আগুনে নিভে গেল ১৬ প্রাণ

আগুনে নিভে গেল ১৬ প্রাণ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে গতকাল সকালে একই ভবনে থাকা পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। নিখোঁজদের ছবি হাতে নিয়ে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা গেছে। মারাত্মক অগ্নিদগ্ধ অন্তত আটজনকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া হতভাগ্য ব্যক্তিদের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এসব লাশের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট করা লাগবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় গার্মেন্টস অংশ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। সেখানে রাসায়নিকের গুদাম থাকার ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেক বেগ পেতে হয়। গোডাউন অংশে সন্ধ্যার পরও তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। সেখানেও লাশ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর শিয়ালবাড়ি এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে ইউনিটের সংখ্যা বাড়িয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১২টি করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা ও রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন নেভানোর কাজ কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। সাড়ে সাত ঘণ্টা পরও নেভানো যায়নি রাসায়নিকের গুদামের আগুন।

জানা গেছে, শিয়ালবাড়িতে চারতলা ওই ভবনটির ওপরের তলায় টিনের ছাদ দেয়া। ভবনে থাকা ‘আনোয়ার ফ্যাশন’ নামের একটি পোশাক কারখানা এবং পাশের রাসায়নিকের গুদামে আগুন জ্বলে। ১৬ জনের লাশ ওই কারখানার দু’টি ফ্লোর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, রাসায়নিকের গুদামে ব্লিচিং পাউডার, প্লাস্টিক, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছিল। সেখান থেকে আসা ক্ষতিকর গ্যাসে এসব মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে রাসায়নিকের গুদামের মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে, এই রাসায়নিকের গুদামের অনুমোদন নেই। তদন্ত করে বিস্তারিত জানা যাবে। এছাড়া দগ্ধ অবস্থায় আরো অন্তত আটজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনদের আহাজারি বাড়তে থাকে। অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফেরেন অসংখ্য মানুষ। অনেকে প্রিয়জনের ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পোশাক কারখানার ভেতরে কাজ করা অনেক শ্রমিকের খোঁজ মেলেনি। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে দুর্ঘটনাকবলিত স্থান ও আশপাশের সড়ক।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মৃতদেহগুলো এমনভাবে পুড়েছে, তাদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় ডিএনএ টেস্ট ছাড়া কোনোভাবেই শনাক্ত করা সম্ভব না।’ প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘চারতলা গার্মেন্ট কারখানার উপরে ছাদ টিনের। ছাদে যাওয়ার জন্য সেখানে একটি গ্রিলের দরজা রয়েছে। সেটি তালা মারা ছিল। এ কারণে তারা উপরের দিকে যেতে পারেননি। ‘আপনারা জানেন যে পরিমাণ কেমিক্যাল বিস্ফোরণ, সেটার ফ্ল্যাশওভারে টক্সিক গ্যাসের কারণে আকস্মিকভাবে উনারা সেন্সলেস হয়েছে। পরে তারা সরতে পারেননি। উপরে যেতে পারেননি, নিচেও যেতে পারেননি।’

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাজমুল আলমকে খুঁজে পাননি তার স্ত্রী নাসিমা আক্তার। তিনি জানান, তার স্বামীর গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি কারখানাটির দোতলায় অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার স্বামী কল করেছিলেন। তখন তাকে জানান যে, তাদের কারখানায় আগুন লেগেছে। এর পর থেকে আর কথা হয়নি। তিনি পরে বহুবার সেই ফোনে কল করলেও কোনো সাড়া পাননি। স্বামী নাজমুলকে খুঁজে না পেয়ে নিকটস্থ সব হাসপাতালে ছুটে বেড়ান নাসিমা। কিন্তু কোথাও তাকে পাননি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পোশাক কারখানার নিচতলায় ‘ওয়াশ ইউনিট’ রয়েছে। সেখানে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। সেই আগুন পাশের রাসায়নিকের গুদামে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আগুন তিনতলা পর্যন্ত পোশাক কারখানার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর কারখানা থেকে শ্রমিকরা নানাভাবে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই অনেকে আটকা পড়েন।

ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি ছিল সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা। উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে নেয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ মানুষ ও নিখোঁজদের স্বজনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলজুড়ে আতঙ্ক, কান্না আর শোকের ছায়া বিরাজ করে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা ধারণা করছি কেমিক্যাল গোডাউনে যখন আগুন লাগে, তখন বিস্ফোরণের ফলে বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের প্রথম যেসব ইউনিট এসেছিল, সেখানে ফায়ার ফাইটার যারা ছিলেন তারা আমাদের জানিয়েছেন, তারা প্রথমে দেখেছেন অনেকেই ভবন থেকে বের হয়ে যেতে পেরেছে। যারা মারা গেছেন তারা হয়তো বিস্ফোরণের পর বিষাক্ত গ্যাসের কারণে বের হতে পারেননি এবং ঘটনাস্থলে মারা যান। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আমরা বিস্তারিত তদন্ত করে জানতে পারব। আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তি দিয়ে, ড্রোন দিয়ে এসব কার্যক্রম চালাচ্ছি। আগুনের সূত্রপাতের কারণ এখনো জানা যায়নি। যারা শুরুতে আগুন নেভাতে এসেছেন, তারা রাসায়নিকের গুদাম ও গার্মেন্টস দুই দিকেই আগুন দেখেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার শোক : এ দিকে মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় নিরীহ মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। আমরা এই শোকের সময়ে তাদের পরিবারের পাশে আছি। প্রধান উপদেষ্টা অগ্নিকাণ্ডে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন।

Related Articles