পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ঈদুল আযহা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এটি আত্মত্যাগ, আল্লাহভীতি (তাকওয়া), সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান উপলক্ষ। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ এই ঈদ উদ্যাপন করে থাকে। এ দিনটি হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর আল্লাহর পথে ত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দেয়। কুরআন ও হাদীসে ঈদুল আযহার বিশেষ গুরুত্ব ও এর করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
১. গুসল ও পরিচ্ছন্নতা গ্রহণ
ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে গোসল করতেন।
দলীল:
ইবনু মাজাহ শরীফে বর্ণিত—
“كانَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ يغتسلُ يومَ الفطرِ ويومَ الأضحى”
(ইবনু মাজাহ, হাদীস: ১৩১৫)
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে গোসল করতেন।”
পরিচ্ছন্ন ও উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করাও ঈদের আদবের অংশ।
২. ঈদের নামাজ আদায়
ঈদুল আযহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ঈদের নামাজ আদায় করা। এটি সুন্নাতে মুআক্কাদাহ, যা জামাআতে আদায় করা উত্তম।
দলীল:
জাবির (রা.) বলেন:
“شهدت مع رسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ وسلَّمَ الصلاةَ يومَ العيدِ، فبدأ بالصلاةِ قبلَ الخطبةِ”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৬০)
অর্থ: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ঈদের নামাজে উপস্থিত ছিলাম। তিনি খুতবার আগে নামাজ আদায় করতেন।”
ঈদের নামাজে যাওয়ার সময় এবং নামাজের পর তাকবির পাঠ করা সুন্নত:
“اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ”
৩. কুরবানি করা
ঈদুল আযহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি করা। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি তাকওয়ার প্রকাশ ও হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নতের অনুসরণ।
দলীল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ”
(সূরা কাউসার, আয়াত: ২)
অর্থ: “তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কুরবানি করো।”
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে:
“لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ”
(সূরা হজ্জ, আয়াত: ৩৭)
অর্থ: “আল্লাহর নিকট পশুর মাংস কিংবা রক্ত পৌঁছে না, বরং তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে।”
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ”
(তিরমিজি, হাদীস: ১৪৯৩)
অর্থ: “নহর দিবসে (কুরবানির দিনে) মানুষের এমন কোনো কাজ নেই, যা আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার (কুরবানি) চেয়ে অধিক প্রিয়।”
৪. কুরবানির পশুর প্রতি সদ্ব্যবহার
ইসলাম কুরবানির পশুর প্রতিও সদয় আচরণ করতে উৎসাহিত করেছে। পশুকে কষ্ট না দিয়ে দ্রুত কুরবানি করা এবং ধারালো ছুরি ব্যবহার করা সুন্নত।
হাদীস:
“إن الله كتب الإحسان على كل شيء، فإذا قتلتم فأحسنوا القتلة، وإذا ذبحتم فأحسنوا الذبحة”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯৫৫)
অর্থ: “আল্লাহ প্রত্যেক কাজে উত্তমভাবে করার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন তোমরা জবেহ করো, তখন তা উত্তমভাবে করো।”
৫. কুরবানির গোশত বিতরণ
কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে—এক ভাগ নিজে খাওয়া, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া, এবং এক ভাগ গরিবদের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব।
দলীল:
“فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ”
(সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৮)
অর্থ: “তোমরা নিজেরাও তা থেকে খাও, আর অভাবগ্রস্ত গরিবদেরও খাওয়াও।”
৬. আত্মসমালোচনা ও তাকওয়া অর্জন
ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকা এবং তাকওয়া অর্জন করা। এ দিনে আমাদের উচিত নিজের ভেতর তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করা।
৭. অহংকার ও অপচয় থেকে বিরত থাকা
ঈদের আনন্দ উপভোগ করলেও যেন তা অপচয়, আত্মপ্রদর্শন বা গরিবদের খাটো করে দেখার মাধ্যমে না হয়। কুরআনে বলা হয়েছে:
“إِنَّ اللّهَ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ”
(সূরা আন’আম, আয়াত: ১৪১)
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।”
ঈদুল আযহা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি একজন মু’মিনের ঈমান, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের পরীক্ষা। এই দিনে ইসলাম নির্দেশিত করণীয়সমূহ যথাযথভাবে পালন করলে তা শুধু আমাদের ইবাদত হিসেবে কবুল হবে না, বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে শান্তি, সহমর্মিতা ও আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেবে। আমাদের উচিত ঈদের আনন্দকে ইবাদতের রূপে পরিণত করে, আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ঈদের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ করা।


