গাজায় হত্যাযজ্ঞ জোরদার করতে নেতানিয়াহুকে নির্দেশ ট্রাম্পের

গাজায় হত্যাযজ্ঞ জোরদার করতে নেতানিয়াহুকে নির্দেশ ট্রাম্পের

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে কয়েক দিন পরই এমন একটি চুক্তি হবে যা গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, বন্দীদের মুক্তি নিশ্চিত করবে এবং ত্রাণ সরবরাহকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেবে। এখন ট্রাম্পের সেই আশা অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বরাবরের মতোই হামাসের ওপর দোষ চাপিয়ে ট্রাম্প এই সপ্তাহে তার আলোচকদের যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে সরিয়ে নেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবর অনুসারে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, তিনি বন্দীদের মুক্ত করার জন্য ‘বিকল্প উপায়’ খুঁজছেন। এমনকি ট্রাম্প অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর পরিবর্তে গত শুক্রবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইসরাইলের সামরিক অভিযান আরো তীব্র করার সময় এসেছে, যখন গাজায় ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। তিনি শুক্রবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘ফিনিশ দ্য জব, দে ওয়ান্ট টু ডাই’। অর্থাৎ, প্রকারান্তে তিনি নেতানিয়াহুকে গাজায় ‘হত্যাযজ্ঞ’ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নির্দেশকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের একটি নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্কটল্যান্ড সফরে রওনা হওয়ার আগে গত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইসরাইলের এখন ‘কাজটা শেষ করে ফেলা উচিত’। কারণ হামাস ‘আলোচনায় বসতে চায় না। তারা আসলে মরতে চায়’।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, ওরা (হামাস) মরতে চায়, আর সেটা খুবই, খুবই দুঃখজনক। কাজটা শেষ করতেই হবে’। ট্রাম্পের এসব মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা গাজাকে ‘জীবন্ত লাশে ভরা অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিচ্ছেন।

এসব সত্ত্বেও ট্রাম্পের বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইসরাইলের চলমান ২১ মাসব্যাপী সামরিক অভিযানের নামে গণহত্যায় সমর্থন জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে গত সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ কাতারের দোহায় চলমান মার্কিন-মধ্যস্থতাকারী যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, ‘হামাসের মধ্যে আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে’ এবং এখন যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প পথে বন্দীদের মুক্তির চেষ্টা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনে কাতার ও মিসরের কূটনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। এই দেশ দুটিই মূলত গাজা যুদ্ধবিরতির প্রধান মধ্যস্থতাকারী। দোহায় আলোচনার সাথে যুক্ত একটি সূত্র বলেন, এটা এক রকম ভূমিকম্প। এখন আমরা আফটারশক সামাল দিচ্ছি। তবে মিসর ও কাতারের কর্মকর্তারা আলোচনার এই অচলাবস্থাকে ‘এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করে গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

এক যৌথ বিবৃতিতে মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এ দিকে ইসরাইলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, আলোচনাগুলো ‘একেবারেই ভেঙে পড়েনি’ এবং একটি নতুন চুক্তির জন্য এখনো পথ খোলা আছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশা করি, হামাস বাস্তবতায় ফিরে আসবে, যাতে বাকি ফারাকগুলো দূর করা যায়’।

এ দিকে ট্রাম্প দাবি করে বলছেন, হামাসের হাতে থাকা অনেক বন্দী ইতঃমধ্যে মুক্তি পেয়েছে বা নিহত হয়েছে। যার ফলে তারা আর আলোচনায় চাপ তৈরি করতে পারছে না। তিনি হামাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়নি’। ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তাদের (ইসরাইল) লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, শেষ করতে হবে সব কিছু… তাদের সরিয়ে দাও’।

গাজায় ত্রাণ পাঠানোর অনুমতি : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় বিদেশী দেশগুলোকে সাহায্য পাঠানোর অনুমতি দিল ইসরাইল। একজন সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর রেডিও। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধের তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি ইসরাইলের সামরিক মুখপাত্র।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত মার্চ মাসে ফিলিস্তিনি উপত্যকায় ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। এরপর থেকে উপত্যকাটিতে অনাহারে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছে।

আকাশ পথে ত্রাণ সরবরাহ : গাজার অবরুদ্ধ অঞ্চলে আকাশপথে ত্রাণ পাঠাতে যাচ্ছে ব্রিটেন, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইসরাইল এই দেশগুলোকে শিগগিরই অনুমতি দেবে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল। ইসরাইলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আজই (শনিবার) জর্ডান থেকে বিমানযোগে গাজায় ত্রাণ ফেলা হতে পারে। এর আগেও ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, মিসর ও ফ্রান্স যৌথভাবে আকাশপথে গাজায় কয়েক হাজার ত্রাণ প্যাকেট পাঠিয়েছিল।

