- আদিল মাহমুদ
ইসলাম ও শরীআত সম্পর্কে আমাদের ধারণা আসলে কতখানি গভীর? কতটা সঠিক ও বোধগম্য? মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) রচিত ‘মিযাজে শরীআত’ গ্রন্থটি পড়া শুরু করার পর মনে হলো—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমি জগতের নতুন দিগন্তে প্রবেশ করলাম। এটি কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়; বরং ইসলামি অন্তরাত্মার অমূল্য রত্ন—দার্শনিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও বাস্তবতার অনন্য সমন্বয়।
লেখক ইসলামের মিযাজ বা মৌল প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে শরীআতের গভীরতম রহস্য এমনভাবে উন্মোচন করেছেন—যা পাঠককে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের মর্ম বোঝার সুযোগ দেয়।
ইতিহাসে অনেক আলেম ও চিন্তাবিদ—যেমন হযরত শাহ ওলীউল্লাহ, মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী, আবদুল কাদির জিলানী, আল্লামা রূমী, হুজ্জাতুল ইসলাম কাসিম নানুতবী, আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) প্রমুখ—ইসলামের মিযাজ বিষয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা করেছেন। কিন্তু ‘মিযাজে শরীআত’ যে গভীরতা ও পূর্ণতা নিয়ে এ বিষয়টি স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে উপস্থাপন করেছে, তা অভূতপূর্ব।
পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিরই একটি স্বতন্ত্র প্রকৃতি বা মিযাজ রয়েছে। এই প্রকৃতিকে না বুঝলে তার সঠিক মূল্যায়ন অসম্ভব। তেমনি ইসলামের প্রকৃত মিযাজকে না বুঝে শরীআতের বিধান, আল্লাহর বার্তা ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। লেখক এই মিযাজের অন্তর্নিহিত রহস্য, তার শাশ্বত সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, মনে হয় তিনি শুধু তত্ত্ব নয়—বরং গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মানব জীবনের প্রতিটি স্তরে অনুসন্ধান করেছেন সহজিয়া শব্দে।
গ্রন্থের সূচিপত্রই তার বিস্তৃতি ও গুরুত্ব প্রকাশ করে করছে । শুরু হয়েছে—মিযাজের সংজ্ঞা, মিযাজে শরীআতের ধারণা, মানুষের স্বভাব ও চাহিদার বহুমাত্রিক দিক এবং ইসলামের সাথে তার গভীর সম্পর্কের বিশ্লেষণ দিয়ে। লেখক মানবজাতির অপরিসীম সম্ভাবনা, বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতার আলোকে শরীআতের বিধানগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক এবং ভাবনায় নবীন।
লেখক তুলে ধরেছেন—মানব মেধানির্ভর মতাদর্শ ও আধুনিক দর্শনের সীমাবদ্ধতা। যখন মানুষের যুক্তি ও জ্ঞানকে জীবনের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়, তখন লেখক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—প্রকৃত সফলতা কেবল আল্লাহর সর্বজ্ঞতা, রহমত ও দিকনির্দেশনার উপর নির্ভরশীল। মানুষের যুক্তি যতই প্রখর হোক না কেন, তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও তৎপ্রেরিত ওহীর পথপ্রদর্শন ছাড়া মানব জীবনের প্রকৃত কল্যাণ ও ধর্মীয় বিধান নির্ধারণ সম্ভব নয়।
এরপর ধাপে ধাপে আলোচিত হয়েছে—তাওহীদ, নবুওয়াত, বিধান প্রণয়নের নীতি, জিহাদ, তায়সীর (সহজিকরণ), বাসীরত (অন্তর্দৃষ্টি), ইস্তিকামাত (অটলতা), আখলাকিয়াত (নৈতিকতা), রুখসত ও আযীমত (শিথিলতা ও দৃঢ়তা) প্রভৃতি বিষয়। এখানে শরীআতের লক্ষ্য কেবল আইন প্রয়োগ নয়; বরং মানব স্বভাবের সাথে অভিন্নতায় এক ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর জীবন গঠন।
