পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে আরেকটি বছর ঝরে পড়ছে। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে ২০২৫—স্মৃতিতে রেখে যাচ্ছে হাসি-কান্না, অর্জন-বঞ্চনা আর কিছু গভীর ক্ষত। নতুন বছরের আগমনে চারদিকে যখন প্রত্যাশার আলো, তখন বিদায়ী বছরের দিকে ফিরে তাকালে চোখে পড়ে এক দীর্ঘ শোকছায়া। বিশেষ করে বাংলাদেশের দ্বীনি অঙ্গনে ২০২৫ ছিল একের পর এক বেদনাবিধুর বিদায়ের বছর।
এই বছরে জাতি হারিয়েছে বহু বরেণ্য, প্রাজ্ঞ ও প্রভাবশালী আলেমে দীনকে—যাঁরা ছিলেন শুধু মাদরাসার শিক্ষক নন, বরং সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশক, আন্দোলনের অভিভাবক এবং কোটি মানুষের ঈমানি জীবনের নীরব পথপ্রদর্শক। তাঁদের ইন্তেকাল মানে শুধু কিছু নামের প্রস্থান নয়; বরং একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, তাকওয়া ও আমানতের বিদায়।
দ্বীনি শিক্ষা ও চিন্তার এক নির্ভীক অভিভাবক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (রহ.)
২০২৫ সালের ২ মে ইন্তেকাল করেন দেশের শীর্ষ আলেম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা সুলতান যওক নদভী (রহ.)। কওমি মাদরাসা শিক্ষা, ইসলামী সাহিত্য ও সাংগঠনিক অঙ্গনে তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী।
চট্টগ্রামের জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পাশাপাশি আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের সভাপতি এবং ইন্টারন্যাশনাল লিগ অব ইসলামিক লিটারেচারের বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ হিসেবে তিনি আজীবন দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ইন্তেকালে দেশের দ্বীনি নেতৃত্বে এক অভিভাবকশূন্যতা তৈরি হয়।
আল্লামা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী (রহ.)
৪ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত ও হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী (রহ.)। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)–এর সুযোগ্য সন্তান।
কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়ার মুহতামিম হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দ্বীনি শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে ভূমিকা রাখেন। তাঁর জীবন ছিল নির্লোভতা, ইখলাস ও নীরব খেদমতের অনন্য দৃষ্টান্ত।
মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.)
১৪ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার শাইখুল হাদিস ও সদরুল মুহতামিম মুফতি হাফেজ আহমদুল্লাহ (রহ.)। হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরে গভীর পান্ডিত্য ছিল তাঁর পরিচয়।
শৈশব থেকেই কোরআন-হাদিসের আলোয় বেড়ে ওঠা এই আলেম পাকিস্তান ও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন। অসংখ্য আলেম তাঁর দরস থেকে ইলমের আলো পেয়েছেন।
মাওলানা নুরুল হুদা ফয়েজী (রহ.)
১১ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক মহাসচিব, কুরআন শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব ও জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সভাপতি মাওলানা নুরুল হুদা ফয়েজী (রহ.)।
তিনি ছিলেন সেই আলেম, যিনি দ্বীনি দাওয়াহ ও সাংগঠনিক রাজনীতির মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন আজীবন। সারাদেশে কোরআন শিক্ষার বিস্তারে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী (রহ.)
২৯ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী (রহ.)। তিনি ছিলেন জমিয়ত ও হেফাজতের সাবেক মহাসচিব মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর ছোট ভাই।
রাজধানীর মানিকনগরসহ বিভিন্ন মাদরাসায় তিনি দীর্ঘদিন হাদিসের দরস দিয়েছেন। প্রচারবিমুখ এই আলেমের প্রভাব ছাত্র ও সহকর্মীদের মাঝে ছিল গভীর।
এছাড়া এই নক্ষত্রপতনের আরো একটি দীর্ঘ তালিকা:
২০২৫ সালে আরও ইন্তেকাল করেছেন—
আল্লামা মুকাদ্দাস আলি (রহ.): সিলেটের প্রবীণ মুহাদ্দিস, যিনি ৬৬ বছর ধরে বুখারি শরিফের দরস দিয়েছেন।
মাওলানা রফিকুর রহমান (রহ.): খুলনার দ্বীনি অঙ্গনের অভিভাবকতুল্য আলেম।
মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.): লালবাগ মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শূরা সদস্য।
মাওলানা মাহবুবুল হক (রহ.): লালমাটিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদিস, দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবন ছিল তাঁর পরিচয়।
মাওলানা মোশাররফ হোসেন (রহ.): তাবলিগ জামাতের প্রবীণ মুরুব্বি, বিশ্বব্যাপী দাওয়াহ সফরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।
তরুণদের বিদায়:
এই বছর বেদনাকে আরও গভীর করেছে তরুণ আলেমদের অকাল বিদায়।
মাওলানা রায়হান খাইরুল্লাহ (রহ.) মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ওমরাহ পালনরত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। লেখালেখি ও গবেষণায় সম্ভাবনাময় এই আলেমের মৃত্যু নতুন প্রজন্মকে নাড়া দেয়।
অন্যদিকে, বিশ্বজয়ী হাফেজ সাইফুর রহমান ত্বকী (রহ.) আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের গৌরব ছড়িয়ে দিয়ে অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তাঁর মৃত্যু ছিল জাতীয় পর্যায়ের শোক।
২০২৫ সাল তাই বাংলাদেশের দ্বীনি ইতিহাসে শুধু একটি বর্ষ নয়—এটি একটি শোকগাথা। এই আলেমদের ইন্তেকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইলম ও তাকওয়ার মানুষ সহজে পাওয়া যায় না। তবে তাঁরা রেখে গেছেন এক বিশাল উত্তরাধিকার—ইলম, আদর্শ ও দায়িত্ববোধ।
এই উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ আলেমরা চলে যান, কিন্তু তাঁদের আলো নিভে যায় না—যদি উত্তরসূরিরা তা ধারণ করতে পারে।