অনাহারে এক তৃতীয়াংশ মানুষ : দিনের পর দিন অনাহারে রয়েছে গাজার এক তৃতীয়াংশ মানুষ। এক বিবৃতিতে জাতিসঙ্ঘের খাদ্যবিষয়ক কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গাজার ৯০ হাজার শিশু ও নারী অপুষ্টিতে ভুগছেন। তাদেরকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহে গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার অপুষ্টিতে আরো ৯জন প্রাণ হারিয়েছেন। এতে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ জনে। এদিকে ইসরাইল দাবি করেছে, গাজায় ত্রাণ প্রবেশে কোনো প্রকার বাধা দেয়া হচ্ছে না। তারা ওই পরিস্থিতির জন্য হামাসকে দোষারোপ করছে।

একদিনে ১০০ বার বোমাবর্ষণ : গাজায় আক্রমণকারী দখলদার স্থলবাহিনীকে সমর্থন করার জন্য একদিনে গাজাজুড়ে ১০০টিরও বেশি স্থানে হামলা করেছে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো। গতকাল শনিবার ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। ইসরাইলের যুদ্ধ এবং গাজা উপত্যকার ওপর আরোপিত অবরোধের কারণে আরো দুই শিশুর মৃত্যু ঘটেছে অপুষ্টিতে।

এই নিয়ে প্রাণঘাতী খাদ্যসঙ্কটের ফলে অঞ্চলটিতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০-এরও বেশি, যার মধ্যে রয়েছে ৮০ জনেরও অধিক শিশু। সেই সাথে দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে দখলদার বাহিনীর ৩৬তম ডিভিশন ‘অতিরিক্ত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্প্রসারণ এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস’ করার জন্য কাজ করছে বলে দাবি করেছে।

অর্থাৎ হামলা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত হচ্ছে। গাজার হাসপাতাল সূত্রে আলজাজিরা জানিয়েছে, শনিবার ভোর থেকে গাজায় ইসরাইলি বাহিনী ২৫ জনকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে ১৪ জন জড়ো হয়েছিলেন ত্রাণের আশায়। সর্বশেষ এক হামলার খবরে আলজাজিরার আরবি সংবাদদাতা জানিয়েছেন, উত্তর গাজা উপত্যকায় ত্রাণপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

পশ্চিম তীরে হামলা : গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরের বেথলেহেমে বসতি স্থাপনকারী এবং ইসরাইলি সৈন্যরা আক্রমণ শুরু করেছে। এ ছাড়া জেরিকোতেও একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। এক প্রতিবেদনে আলজাজিরা জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের জমি, সম্পত্তি ও গবাদি পশু লুটপাট করেছে।

স্থানীয় একজন আরব বেদুইন অধিকার কর্মকর্তা ওয়াফা সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, বসতি স্থাপনকারীরা কাছাকাছি একটি অবৈধ ফাঁড়ি থেকে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে বেথলেহেমের দক্ষিণে বেইত ফাজ্জারে ইসরাইলি সৈন্যরা আজ ৩১ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তিকে হত্যা করার পর একটি নতুন অভিযান শুরু করেছে। তার লাশ এখনো ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। জেনিনের পশ্চিমে বুরকিন শহরে আরেকটি অভিযানের খবর পাওয়া গেছে। সেখানেও ইসরাইলি বাহিনী বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি লুটপাট করেছে।

ছয় ট্রাক জরুরি চিকিৎসা সহায়তা : গাজায় ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসন ও অবরোধে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে হাসপাতাল, পুড়েছে গুদাম, ভেঙে পড়েছে চিকিৎসা সেবা। প্রাণ বাঁচানো সরঞ্জামের চরম অভাবে চিকিৎসকরা অসহায়। এই পরিস্থিতিতে শিশুবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউনিসেফ গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কিছুটা বাঁচাতে ছয়টি ট্রাকে করে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এই উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবায় নতুন আশার আলো। শনিবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা আনাদোলু। শনিবার গাজার হাসপাতালে ইউনিসেফের পাঠানো ছয়টি চিকিৎসাসামগ্রীবাহী ট্রাক প্রবেশ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই ট্রাকগুলোতে শুধু জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে, কোনো খাদ্যসামগ্রী নেই।

হামলা ও অবরোধের ফলে হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় এই সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে ও অসংখ্য আহত-অসুস্থ মানুষকে বাঁচাতে এই চিকিৎসাসামগ্রী অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে এই ছয়টি ট্রাকে নবজাতকের জন্য ইনকিউবেটর, মেডিক্যাল কিট, অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রীসহ বিভিন্ন জরুরি সরঞ্জাম রয়েছে।

তবে, এসব সহায়তা পৌঁছানোর পথে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। একদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি, অন্য দিকে ভেঙে পড়া সরবরাহ ব্যবস্থা উভয়ই কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাগরিক, স্থানীয় নেতা ও সংশ্লিষ্টদের এই ট্রাকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে, কোনো বাধা বা হস্তক্ষেপ এই সহায়তা বিলম্বিত বা ব্যর্থ করে দিতে পারে।

Related Articles