সুন্দর দেখায় বলে অস্বস্তিকর জুতা বাছাই নয়

সুন্দর দেখায় বলে অস্বস্তিকর জুতা বাছাই নয়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : জুতা শুধু সাজের উপকরণ নয়, এটি শরীরের স্থিতি, ভর–বহন এবং দীর্ঘসময় হেঁটে চলার মূল ভরসা। তাই আরামদায়ক জুতা বেছে নেওয়া সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং সুস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।

অর্থাৎ সঠিক জুতা শুধু আরাম দেবে না, বরং পায়ের স্বাস্থ্য, শরীরের ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি নিশ্চিত করবে।

আর সচেতনভাবে জুতা নির্বাচন করলে পায়ের সমস্যাও অনেকাংশে কমে যায়।

আরামদায়ক জুতার গুরুত্ব

জুতার আরামের সঙ্গে পুরো শরীরের সুস্বাস্থ্যের সম্পর্ক আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পা–বিষয়ক চিকিৎসক ডা. জোডি আর. শোয়েনহাস রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “সঠিক মাপ ও সাপোর্ট–সমৃদ্ধ জুতা না হলে পায়ে ফোস্কা, ব্যথা, পেশি টান, এমনকি হাড়ে চাপজনিত ক্ষত তৈরি হয়।”

এসবের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পায়ের গঠন পরিবর্তন করতে পারে। অতিরিক্ত চাপের কারণে পায়ের পাতা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, আঙুল বাঁকানোর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

তাই সুন্দর দেখায় বলে যেকোনো জুতা পরে নিলে তা শরীরের ক্ষতি ডেকে আনে। এমন পরিণতি থেকে বাঁচতে প্রয়োজন সঠিক জুতা নির্বাচন।

প্রতি বছর পায়ের মাপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা

অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়লে পায়ের মাপ একই থাকে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।

একই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক পা–বিশেষজ্ঞ ডা. এলিজাবেথ ডর্থি বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের লিগামেন্ট ঢিলে হয়, নমনীয়তা কমে যায়, ফলে পা চওড়া হতে পারে বা লম্বায় সামান্য বাড়তে পারে। গর্ভধারণ, ওজন কমা–বাড়া, আঘাত বা অস্ত্রোপচারের পর পায়ের গঠনে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক।”

এজন্য বছরে অন্তত একবার পায়ের মাপ নেওয়া উচিত, যাতে ভুল মাপের জুতার কারণে পায়ের ক্ষতি না হয়।

সঠিক মাপ না হলে জুতার ভেতরে পা চাপা পড়ে, আঙুল বেঁকে যায় এবং স্বাভাবিক রক্তচলাচল ব্যাহত হয়।

পায়ের প্রস্থ অনুযায়ী জুতা নির্বাচন

জুতার দৈর্ঘ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্ব রয়েছে প্রস্থের ক্ষেত্রেও। কারও পা স্বাভাবিকের তুলনায় চওড়া, আবার কারও সরু।

চওড়া পায়ের জন্য সরু জুতা বেছে নিলে আঙুলে চাপ পড়ে, ব্যথা হয় এবং বুনিয়ন ধরনের সমস্যা বাড়ে। বুনিয়ন মূলত পায়ের আঙুলের একটি সাধারণ অস্থিসংক্রান্ত বিকৃতি।

এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বড় আঙুলের গোড়ার হাড়ে। যখন পায়ের বড় আঙুলের গোড়ায় থাকা সংযোগস্থলের হাড় ধীরে ধীরে বাইরের দিকে সরে গিয়ে একটি উঁচু শক্ত গাঁটের মতো দেখায়।

আবার সরু পায়ে চওড়া জুতা পরলে পা জুতার ভেতরে নড়াচড়া করে, ফলে পায়ে ফোস্কা পড়ে। তাই জুতা কেনার সময় কেবল আকার নয়, প্রস্থের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

দিনের শেষে জুতা কেনার কারণ

অনেকেই সকাল বেলায় জুতা কিনে থাকেন, তবে এটি সঠিক সময় নয়। দিনের শেষে স্বাভাবিকভাবেই পায়ে কিছুটা ফোলা থাকে। কাজের চাপে বা হাঁটার কারণে পায়ের ওপর চাপ পড়ে, যা মাপকে সামান্য বড় করে তোলে।

