নেতানিয়াহুর ‘গ্রেটার ইসরাইল’ মন্তব্যে আরব বিশ্বে নিন্দার ঝড়

নেতানিয়াহুর ‘গ্রেটার ইসরাইল’ মন্তব্যে আরব বিশ্বে নিন্দার ঝড়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলো। সৌদি আরব, কাতার, মিসর ও জর্দানের পাশাপাশি আরব লিগ ই গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিলও নেতানিয়াহুর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে।

আরব নিউজ ও টাইমস অব ইসরাইল জানায়, সেই সাথে তার ওই মন্তব্যকে মধ্যপ্রাচের রাষ্ট্রগুলোর ওপর ‘সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ বলেও অভিহিত করেছে তারা।

নেতানিয়াহু গত মঙ্গলবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল২৪-কে জানান, তিনি ‘গ্রেটার ইসরাইল’ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ‘সংযোগ’ বোধ করেন। এমনকি তিনি নিজেকে ‘একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মিশনে’ আছেন বলে মনে করেন, যা ‘এখানে আসার স্বপ্ন দেখে এমন ইহুদিদের প্রজন্ম এবং আমাদের পরে যারা আসবে তাদের প্রজন্মের জন্য’ বলেও জানান।

আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরাইলের রাজনীতিতে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ শব্দটি পশ্চিম তীর, গাজা এবং সিরিয়ার গোলান হাইটস অন্তর্ভুক্ত করে ইসরাইলের ভূখণ্ডের সম্প্রসারণের ইহুদি মিশন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া এই মিশন মিসরের সিনাই উপদ্বীপ ও জর্দানের কিছু অংশকেও অন্তর্ভুক্ত করে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এ মন্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়েছে মিসর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এ মন্তব্যগুলো ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দলগুলোর আকাক্সক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক, যারা শান্তিকে মূল্য দেয় এবং এই অঞ্চলের সব জনগণের জন্য। জর্দানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে ‘একটি বিপজ্জনক এবং উসকানিমূলক উত্তেজনা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসঙ্ঘ সনদের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। জর্দানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুফিয়ান কুদাহ এটিকে ‘ভ্রান্ত উসকানি’ ও জাতিসঙ্ঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এসব বক্তব্য ‘জর্দান বা আরব বিশ্বকে দুর্বল করতে পারবে না এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার মুছে দিতে পারবে না।’

তিনি আরো বলেন, এই ধরনের মন্তব্য সঙ্ঘাতকে উসকে দেয় এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে। জর্দান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ‘বসতি স্থাপন এবং সম্প্রসারণবাদী ধারণা ও প্রকল্প’ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয় আরো বলেছে যে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি জনগণের তাদের ভূমিতে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক এবং আইনি অধিকার রয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলি দখলদারিত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সতর্ক করছে। কারণ ইসরাইলের কার্যক্রম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।’ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই মন্তব্য ‘দখলদারদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অহঙ্কার, সঙ্কট ও সঙ্ঘাতের ইন্ধন এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর স্পষ্টতই লঙ্ঘনকেই’ প্রতিফলিত করে। তেমনি নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা’ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ‘বিপজ্জনক উসকানি’ বলে অভিহিত করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। তারা ১৯৬৭ সালের সীমান্ত বরাবর একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুসালেম।

নেতানিয়াহুর ‘গ্রেটার ইসরাইল’ মন্তব্যকে ‘চরমপন্থার ভাষা’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য ‘উসকানিমূলক, আগ্রাসী এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাহ্য করার’ ধারাবাহিকতা, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওআইসি সতর্ক করে বলেছে, ‘এই সম্প্রসারণবাদী ঔপনিবেশিক ভাষা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি, যা সহিংসতার চক্রকে উসকে দেয় এবং সঙ্ঘাতকে দীর্ঘায়িত করে।’

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা কবর দিতে চান ইসরাইলি মন্ত্রী

এ দিকে পূর্ব জেরুসালেমকে অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে একটি নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ। তার দফতর জানিয়েছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে ‘কবর দেয়া’ হবে। আলজাজিরা জানায়, বুধবার এক বিবৃতিতে স্মোতরিচ জানান, তিনি জেরুসালেম ও পূর্বদিকে অবস্থিত ইসরাইলি বসতি মা’আলে আদুমিমকে সংযুক্ত করতে ই১ এলাকায় নির্মাণের জন্য দরপত্র অনুমোদন করবেন। তিনি বলেন, ‘ই১-এ নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে সমাপ্ত করবে এবং এটি আমাদের সরকারের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাস্তবায়িত ‘ডি ফ্যাক্টো সার্বভৌমত্ব’ পরিকল্পনার একটি অংশ’। স্মোতরিচ, যিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পশ্চিম তীরের বসতি অনুমোদনের দায়িত্বেও রয়েছেন, এই প্রকল্পকে ‘সর্বোত্তম জায়নবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক চাপ ও স্থগিতাদেশের পর আমরা প্রচলিত ধারা ভেঙে মা’আলে আদুমিমকে জেরুসালেমের সাথে সংযুক্ত করছি’।

