পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আজ পবিত্র শবেমেরাজ। ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে শবেমেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত এবং ‘মেরাজ’ অর্থ ঊর্ধ্বগমন। শবেমেরাজের অর্থ দাঁড়ায় ঊর্ধ্বগমনের রাত। এই রাতেই মহানবী (সা.) বায়তুল্লাহ শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে সপ্তাকাশ এবং আরশে আজিমে গমন করেন এবং আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন।
মেরাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
মেরাজের ঘটনা মহানবী (সা.)-এর নবুয়তের ১২তম বছরে, রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে সংঘটিত হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে:
মহান পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনগুলো দেখাই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
মেরাজের ঘটনা ও আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ
হাদিস অনুযায়ী, রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে মহানবী (সা.) এশার নামাজ শেষে হজরত উম্মে হানি (রা.)-এর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) জান্নাত থেকে বোরাক নামক বাহন নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সালাম জানিয়ে বলেন, “আপনার প্রতিপালক আপনাকে স্মরণ করেছেন। এখনই আপনাকে তাঁর কাছে যেতে হবে।”
মহানবী (সা.) বোরাকের পিঠে সওয়ার হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান এবং সেখানকার মসজিদে নবী-রাসূলদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি আকাশে যাত্রা করেন।
প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.) এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আকাশে হজরত ঈসা (আ.), ইয়াহইয়া (আ.), ইদ্রিস (আ.), হারুন (আ.), মূসা (আ.), এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সপ্তম আকাশ থেকে তিনি বায়তুল মামুরে যান, যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করেন।
এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান এবং রফরফ নামক বাহনে আরশে আজিমে যান। আল্লাহর সাথে তাঁর কথোপকথনের সময় ধনুকের দুই মাথার সমান বা তার চেয়েও কম দূরত্বে ছিলেন। এই রাতে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়।
মেরাজে প্রদর্শিত নিদর্শন
মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জান্নাতের নেয়ামত এবং জাহান্নামে বিভিন্ন পাপীদের শাস্তি দেখেন। হাদিসে উল্লেখিত কিছু শাস্তির বিবরণ:
বেনামাজিদের শাস্তি:তাদের মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়। মাথা গুঁড়িয়ে যাওয়ার পর তা পুনরায় সেরে যায় এবং পুনরায় আঘাত করা হয়।
জাকাত না দেওয়া: তারা পশুর মতো চারণ করে এবং নোংরা আবর্জনা খেতে বাধ্য হয়।
গিবতকারীদের শাস্তি: তারা অগ্নিময় লোহার নখর দিয়ে নিজেদের চেহারা ও বুক বিদীর্ণ করে।
সুদখোরদের শাস্তি: তাদের বড় বড় পেট রয়েছে, যা তাদের নড়াচড়া করতে বাধা দেয়।
ব্যভিচারীদের শাস্তি: তাদের পায়ে আংটা লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং তারা আর্তনাদ করে।
মেরাজ শেষে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন
মেরাজের ঘটনা শেষে মহানবী (সা.) পৃথিবীতে ফিরে আসেন এবং তা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করেন। আবু বকর (রা.) নিঃসংশয়ে তা বিশ্বাস করেন, ফলে রাসূল (সা.) তাকে “সিদ্দিক” বা বিশ্বাসী উপাধি দেন।
পবিত্র শবেমেরাজ আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন এবং ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই রাতে প্রাপ্ত শিক্ষা ও উপদেশ মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শবেমেরাজের তাৎপর্য বুঝে নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে মনোনিবেশ করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।