তাই সন্ধ্যায় জুতা পরলে প্রকৃত মাপ বোঝা যায়। এতে এমন জুতা কেনা হয় না, যা সকালে ঠিক লাগলেও পরে এসে চাপ সৃষ্টি করে।

আর্চ–সাপোর্ট থাকা কেন জরুরি

পায়ের বাঁক বা আর্চ প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন। কারও আর্চ উঁচু, কারও খুব কম।

উঁচু আর্চ–যুক্ত পায়ের ক্ষেত্রে সামান্য উঁচু গোড়ালি–যুক্ত জুতা আরাম দেয়, কারণ এতে চাপ কম পড়ে।

আবার যাদের পায়ের আর্চ কম বা পা চ্যাপ্টা, তাদের জন্য শক্তিশালী আর্চ–সমৃদ্ধ জুতা অপরিহার্য।

সঠিক আর্চ–সাপোর্ট না থাকলে হাঁটার সময় গোড়ালি ও হাঁটুতে বাড়তি চাপ পড়ে। প্রয়োজন হলে আলাদা আর্চ–সাপোর্ট যুক্ত ‘ইনসোল’ ব্যবহার করা যেতে পারে।

আঙুলের জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকা

জুতার নকশা অনেক সময় আঙুলের জায়গা কমিয়ে দেয়।

ডা. ডর্থি বলেন, “আঙুল গুঁজে রাখা হলে শুধু ব্যথাই হয় না বরং ‘কর্ন’, ‘ক্যালাস’, ‘হ্যামার টো’ এবং স্নায়ুজনিত ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে।”

তাই জুতার সামনের অংশ পর্যাপ্ত প্রশস্ত হওয়া জরুরি। এমনকি নকশা সরু হলেও আঙুল যাতে চাপ অনুভব না করে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘতম আঙুল এবং জুতার ডগার মাঝে অল্প ফাঁক থাকা স্বাভাবিক আরামের শর্ত।

বাড়তি নরমত্ব বা কুশন–সমৃদ্ধ জুতা

হাঁটার সময় শরীরের পুরো ওজন পায়ের ওপর পড়ে। আর শক্ত মাটিতে এই চাপ আরও বাড়ে।

ডা. ডর্থির ভাষায়, “বেশি নরম বা কুশন–যুক্ত জুতা হাঁটার ধাক্কা কমিয়ে দেয় ফলে হাড়, হাড়ের জোড় এবং পায়ের পাতায় চাপ কম পড়ে। এতে টেনডন (এক ধরনের শক্ত, তন্তুযুক্ত টিস্যু যা পেশি এবং হাড়–কে একসঙ্গে সংযুক্ত করে) সমস্যাও কম হয় এবং দীর্ঘ সময় হাঁটলেও পায়ে ব্যথা বাড়ে না।

ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন জুতা

প্রতিটি কাজের জন্য একই ধরনের জুতা নয়। খেলাধুলায় পার্শ্বগত নড়াচড়া বেশি থাকে, তাই শক্ত গোড়ালি–সাপোর্ট–যুক্ত জুতা প্রয়োজন। ওজন তোলার ক্ষেত্রে সমতল এবং স্থির জুতাই উপযোগী।

পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য প্রয়োজন শক্ত গ্রিপ–সমৃদ্ধ, টেকসই এবং গোড়ালি–রক্ষাকারী জুতা।

দৈনন্দিন হাঁটার জুতা সাধারণত হালকা হয়, আর দীর্ঘ দৌড়ের ক্ষেত্রে নরমত্ব বেশি থাকা প্রয়োজন।

ভুল কাজে ভুল জুতা ব্যবহারে পায়ের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

অস্বস্তি হলে জুতা বেছে না নেওয়া

অনেকে মনে করেন, জুতা পরে কিছুদিন ব্যবহার করলে নরম হয়ে যায়। তবে এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল ধারণা।

প্রথমবার পরার সময়ই যদি চাপ, ব্যথা বা ঘষা লাগে তবে পরে তা আরও বাড়বে।

তাই কেনার সময়ই আরামের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অস্বস্তিকর জুতা কখনোই আরামদায়ক হয়ে ওঠে না।

Related Articles