গাজায় ত্রাণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধের আহ্বান

গাজায় প্রতিনিয়ত খাদ্যসঙ্কট প্রকট হচ্ছে। তাই গাজায় ত্রাণকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ কৌশল বন্ধ করতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শতাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। এক যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে সংস্থাগুলো ইসরাইলকে এই আহ্বান জানিয়েছে।

বিবিসি জানায়, অক্সফাম ও মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্সসহ (এমএসএফ) মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো বলছে, তাদের প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে, ইসরাইলের কঠোর নিয়ম মেনে না চললে ত্রাণ সরবরাহের জন্য তারা ‘অনুমোদন পাবে না’। যেসব সংস্থা ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে ‘অবৈধ’ প্রমাণ করার চেষ্টা করে বা ফিলিস্তিনি কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সেই সংস্থাগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ত্রাণ কার্যক্রমে বিধিনিষেধ দেয়ার কথা অস্বীকার করে ইসরাইল বলেছে, গত মার্চে চালু করা নিয়মগুলো নিশ্চিত করে চালানো ত্রাণ কার্যক্রম ইসরাইলের ‘জাতীয় স্বার্থের’ সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বড় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এক ট্রাকও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম গাজায় পাঠাতে পারেনি।

সংস্থাগুলো বলছে, নতুন নিয়মের অজুহাতে ইসরাইল ‘কয়েক ডজন বেসরকারি সংস্থার জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী আনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে’। শুধু জুলাই মাসেই এ ধরনের ৬০টির বেশি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্থাগুলো সহায়তা পৌঁছে দিতে না পারায় ‘হাসপাতালগুলোয় মৌলিক সরঞ্জামের অভাব দেখা দিয়েছে; শিশু, প্রতিবন্ধী এবং প্রবীণ ব্যক্তিরা অনাহার ও প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে।’ আমেরিকান নিয়ার ইস্ট রিফিউজি এইডের (আনেরা) প্রধান নির্বাহী (সিইও) শেন ক্যারল বলেন, ‘আনেরার কাছে ৭০ লাখ ডলারের বেশি জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম গাজায় পাঠানোর জন্য প্রস্তুত আছে। এর মধ্যে ৭৪৪ টন চাল আছে, যা দিয়ে ৬০ লাখ খাবার তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সেগুলো মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আশদোদে আটকে দেয়া হয়েছে।’ মার্চে চালু হওয়া নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংস্থাগুলোকে ইসরাইলে কার্যক্রম চালাতে হলে নিবন্ধন বজায় রাখার জন্য নতুন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এতে আবেদন বাতিল বা নিবন্ধন বাতিল করার শর্তাবলিও আছে। যদি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ মনে করে, কোনো সংস্থা ইসরাইলের গণতান্ত্রিক চরিত্র অস্বীকার করছে বা দেশের বিরুদ্ধে ‘প্রচার’ চালাচ্ছে, তা হলে ওই সংস্থার নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। ইসরাইলের প্রবাসমন্ত্রী আমিচাই চিকলি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘দুঃখজনকভাবে, অনেক সাহায্য সংস্থা শত্রুতাপূর্ণ ও কখনো কখনো সহিংস কর্মকাণ্ডের আড়াল হিসেবে কাজ করে।’ এই মন্ত্রী আরো বলেন, ‘যেসব সংস্থার শত্রুতাপূর্ণ বা সহিংস কর্মকাণ্ডের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এবং বর্জন আন্দোলনের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়া হবে।’ অক্সফামের পলিসি লিড বুশরা খালিদি বলেছেন, ইসরাইল গাজায় ২৫ লাখ ডলারের বেশি (প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ড) মূল্যের পণ্য প্রবেশে বাধা দিয়েছে।

গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত, অনাহারে আরো ৪ ফিলিস্তিনির মৃত্যু

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনাহারে আরো চার ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যার ফলে গাজায় অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯ জনে, যার মধ্যে ১০৬ জন শিশু। একই সময়ে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২২ জন ছিলেন ত্রাণ সংগ্রহকারী। আহত হয়েছেন আরো ৮৩১ জন। এ ছাড়া পূর্ববর্তী হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মে ২৭ থেকে নতুন ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৮১ জনে এবং আহত হয়েছেন ১৩,৮৬৩ জনের বেশি।

Related Articles