ভবন নির্মাণে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন যাচাইয়ের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

ভবন নির্মাণে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন যাচাইয়ের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সারা দেশের সব ভবন ও নির্মাণকাজের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদন দেয়ার জন্য একটা আলাদা কর্তৃপক্ষ করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম। বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

শফিকুল আলম বলেন, এখন অনেক জায়গায়, গ্রামেও চার পাঁচতলা বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এ বিল্ডিংগুলো বাংলাদেশের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে হচ্ছে কি-না। আমাদের এখানে কিছুদিন আগেও একটা ভূমিকম্প হয়েছে। অগ্নিদুর্ঘটনা সবসময়ই আছে। এখন জনজীবনকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য যে বিল্ডিং করা হচ্ছে সেগুলো ভূমিকম্প প্রতিহত করতে পারবে কি না বা সহনীয় কি না, ফায়ার সেফটি আছে কি না। সে জন্য এদিন প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, কোনো কর্তৃপক্ষ করা যায় কি না, যারা সারা বাংলাদেশেই ভবন অনুমোদনের কাজ করবে। এখন যা আছে, রাজউকের এলাকার মধ্যে বিল্ডিং নির্মাণের কাজ করতে রাজউকের অনুমোদন লাগে। অনেক ক্ষেত্রে সেটার ব্যত্যয় হয়েছে, যেমন আমরা মাইলস্টোন স্কুলের ক্ষেত্রে দেখেছি।

প্রেসসচিব বলেন, সে জন্য প্রধান উপদেষ্টা গণপূর্ত এবং গৃহায়ন মন্ত্রণালয়কে খতিয়ে দেখতে বলেছেন এমন কোনো কর্তৃপক্ষ করা যায় কি না, যার আওতায় থাকবে সারা দেশ। আমি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দেখেছিলাম, ধানক্ষেতের মাঝখানে প্রাসাদের মতো চার তলা বাড়ি, সিলেটের প্রবাসীরা প্রত্যন্ত গ্রামে বড় বড় কন্সট্রাকশন করে রেখেছেন, এগুলো প্রত্যেকটি বাড়ির ক্ষেত্রেই যেন আমরা নিয়ম মেনে চলি সেই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার চারটি অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করেছে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে খসড়াগুলোর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন।

অনুমোদিত চারটি অধ্যাদেশ হলো- দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৫, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫।

এ বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনকে আরো কার্যকর করা হয়েছে। পাঁচজন কমিশনার থাকবেন, যার মধ্যে একজন বা দু’জন আইটি বিশেষজ্ঞ এবং একজন নারী কমিশনার থাকবেন। কমিশনের কাজের প্রতিবেদন ছয় মাস অন্তর অনলাইনে প্রকাশ করা হবে এবং কমিশনের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হলো ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিকিং প্রতিরোধ করা। আইন অনুসারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত, সম্পদ জব্দ এবং প্রয়োজনে বিদেশযাত্রা বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানবপাচারের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা এবং ভুক্তভোগী সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিচার।

রাজউক অধ্যাদেশে রাজধানীর উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। বিধান অনুযায়ী ভূমি পুনর্গঠন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, খেলার মাঠ ও উদ্যানের সুরক্ষা, অনুমোদিত নকশার ব্যতীত ভবন নির্মাণে শাস্তি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রাজউকের চেয়ারম্যান, সদস্য বা কর্মচারীরা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্বার্থে কোনো শেয়ারে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে কমিশনকে ‘ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম’ হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা তাদের দেশের বিভিন্ন আটক কেন্দ্র পরিদর্শন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করার সুযোগ করে দেবে। এই সংশোধনের ফলে কমিশনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে, যা তাদের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করবে।

ব্রিফিংয়ে শফিকুল আলম আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই চারটি অধ্যাদেশ দেশের প্রশাসন ও আইন প্রণয়নকে আরো শক্তিশালী করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।’

প্রেসসচিব বলেন, বর্তমানে বড় বড় দুর্নীতির অনেকাংশই আইটি সাপোর্টে করা হয়। আমরা যত ক্যাশলেস ট্রানজেকশনে ঢুকছি, দেখা যাচ্ছে যে অনেক দুর্নীতি যা সেই আগের মতো টাকার বস্তা নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে না, নিমিষেই একটা ক্লিকের জোরেই হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি কমিশন গঠন করেছিল। দেশের দুর্নীতি কী কী এবং কিভাবে দমন করা যায়- এ বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। সেই কমিশন একটি বড় রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। সেই আলোকেই দুর্নীতি দমন কমিশনকে কিভাবে আরো অ্যাফেক্টিভ (কার্যকর) একটা সংগঠন করা যায়, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে যেভাবে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছিল সেটাকে কিভাবে রোধ করা যায়- সে বিষয়ে ‘দুর্নীতি দমন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’ নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। তিনি জানান, এর অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যরা কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করেছেন।

প্রেসসচিব জানান, নতুন অধ্যাদেশে লাস্ট মোমেন্টে এটা একটা ওভারসাইট বডি যা বাছাই কমিটি হিসেবে কাজ করার কথা ছিল সেটাকে ড্রপ করা হয়েছে। কেননা আমাদের দেশে দুর্নীতি যেভাবে স্তরে স্তরে আছে, দেখা যাচ্ছে যে ওভারসাইট একটা বডি করলেও সেখানে আবার দুর্নীতি বিস্তার লাভ করতে পারে। তিনি বলেন, এ বডিতে পাঁচজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে কমপক্ষে দু-একজন থাকবেন যাদের আইটি ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। এ ছাড়া একজন নারী কমিশনার নেয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি জানান, নতুন আইনে বলা হয়েছে যে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের প্রতিবেদন প্রতি ছয় মাসে অনলাইনে পোস্ট করবে। যারা দুর্নীতি দমন কমিশনে আছেন, মূলত অফিসারদের তাদের সম্পদের হিসাব দিতে হবে।

Related Articles