গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর ফিরছেন বাসিন্দারা

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর ফিরছেন বাসিন্দারা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গতকাল শুক্রবার হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি তাদের বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। ইসরাইলি সেনারা গাজার কয়েকটি এলাকা থেকে পিছু হটা শুরু করলে ফিলিস্তিনিরা দলে দলে ধুলায় মোড়া রাস্তায় হেঁটে গাজা সিটির দিকে ফিরতে থাকেন, যা কয়েক দিন আগেই ইসরাইলের বড় হামলায় ধ্বংস হয়। এ দিকে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য কয়েকশ’ মার্কিন সেনা গাজার বাইরে অবস্থান নিয়েছে। আর গাজায় শান্তি রক্ষার কাজে যেকোনো মিশনে অংশ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। অন্য দিকে দুই ধাপে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, সমঝোতা অনুযায়ী গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে পারবে। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা (বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা) থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। আইডিএফের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেনারা ‘সমঝোতা অনুযায়ী নির্ধারিত নতুন অবস্থানে মোতায়েন সম্পন্ন করেছে।’ দক্ষিণ কমান্ডের সেনারা এলাকায় অবস্থান করছে এবং তারা যে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকবে। ইসরাইলি বাহিনী প্রথম ধাপের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে, যা আলোচনায় নির্ধারিত সীমান্তরেখা পর্যন্ত সীমিত থাকবে। সমঝোতা অনুযায়ী, সেনা প্রত্যাহারের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অবশিষ্ট সব ইসরাইলি বন্দী এবং প্রায় এক হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়া হবে। হামাসের জন্য এই সময়সীমা সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তবে ঠিক কখন এবং কোথায় বন্দিমুক্তি কার্যক্রম হবে তা এখনো জানা যায়নি।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরাইল নিশ্চিত করে যে, তারা যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তি চুক্তি মেনে নিয়েছে, যা গাজা যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। এর পরই সেনারা গাজা উপত্যকার ভেতরে সমঝোতাকৃত অবস্থানে ফিরে যায় এবং আইডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেয়।

মধ্যরাতের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি।’ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরাইলি ও গাজার মানুষ উভয়েই স্বস্তি ও উদযাপনে মেতে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা অপারেশন সমন্বয়ে সহায়তার জন্য ২০০ সেনা পাঠিয়েছে, তবে তারা গাজায় প্রবেশ করবে না। এ দিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ইতোমধ্যে সহায়তা কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিয়েছে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি এখনো অনিশ্চিত। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বড় ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী ইসমাইল জায়দা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার বাড়িটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এ জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি; কিন্তু চার পাশের সব শেষ। আমার প্রতিবেশীদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে; পুরো পাড়া-পড়শি নিশ্চিহ্ন।’

গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনীকে গাজার প্রধান শহরগুলো থেকে সরে আসতে বলা হয়েছে; যদিও তারা এখনো উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। চুক্তি কার্যকর হলে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী ট্রাকগুলো গাজায় ঢুকতে পারবে। এর ফলে ত্রাণ দেয়া যাবে সেই লাখো নাগরিককে, যারা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিল।

গাজার মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার : ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, সরকার সব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিতে একটি প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে। গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনুস শহরের বাসিন্দাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কিছু ইসরাইলি সেনা গাজার পূর্ব দিকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে পিছু হটেছে; যদিও সেখানে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে।

গাজার কেন্দ্রস্থল নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে কিছু ইসরাইলি সেনা তাদের সামরিক অবস্থান গুটিয়ে ইসরাইলি সীমান্তের দিকে চলে যায়। তবে গতকাল ভোরের দিকে গোলাগুলির শব্দ শোনার পর বাকি সেনারা সেই এলাকাতেই থেকে যায়। রয়টার্স জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে গাজা সিটির দিকে যাওয়ার রাস্তা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে এসেছে। গত মাসজুড়ে ইসরাইলি আক্রমণের শিকার এই অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার আশায় সেখানে আজ শত শত মানুষ জড়ো হয়। তবে কাছাকাছি গোলাগুলির শব্দ শুনে অনেকে সামনে এগোনোর বিষয়ে দ্বিধান্বিত ছিল। বাসিন্দারা জানায়, হাতে গোনা কয়েকজন হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। গাজা সিটিতে উদ্ধারকর্মীরা সেই এলাকাগুলোতে কাজ শুরু করেছেন, যেখানে তারা আগে পৌঁছাতে পারেননি। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, আগের হামলায় নিহত অন্তত ১০টি লাশ তারা উদ্ধার করেছেন।

