পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ষইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সময় আজ রোববার ভোর ৬টা ৩০ মিনিট থেকে তা কার্যকর হচ্ছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, দীর্ঘ আলোচনার পর মন্ত্রিসভা এই চুক্তি অনুমোদন করে। দু’জন কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী এতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই চুক্তি যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও গাজার খান ইউনুস ও নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলগুলো জানিয়েছে, গত বুধবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১২২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল।
গতকাল শনিবার ভোরের দিকে ইসরাইলের জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুমোদন পায়। এর আগে টানা ছয় ঘণ্টা বৈঠক করেন নেতানিয়াহু সরকারের মন্ত্রীরা। নেতানিয়াহুর দফতরের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বন্দীদের ফিরিয়ে আনার চুক্তির (ফ্রেমওয়ার্ক) অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইল সরকার। রোববার থেকে এটা কার্যকর হবে। এর আগে গত শুক্রবার ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর জোট সরকারের মন্ত্রিসভার ২৪ সদস্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন আটজন।
অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইসরাইলি হামলায় তাদের সর্বশেষ দৈনিক হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৪৬ হাজার ৮৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় আরো ২৩ জন নিহত ও ৮৩ জন আহত হয়েছেন। যার ফলে আহতের মোট সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ৭২৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী কাতার, যুক্তরাষ্ট্র এবং মিসর চুক্তিটি ঘোষণা করার দুই দিন পর ইসরাইল ও হামাস সেটির শর্ত চূড়ান্ত করে। প্রথম পর্যায়ে, বন্দী বিনিময় ছাড়াও ইসরাইলি বাহিনী গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে আসবে এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা বাড়ি ফেরার সুযোগ পাবেন। প্রতিদিন শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বাকি বন্দীদের মুক্তি, ইসরাইলের সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হবে। তৃতীয় ধাপে গাজার পুনর্গঠন এবং নিহত বন্দীদের লাশ ফেরত দেয়া হবে। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা থাকবেন।
এদিকে চুক্তি নিয়ে ইসরাইলি মন্ত্রিসভায় বিভাজন দেখা দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর এই চুক্তিকে ‘ভয়ানক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মুক্তি দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার দল চুক্তি অনুমোদিত হলে সরকার থেকে বেরিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয়। অপর দিকে, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মট্রিচ বলেন, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষে যুদ্ধ পুনরায় শুরু না হলে তার দলও সরকার ত্যাগ করবে।
গাজার দায়িত্ব নিতে চায় পিএ : গাজা উপত্যকার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনের সরকারি জোট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ)। গত শুক্রবার ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট এবং পিএ জোটের বৃহত্তম শরিক ফাতাহের শীর্ষ নেতা মাহমুদ আব্বাসের দফতর থেকে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট আব্বাসের নির্দেশনা অনুযায়ী গাজা উপত্যকার পূর্ণ দায়-দায়িত্ব নিতে যাবতীয় প্রস্তুতির শেষ করেছে ফিলিস্তিনের সরকার। এই দায়িত্ব পালনের জন্য যেসব প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা টিম প্রয়োজন, সেসব গঠনের কাজও শেষ হয়েছে।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ফিরিয়ে আনা, পানি ও বিদ্যুৎসহ জরুরি সব পরিষেবা ফের চালু করা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং উপত্যকার ভবন, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজে নেতৃত্ব দেবে পিএ। গাজা উপত্যকায় এক সময় ফাতাহ ক্ষমতাসীন ছিল। ২০০৬ সালের নির্বাচনে সেখানে হামাস জয়ী হয়। তার পর আর কোনো নির্বাচন হয়নি গাজায়। ফলে প্রায় ১৯ বছর ধরে উপত্যকা নিয়ন্ত্রণ করছে হামাস।
