতেন নবীজী সা.। হযরত আবু বকর রা. হযরত ওমর রা. তো এ আলো গায়ে মেখে বড় হয়েছেন। আর আমিও আজ সে আলোর সন্ধানে নেমে এসেছি নবীজীর দেশে সাহাবীদের পুন্যভূমিতে। আমি তাহলে আরবের মুসাফির? সত্যি স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে সবকিছু। আরব ভুমিতে নিজেকে আবিষ্কার করার খুশির প্রকাশ কিভাবে করলে আমার রবের শুকরিয়া আদায় হবে জানা নেই।

নাহ, হবে না। তা কী করে হয়? বাংলাদেশ থেকে আরবে চলে এসেছি? না আমি আসিনি আমার আল্লাহ আমাকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহুমা লাকাল হামদু কুল্লুহু আল্লাহুম্মা লাকাশ শুকরু কুল্লুহু।

এখানকার বাসগুলোর চেহারা সুরত ফিটনেস বড়ই সুন্দর। পার্কিং সিস্টেম অসাধারণ লেগেছে। চারিদিকে বাহারি ফুলের সমাহার। কবুতরের ওবাধ আনাগোনা । ট্যাক্সিগুলো ঝকঝকে তকতকে নামিদামি ব্রান্ডের। যাত্রী নিয়ে মাথাব্যাথা নেই বরং যাত্রীরাই তাদের খুঁজে নিচ্ছে চরম আগ্রহে। ভীড়ভাট্টা হৈচৈ বলতে তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। মুআল্লিম সাহেবের সাহায্যে আমরা আমাদের বাস খুঁজে পেলাম। ১৫ সদস্যের কাফেলা নিয়ে বিশাল বাস ছেড়ে দিল। আমি তো অবাক! বাকি সিটগুলো ফাঁকা থাকবে? হ্যাঁ, ফাঁকাই থেকে গেল। মেহমান চলে এসেছেন আর কার অপেক্ষা?

দিনের জেদ্দা শহর অসাধারণ। বিশাল এলাকাজুড়ে রোড আর ফ্লাইওভার। এই প্রথম ফ্লাইওভার কি জিনিস বুঝলাম। আলীশান অট্টালিকা আর ইমারাতে ঢাকা পড়েছে মরু জীবন। এই তো সেই জেদ্দা যেখান থেকে সাহাবায়ে কেরাম হাবশায় হিজরত করেছিলেন। কল্পনায় হারিয়ে গেলাম, কেমন ছিল তখন আর যেমন দেখছি এখন। মনটা বারবার ছুটছিল ১৪ শত বছর আগের সেই নূরানী কাফেলায়। ও গো মালিক! শামিল করে দিও পূর্বসূরিদের নূরানী সেই মিছিলে, আমিন।

রাস্তার পাশে বসানো প্রতিটি বোর্ডে যত্নসহকারে চোখ বুলাচ্ছিলাম ; তীরচিহ্ন কোনটা কোন দিক গেল। পিপাসার্ত চোখ দুটি একটি লেখা বারবার খুঁজে ফিরছে। মক্কা আর কত দূর? কা’বা তুমি কোথায় ?

ক্রমশ

লেখক, শিক্ষক ও মাদরাসা পরিচালক