দীর্ঘ দুই বছর পর বাড়ি ফেরার অনুভূতি জানিয়ে ৪০ বছর বয়সী মাহদি সাকলা বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতি এবং অস্ত্রবিরতির খবর শোনার সাথে সাথেই খুব খুশি হয়েছিলাম। গাজা সিটিতে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম। অবশ্য এখন আর বাড়ি নেই; সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ হলেও সেখানে ফিরে যেতে পারলে আমরা খুশি। এটাও এক দারুণ আনন্দ। গত দুই বছর আমরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাস্তুচ্যুত হয়ে কষ্ট সহ্য করেছি।’

ইসরাইলি মন্ত্রিসভায় চুক্তি অনুমোদন : দুই বছর ধরে চলা গাজা সঙ্ঘাতের অবসানে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরাইল। শুক্রবার দেশটির মন্ত্রিসভা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করেছে। রয়টার্স ও আলজাজিরা সূত্রে জানা গেছে, মধ্যস্থতাকারীদের সমঝোতার ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পর এই অনুমোদন আসে।

চুক্তির আওতায় ইসরাইল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়া হবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘সরকার এইমাত্র জীবিত ও মৃত সব বন্দীকে মুক্তির বিষয়ে চুক্তির কাঠামো অনুমোদন করেছে।’ চুক্তির ঘোষণা আসার পর ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। দুই বছর ধরে চলা এই সঙ্ঘাতের অবসানে এটিকে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে মার্কিন সেনা মোতায়েন : বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণে ২০০ মার্কিন সেনা পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইল থেকে গাজার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখবেন তারা। এ লক্ষ্যে দেশটিতে বসানো হবে যৌথ কন্ট্রোল সেন্টার। পর্যবেক্ষক দলটির নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক কর্মকর্তারাও এই দলে থাকবেন। তারা ইসরাইলি বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

ফিলিস্তিনিদের বের করা হবে না, বললেন ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তার প্রস্তাবিত ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে এবং এই চুক্তির অধীনে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে বিতাড়িত করা হবে না। বরং তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘কাউকে জোর করে বের করে দেয়া হবে না, বরং একদম উল্টোটা। এটি একটি দারুণ পরিকল্পনা।’ তিনি আরো জানান, বন্দীদের মুক্তি দেয়া হবে সোম বা মঙ্গলবার এবং তিনি মিসরে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আশা করছেন।

পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সব ইসরাইলি বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়া, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনাদের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত আছে। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে হামাসবিহীন নতুন গাজা প্রশাসন গঠন, একটি ফিলিস্তিনি-আরব নিরাপত্তাবাহিনী গঠন এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে হামাসের এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, আমাদের আত্মরক্ষার অস্ত্র দরকার এবং প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। জবাবে ট্রাম্প জানান, নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি দ্বিতীয় ধাপে সমাধান করা হবে এবং ইসরাইলি বাহিনীরও পিছু হটার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’র মন্তব্য করেন, ‘বন্দীদের মুক্তিই এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবে’।

যেকোনো অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত তুর্কি বাহিনী : ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে গাজায় শান্তি রক্ষায় যেকোনো মিশনে অংশ নিতে প্রস্তুত তুরস্কের সেনাবাহিনী। শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। সেনাবাহিনী গাজায় শান্তিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দিবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র জানায়, ‘তুরস্কের সশস্ত্রবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার অভিজ্ঞতা নিয়ে যেকোনো দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত।’ তুরস্ক যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলমান আলোচনায় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে এবং আলোচনায় অংশ নিতে মিসরীয় শহর শার্ম আল শেখে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। এএফপি জানায়, এর আগে বৃহস্পতিবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান জানান, তুরস্ক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন তদারকিতে একটি টাস্কফোর্সে অংশ নেবে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। একই দিন রাতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, তুরস্ক ও কাতার মিলে একটি দল গঠন করবে। যারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করবে এবং চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। ফিদান আরো জানান, এই দেশগুলো মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখবে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর বাস্তবায়নে তদারকি করবে।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও আলজাজিরা

Related Articles