শনিবার যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইল, তার অন্যতম একটি শর্ত বা ধারা হলো: হামাস আর গাজার নেতৃত্বে থাকতে পারবে না। এ ব্যাপারে হামাস প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, হামাসের নেতৃত্ব এই শর্তে সায় দিয়েছে। ২০২৪ সালে এএফপিকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম। সেখানে তিনি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পর আর গাজা শাসনের দায়িত্বে থাকতে চাইছে না হামাস।
এ ছাড়া সম্প্রতি কায়রোতে হামাস এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীর অঞ্চলে ক্ষমতাসীন ফাতাহের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে দু’পক্ষের প্রতিনিধিরা এই মর্মে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) মনোনীত যেকোনো দল বা গোষ্ঠী গাজাকে নেতৃত্ব দিতে পারবে।
বন্দীর নতুন তালিকা প্রকাশ : গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ে মুক্তি দেয়ার জন্য ইসরাইলের কারাগারে বন্দী ৭৩৭ ফিলিস্তিনির হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে ইসরাইলি বিচার মন্ত্রণালয়। ইসরাইলি বিচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আজ রোববার বিকেল ৪টার আগে এই বন্দীদের মুক্তি দেয়া হবে না। যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় মুক্তি দেয়ার জন্য এর আগে কারাবন্দী ৯৫ ফিলিস্তিনির একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল ইসরাইলে বিচার মন্ত্রণালয়। পরে এই তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, গাজায় হামাসের হাতে থাকা ৩৩ বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এসব বন্দীকে মুক্ত করে দেবে। ইসরাইলি তালিকায় কারাবন্দী খালিদা জাররারের নাম আছে। তিনি ফিলিস্তিনি সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের নেতা। একই সাথে তিনি ফিলিস্তিনের আইন পরিষদের সদস্য। তালিকায় ফিলিস্তিনের সাংবাদিক বুশরা আল তাবিলের নামও রয়েছে।
ফিলিস্তিনি তিন সংগঠন- হামাস, ইসলামিক জিহাদ ও ফাতাহর বেশ কয়েকজন সদস্যকে মুক্তি দিতে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে ইসরাইল। তাদের অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করে আসছেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল। শনিবার ভোরের দিকে ইসরাইলের জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুমোদন পায়। এর আগে গত শুক্রবার ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করে।
হামলা হলে বন্দীদের হত্যার হুমকি : যুদ্ধবিরতিতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে এমন ঘোষণা আসার পরও গাজায় নির্বিচার হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। বুধবার এ ঘোষণা আসার পর ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় ১২২ জন নিহত হয়েছেন। অন্যান্য সূত্র বলছে, এ সংখ্যা আরো বেশি। কাতার ও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি আজ (রোববার) সকাল সাড়ে ৬টায় কার্যকর হবে। মনে করা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ফিলিস্তিনে হামলার মাত্রা বাড়াতে পারে ইসরাইল। এমন আবহে ইসরাইলকে সতর্ক করেছে ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ।
ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, গাজার ওপর ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকলে তারা মুক্তির প্রাক্কালে থাকা বন্দীদের হত্যা করতে পারে। পিআইজের সামরিক শাখার মুখপাত্র আবু হামজা বলেছেন, যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের হামলা আরো বাড়ায়, তবে এটি তাদের শিশুদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইসলামিক জিহাদ জানিয়েছে, হামাসের পাশাপাশি তারাও ইসরাইলি বন্দীদের আটক রেখেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত কয়েক দিনের হামলায় বহু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং অগণিত পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির আগে এই ধরনের হামলার ফলে আরো মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অপরদিকে বন্দীদের পরিবারের সদস্যরা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এই ধরনের আক্রমণ বন্দীদের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকি সৃষ্টি করছে এবং আলোচনার পরিবেশ আরো জটিল করে তুলছে।
এদিকে হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও বন্দী মুক্তির প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে ‘প্রস্তুত’ বলে জানিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এক বিবৃতিতে আইডিএফ বলেছে, সরকার গত রাতে চুক্তি অনুমোদন লাভ করেছে এবং আগামীকাল থেকে কার্যকর হবে।
সূত্র: খবর : আলজাজিরা, বিবিসি, সিএনএন ও টাইমস অব ইসরাইল।


