পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে আসা বিভিন্ন সংস্থা, বিদেশী প্রতিনিধি এবং দেশের রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে তারা দুই দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে দেখেন এবং সরাসরি রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন। এ সময় রোহিঙ্গারা নিজেদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আশা ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আয়োজিত তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে আসা ৪০ দেশের প্রতিনিধির পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও এই সফরে অংশ নেন। তারা প্রথমে ক্যাম্প-৪-এ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত ই-ভাউচার আউটলেট পরিদর্শন করেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন অতিথিরা। পরে তারা বালুখালী ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে গিয়ে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা কার্যক্রম দেখেন এবং উপস্থিত চিকিৎসকদের সাথে মতবিনিময় করেন।
ক্যাম্প সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রোহিঙ্গা নারীদের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে দেশী-বিদেশী প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা নারীদের সাথে দীর্ঘসময় আলাপ করেন। নারী প্রতিনিধিরা বিশেষভাবে রোহিঙ্গা নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং তাদের স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সফরের বিভিন্ন মুহূর্তে অতিথিরা রোহিঙ্গাদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন এবং তাদের কাছ থেকে পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে গত রোববার থেকে কক্সবাজারে শুরু হয় তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘স্টেকহোল্ডার্স’ ডায়ালগ : টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’। মঙ্গলবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই সম্মেলন।
সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা মনে করেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে এককভাবে এই বোঝা বহন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সঙ্কট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা এখন সময়ের দাবি।
সীমান্তে আবারো রোহিঙ্গা ঢলের আশঙ্কা
মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় সীমান্তে অশনি সঙ্কেত দেখা দিয়েছে। মংডুসহ কয়েকটি এলাকায় আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে জান্তা বাহিনী, তাদের সাথে নৌবাহিনীর সদস্যরাও যুক্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদীর তীরে অবস্থান নিয়েছে, যারা যেকোনো সময় সীমান্ত ভেদ করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে পারে। বিজিবির তথ্য বলছে, শুধু ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত সোয়া লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সীমান্তের দুই পাশে সক্রিয় একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে এই অনুপ্রবেশ সহজ করে দিচ্ছে। তাদের সাথে আরাকান আর্মির কিছু সদস্য ও রোহিঙ্গারাও জড়িত।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নাফ নদী থেকে শুরু করে পাহাড়ি সব পয়েন্টে টহল বাড়ানো হয়েছে। একইসাথে রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, এনজিও ব্যুরোসহ একাধিক সংস্থাকে সরাসরি মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, রোহিঙ্গাদের বক্তব্য এখানে শোনা হচ্ছে এবং সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ আয়োজিত নিউ ইয়র্ক সম্মেলনে তা উপস্থাপন করা হবে। উদ্দেশ্য, বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পথরেখা তৈরি করা এবং তহবিল সঙ্কট মোকাবিলা করা।
জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, এ বছর রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও জুলাই পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩০৩ মিলিয়ন, যা ৩২ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ৭২ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, কিন্তু হাতে এসেছে ১০ মিলিয়নেরও কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
এদিকে, রোহিঙ্গা নেতৃত্ব বলছে, রাখাইনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হচ্ছে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নেতা মো: জোবায়ের জানান, জান্তা সরকার মংডু-বুথেডং দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিতওয়ে অঞ্চলে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখনো ক্যাম্পে বন্দী অবস্থায় আছে। সীমান্তের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আরসা, আরএসও ও আরআইআরসহ সশস্ত্র সংগঠনগুলোও সঙ্ঘাতে সক্রিয়। তাদের হামলা ও পাল্টা হামলার ধাক্কায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তে জড়ো হয়েছে। অনেকে নাফ নদী পেরোনোর চেষ্টা করছে, যাদের প্রতিদিনই আটক করছে বিজিবি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই ঢল প্রতিহত করা না গেলে বাংলাদেশ আবারো নতুন মানবিক সঙ্কটে পড়বে।


