পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কার্যক্রম চালাতে দেয়া হবে না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার। সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। সর্বশক্তি দিয়ে আমাদের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করব।’ গতকাল বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এমন মন্তব্য করেন। ৪০ মিনিটব্যাপী ওই বৈঠকে তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান শুল্ক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জ্যাকবসন বাংলাদেশের সংস্কার প্রচেষ্টা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি তার সরকারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন, যা আগামী বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া কমিশনের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মূল সংস্কারগুলোর বিষয়ে ঐক্য গঠনে সচেষ্ট। তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কমিশন খুবই ভালো কাজ করছে। অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সদস্যরা কঠোর পরিশ্রম করছেন।’
চিকিৎসকরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক : জুলাইয়ে কর্তব্য পালনকারী চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আপনারা শুধু চিকিৎসক নন, আপনারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক। আপনারা সাহস, মানবতা ও দায়িত্ববোধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই দুঃসময়ে আপনারা যে সেবা দিয়েছেন, তা আমরা কোনো দিন ভুলব না।’
গতকাল রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আহত জুলাই যোদ্ধাদের সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জাতির জন্য এটি একটি গভীর বেদনার ক্ষণ। আমি এ ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। যারা এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদান, তাদের পেশার মাহাত্ম্য। যখন চার পাশে শুধু আতঙ্ক, কান্না আর অজানা আশঙ্কা তখন আপনারাই আমাদের আশার আলো। এই কঠিন সময়ে যারা ক্লান্তি ভুলে আহতদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, আমি জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
যুদ্ধের সময়েও আক্রান্ত ও আহতদের চিকিৎসা বন্ধ করা হয় না উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। এর ব্যতিক্রম আমরা দেখেছি এই বাংলাদেশে, চব্বিশের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে। ফ্যাসিস্ট সরকার শুধু এ দেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বুকে গুলি চালিয়ে থেমে থাকেনি, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে যেন কেউ হাসপাতালে চিকিৎসা না পায়। তিনি বলেন, জুলাইয়ে আমাদের চিকিৎসক যোদ্ধাদের গল্প কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ডাক্তারদের গল্পকেও হার মানায়। রাস্তায় ছাত্রদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করে মেডিক্যালে ঢুকেও তাদের ওপর হামলা হয়েছিল, ডাক্তার-নার্সদের হুমকি-ধমকি, নানা রকমের বাধা দেয়া হয়েছিল। শত শত ছেলেমেয়েরা অন্ধত্ববরণ করেছে, কারণ তারা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায়নি।
ডাক্তার-নার্সরা নিজের জীবন বিপন্ন করে জুলাই-যোদ্ধাদের চিকিৎসায় নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়েছেন উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, নির্দেশ ছিল, আন্দোলনে আহত কাউকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হবে না। আপনারা পেছনের গেইট দিয়ে আহতদের গোপনে চিকিৎসা দিয়েছেন। হাসপাতালে হাসপাতালে গ্রেফতার অভিযান চালানো হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজ, রেজিস্ট্রার খাতাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ডাক্তার-নার্সরা সে সময় নিজেদের জীবন বিপন্ন করে জুলাই-যোদ্ধাদের চিকিৎসায় নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়েছিলেন।
তিনি আরো বলেন, তারা রোগীর কোনো তথ্য নথিভুক্ত পর্যন্ত রাখেননি, কারণ এসব নথির সূত্র ধরে আহতদের গ্রেফতার করা হচ্ছিল। বিনামূল্যে দিনরাত গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীদের জীবন বাঁচাতে আপনারা সর্বোচ্চ ঝুঁকি দিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন। দুই চিকিৎসক বোনকে আমরা দেখেছি নিজ উদ্যোগে গ্যারেজের মধ্যে অস্থায়ী ক্লিনিক তৈরি করে চিকিৎসা দিয়েছেন, অনেকে নিজেদের ঘরের মধ্যে অস্থায়ী ক্লিনিক তৈরি করে চিকিৎসা দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতির পক্ষ থেকে জুলাইয়ে কর্তব্য পালনকারী সব স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসককে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে গুরুত্বারোপ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতির বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায় পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে। এই সমন্বয় হবে একটা স্থানীয় পর্যায়ে এবং আরেকটা জাতীয় পর্যায়ে। দুই জায়গাতে খুব দ্রুততার সাথে সমন্বয় জোরদার করতে বলা হয়েছে।’
অপতথ্য রুখতে ন্যাশনাল ইনফরমেশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে অনেক অপতথ্য ছড়ানো শুরু হয়েছে। সামনে এটা আরো বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে একটা ন্যাশনাল ইনফরমেশন সেন্টার স্থাপনের চিন্তাভাবনা চলছে, যেখানে আমরা খুব দ্রুততার সাথে অপতথ্যকে চিহ্নিত করতে পারব।’ সভায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, নির্বাচনের সময় যেসব জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোকে নির্বাচনের আগেই দ্রুততার সাথে চিহ্নিত করতে প্রধান উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে জায়গাগুলোতে সমস্যা হতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করে, সেই স্পটগুলোকে নির্বাচনের আগে দ্রুত চিহ্নিত করার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কী ধরনের বাড়তি ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে পরামর্শ জানাতে তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।’
আজাদ মজুমদার বলেন, জেলা পর্যায়ে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে রিপোর্ট কেন্দ্রে পাঠাতে বলা হয়েছে, যাতে করে সরকারের জ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীলরা মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।’ এ ছাড়াও নির্বাচনের সময় প্রশাসনে রদবদলের বিষয়ে আলোচনা এবং এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজিপিসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


