পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পতিত শক্তি গণ্ডগোল লাগিয়ে নির্বাচনের আয়োজনকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে। এই অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অভ্যুত্থানের সব শক্তি মিলে একটি সুন্দর নির্বাচন করতে না পারলে এই মস্তবড় সুযোগ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গতকাল শনিবার বিকেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, পরাজিত শক্তি যখনই সুযোগ পাচ্ছে তখনই নানা রকম গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে। এসব করে তারা দেশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। যখনই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি তখনই নানা ষড়যন্ত্র সামনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কোনো ষড়যন্ত্র করেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কারণ ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে সবগুলো গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য স্পষ্ট, বলেন প্রধান উপদেষ্টা। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও প্রধান উপদেষ্টাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে জাতীয় গণফ্রন্টের আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, ১২ দলীয় জোটের মোস্তফা জামাল হায়দার, নেজামে ইসলাম পার্টির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, ন্যশনাল পিপলস পার্টির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ জাসদের ড. মুশতাক হোসেন, ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্টের ববি হাজ্জাজ, ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, ভাসানী জনশক্তি পার্টির রফিকুল ইসলাম বাবলু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মাসুদ রানা এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী উপস্থিত ছিলেন।
৪/৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন প্রধান উপদেষ্টা : চার-পাঁচ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন বলে উল্লেখ করেছেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার সাথে বিভিন্ন দলের বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
মোস্তফা জামাল বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ক্যাটাগরিক্যালি (সুস্পষ্টভাবে) বলেছেন, তিনি আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে নির্বাচনের সময়সীমা, তারিখ ঘোষণা করবেন। আলোচনার সবচেয়ে ফলপ্রসূ বিষয় হচ্ছে এটা। দেশে যে অরাজকতা, তার একমাত্র সমাধানের পথ নির্বাচন। এটা সরকার বুঝতে পেরেছে।’ জাতীয় পার্টির এই নেতা বলেন, এর (নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা) চেয়ে আনন্দের বার্তা আর কিছু হতে পারে না। নৈরাজ্যের সমাধান করবে নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
একই প্রসঙ্গ টেনে বৈঠক থেকে বের হয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা আমাদের জানান, আগামী অল্প কয়েকদিনের মধ্যে জুলাই সনদের সাথে নির্বাচন কবে হবে এবং প্রক্রিয়া কী হবে, এ নিয়ে অফিসিয়াল ব্রিফিং করে তার পক্ষ থেকে জাতির জন্য পরিষ্কার করে জানানো হবে। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের সাথে মিটিংয়ে বসে আমাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখসহ সবকিছু জাতির সামনে তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, সামনে নিরপেক্ষ নির্বাচন করার যে প্রত্যাশা সেটা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এ কারণে আমরা সবাই প্রধান উপদেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছি। এখন আমাদের প্রত্যাশা আমরা নির্বাচনের তারিখ জানব। পুরো দেশবাসীকে নির্বাচনের জন্য তৈরি হওয়ার জন্য বলেছেন। ববি হাজ্জাজ বলেন, আজকের আলোচনায় সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে যে অপপ্রচার হচ্ছে, এগুলো কারা কিভাবে করছে, এগুলো কিভাবে আমরা দমন করতে পারি, এগুলো নিয়ে আমাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, প্রধান উপদেষ্টা মূলত আমাদের কাছে বর্তমান সঙ্কটের কথা তুলে ধরেছেন। পাঁচ আগস্টের আগে আমরা যখন সবাই এক এবং ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, সেটা যেন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি সেটা বলেছেন। কোনোভাবে পরাজিত শক্তি যেন মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ না পায়।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান উপদেষ্টাকে তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের প্রধান সমস্যা আইনশৃঙ্খলার অবনতি আর কোন অভিযান চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে?
জাতীয় গণফ্রন্টের আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস বলেন, তিনি আগামী ফ্রেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দেয়ার কথা বলেছেন বৈঠকে।
এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান বলেন, প্রধান উপদেষ্টাকে অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে বলেছেন তারা। নির্বাচিত সরকার থাকলে দেশে সন্ত্রাস কমবে। এর আগে দুই দফায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। এরপর গতকাল বিকেলে আরো ১৩টি দল ও একটি জোটের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন তিনি।
হেফাজত নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎ : এ দিকে গতকাল সন্ধ্যায় যমুনায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সাথে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে শাপলা হত্যাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং এ ঘটনার যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
হেফাজত ইসলামের সমাবেশে হামলার বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে অনুসন্ধান করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। এ ছাড়াও ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হেফাজতের নেতাকর্মী ও আলেম ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে মাওলানা খলিল আহমেদ কুরাইশী, মাওলানা সাজেদুর রহমান, মুফতি জসিম উদ্দিন, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মহিউদ্দীন রব্বানী, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি বশির উল্লাহ এবং মুফতি কেফায়তুল্লাহ আজহারী উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।


