পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দিনাজপুরের মধ্যপাড়ায় খনি থেকে উত্তোলিত ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১০ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর মজুত পড়ে আছে তিন বছর ধরে। এতে যেকোনো সময় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপাড়া খনির নয়টি ইয়ার্ডে প্রায় ১০ লাখ টন পাথর মজুদ ছিল। বর্তমানে খনিতে পাঁচটি সাইজে পাথর উৎপাদিত হচ্ছে ৫-২০ (৩-৪) মিমি, ২০-৪০ মিমি, ৪০-৬০ মিমি (ব্লাস্ট), ৬০-৮০ মিমি ও বোল্ডার। এর মধ্যে রেলপথে ব্যবহৃত ৫ লাখ ৭০ হাজার টন ব্লাস্ট পাথর এবং নদী শাসনের কাজে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য ২ লাখ ৮০ হাজার টন বোল্ডার পাথর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ার ফলে খনি কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়েছে। দ্রুত এসব পাথর বিক্রি না হলে খনির উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দেশে পাথরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। এ চাহিদার সিংহভাগ আমদানি করা হয় ভারত ও ভুটান থেকে। আন্তর্জাতিক মানের এবং কম দামে পাথর থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে পাথর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্রের মধ্যপাড়া পাথরের ব্যবহারের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা পালন করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ডে নদী শাসন ও নানা স্থাপনায় কাজের উপযোগী করে এসব পাথর খনির সার্ফেস ভাগে রাখা হয়েছে পাহাড়সম স্তূপ করে। এসবের মধ্যে রেল উপযোগী ৫ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য দুই দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পাথর। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা এবং অসাধু কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আমদানি প্রীতির পাশাপাশি দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু চুক্তির ফলে আটকে গেছে পাথরগুলোর ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়া। অথচ দেশীয় মূল্যের চেয়ে চড়া দামে পাথর আনা হচ্ছে বিদেশ থেকে।
মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রিতে আরও একটি বড় অন্তরায় করে রাখা হয়েছে অনেকটা কৃত্রিম উপায়ে। আর তা হচ্ছে খনির সঙ্গে সংযোগকৃত ১৩ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ পাথর সরবরাহকারী রেলপথ। যেটি ভবানীপুর রেলস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত। এ রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছিল খনি থেকে পাথর উত্তোলনের গোড়ার দিকে। খনি থেকে রেলপথে দেশের নানা স্থানে সরবরাহের জন্য। কিন্তু ট্রাক মালিকদের একটি মাফিয়া চক্র রেলপথে পাথর না নিয়ে সড়কপথে নেয়া শুরু করে। ফলে রেলপথটি ছয় মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ওই রেলপথের আট দশমিক আট কিলোমিটার রেললাইন চুরি করে নিয়ে গেছে ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে পেট্রোবাংলার একটি দায়িত্বশীল সূত্র থেকে।
বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মধ্যপাড়া থেকে পাথর সরবরাহ করতে প্রতি টনে খরচ পড়ে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। চট্টগ্রাম এলাকায় নিতে পড়ে ২১০০ থেকে ২২০০ টাকা।
পেট্রোবাংলার মার্কেটিং সূত্র জানায়, অতি দ্রুত রেলপথটি সংস্কার করে রেলওয়ে ওয়াগন বা রেল ট্রাকে পরিবহন কাজ শুরু করলে প্রতিটন পাথর পরিবহনে খরচ পড়বে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মাত্র। আর চট্টগ্রাম এলাকায় নিতে খরচ পড়বে প্রতিটন ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মাত্র। এতে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা পর্যায় লোকসান কমে আসবে প্রায় অর্ধেকে।
দেশে পাথর প্রাপ্তির উৎসগুলো হচ্ছে- মধ্যপাড়া খনি, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটের বুড়িমারী। সারা দেশে প্রতিবছর পাথর চাহিদা প্রায় দুই কোটি ১৬ লাখ মেট্রিক টন। শুধু মধ্যপাড়া থেকেই মেলে প্রতিবছর ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর। এরপরও রয়েছে অন্যান্য উৎস। তবে এতো বেশি চাহিদা থাকার পরও দেশীয় পাথর ব্যবহার না করে বিদেশ থেকে পাথর আমদানি এখন পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল।
এদিকে রেলের একটি সূত্র জানায়, পার্বতীপুর থেকে বুড়িমারী রেলপথটি ডুয়েল গেজে রূপান্তরিত করা হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছা থাকলে মধ্যপাড়ার পাথরগুলো ব্যবহার করতে পারে অনায়াসেই। এতে দেশের মুদ্রা দেশেই থাকে। বিষয়গুলো নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার ও পেট্রোবাংলার প্রকৌশলী অপারশন অ্যান্ড মাইনস কামরুজ্জামান খানের সঙ্গে কথা বলার বারবার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
মধ্যপাড়া পাথর খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে জানান, আমার এখানে আসার অল্প কয়েক দিন হচ্ছে। কেন এখানকার পাথর সংস্থাগুলো নেয়নি তা বলা যাচ্ছে না এ মুহূর্তে। তবে দেশীয় পাথর এবং আমদানি পাথরের চেয়ে মধ্যপাড়ার পাথর অনেক উন্নত তাই নেয়া উচিত ছিল।