ধীরে ধীরে ওঠে এসেছে—শরীআতের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও অন্তর্দৃষ্টি। লেখক দেখিয়েছেন, শরীআত বাহ্যিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এমন জীবনধারা, যা মানব হৃদয়কে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত করে এবং কল্যাণমুখী চরিত্র গড়ে তোলে। এমনকি প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা, সহিষ্ণুতা ও কল্যাণকামিতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার শিক্ষা দেয় শরীআত।

গ্রন্থে স্পষ্ট হয়েছে—ইসলামের সামাজিক কাঠামো জোর-জবরদস্তির উপর নয়, বরং পরামর্শ, ন্যায়, করুণা ও মানবতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এখানে ধর্মীয় বিধান সহজতর করা, মানুষের সক্ষমতা ও সামর্থ্যকে আমলে নেয়া এবং জীবনের বাস্তবতার সাথে সমন্বয় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে অনন্য দিক হলো—লেখক স্পষ্ট করে বলেছেন, দ্বীন ও শরীআত কেবল যুক্তি-নির্ভর বা তত্ত্বীয় বিষয় নয়; বরং এগুলো আধ্যাত্মিকতা, ঈমান এবং আল্লাহ-রাসূলের সাথে নিবিড় সম্পর্কের ফল। তাই তওবা, দুআ, আল্লাহর স্মরণ, এবং আত্মশুদ্ধির গুরুত্বকে তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রতিটি অধ্যায় যেনো এক একটি আলোকিত দ্বার, যার ভেতরে প্রবেশ করলে পাঠক ইসলামের সূক্ষ্মতম সৌন্দর্য, ভারসাম্য, প্রত্যাশা ও মর্মবাণীতে বিমুগ্ধ হয়। এই গ্রন্থ কেবল তথ্য দেয় না; বরং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেয়—যাতে শরীআতের বিধানকে আমরা কেবল আইন হিসেবে নয়, বরং জীবনবোধের পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে দেখি।
এ সবকিছুর সম্মিলনে মিযাজে শরীআত একটি অসাধারণ ও যুগান্তকারী গ্রন্থ—যা ইসলামের শরীআতকে জীবন্ত, প্রাণবন্ত এবং প্রগাঢ় জীবনদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি পাঠককে এমন অন্তর্দৃষ্টি দেয়, যা ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং বোঝাপড়াকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) এর প্রাঞ্জল ভাষা, হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনা ও গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণ এই গ্রন্থটিকে করে তুলেছে মুসলিম উম্মাহর অনন্য সম্পদ।
যারা ইসলামের গভীরতর রহস্য জানতে চান, শরীআতের প্রকৃত মিযাজ উপলব্ধি করতে চান, যারা আগ্রহী নিজেদের জীবনকে সঠিক ইসলামের আদর্শে সাজাতে—তাদের জন্য ‘মিযাজে শরীআত’ নিঃসন্দেহে একটি অপরিহার্য পাঠ।
লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তরুণ আলেম, কবি ও গল্পকার।
সংযুক্ত ছবিঃ কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) মহামারীতে লকডাউন চলাকালে শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দামাত বারাকাতুহুম) অনলাইনে সরাসরি সহীহ বুখারীর দরস প্রদান করতেন জামিআ ইকরা বাংলাদেশের ছাত্রদের। পেশাদার মুদ্রাক্ষরিকরা ‘মিযাজে শরীআত’–এর পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ায় এই সময়ে তিনি নিজেই পাণ্ডুলিপির অনেক আলোচনার ভিডিও প্রতিলিপি তৈরি করে দেন কম্পিউটার টাইপড কপি তৈরীর সুবিধার্থে। এটি হলো তেমনি একটি ভিডিও থেকে নেয়া স্ক্রিনশট। —পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম


