চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাইপ লাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন আনুষ্ঠানিকভাবে আজ শনিবার হতে শুরু হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েক দফায় সরবরাহের পর আজ সকালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ ডেসপাস টার্মিনালে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। এতে প্রতি বছর ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল সরবরাহের পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গাদনাইল হয়ে ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মে. টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। চট্টগ্রামস্থ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার প্রধান ডিপো থেকে ঢাকা অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহকালে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত হয়। এগুলো পুরোপুরি সুরাহা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানি তেলের বেশির ভাগই বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। যেখানে কোটি কোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নেয়। বছর শেষে এই পয়েন্ট ১৭ শতাংশ বিশাল অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। সিস্টেম লস কিংবা তেল চুরির এই বিশাল লোকসান থেকে দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরকে বাঁচাতেই মূলত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপলাইনে বর্তমানে ২৭ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেয়া হবে। জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনে ২০১৬ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তিন দফা সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে চলতি বছরের মার্চে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বেড়েছে ৮৩৮ কোটি টাকা। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে এই পাইপলাইন ব্যবহার করে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি জ্বালানি সরবরাহ করবে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বরুড়া হয়ে জ্বালানি তেল যাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায়। কুমিল্লার বরুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। সর্বাধুনিক এই ডিপো থেকে চাঁদপুর, বি-বাড়িয়াসহ সন্নিহিত অঞ্চলের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলসরবরাহ করা হবে। যা এখন নৌপথে চাঁদপুরে পাঠানো হয়ে থাকে। এই ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহ, তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ সবই পরিচালিত হবে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। ম্যানুয়ালি কোনো কাজই হবে না। চট্টগ্রামের ডেসপাস টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই পুরো পাইপলাইনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হবে। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন ও লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপলাইনের সাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে। ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ এই পাইপলাইন ২২টি নদী ও খালের নিচ নিয়ে এসেছে এবং পুরো রুটে মোট ৯টি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
নৌপথে তেলবাহী ট্যাংকারে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তেল পরিবহনে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪ ঘণ্টায় তেল পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো: আমিনুল হক জানিয়েছেন, বর্তমানে নৌ ও সড়কপথে ডিজেল পরিবহনে বছরে খরচ হচ্ছে ৩২৬ কোটি টাকা। পাইপলাইনে জ্বালানি পরিবহন শুরু হলে এই খরচ আর লাগবে না। তবে পাইপলাইনটির রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হবে ৯০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বছরে সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা। পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের এই কার্যক্রম দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি তেল চুরি এবং অপচয় ঠেকানোসহ কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করবে।


