পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বাংলাদেশের পাটভিত্তিক শিল্প, সবুজ প্রযুক্তি, টেক্সটাইল ও ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষিত শিল্প রূপান্তর পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চীনা বিনিয়োগকারীরা এখন অবকাঠামোর বাইরে উৎপাদনমুখী খাতের দিকে ঝুঁঁকছেন বলে জানিয়েছেন এক্সিম ব্যাংক অব চায়নার ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াং ডংনিং।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। এখন আমরা জোর দিচ্ছি সরাসরি উৎপাদন খাতে, বিশেষ করে জুট, গ্রিন টেকনোলজি, টেক্সটাইল এবং ফার্মাসিউটিক্যালসে।
‘সোনালি আঁশ’ পাটে চীনের নতুন লক্ষ্য : ইয়াং ডংনিং বলেন, বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে পরিচিত পাটকে কেন্দ্র করে চীনা কোম্পানিগুলো নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে পাট থেকে সবুজ জ্বালানি উৎপাদন, জৈবসার (বায়ো-ফার্টিলাইজার) তৈরি, এবং প্লাস্টিকের বিকল্প পরিবেশবান্ধব উপাদান উৎপাদনে বড় আকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, এসব প্রকল্পে অর্থায়নে সরাসরি আগ্রহী রয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংকও, যেটি এর আগে বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থ জুগিয়েছে।
বছরে ১০ লাখ টন পাট ব্যবহারের প্রস্তুতি : চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির প্রেসিডেন্ট ড. মা জুন বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পকে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিকায়ন করতে চায়।
তার ভাষায়, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশী অংশীদারদের সাথে যৌথ উদ্যোগে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন পাট ব্যবহার করে সবুজ জ্বালানি, সার ও প্লাস্টিকের
বিকল্প পণ্য তৈরি করার জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, যৌথ বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব।
উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চীনের ভূমিকা : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। আমরা চাই বাংলাদেশ একটি বৈশ্বিক উৎপাদন
কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠুক। তিনি বিশেষভাবে ফার্মাসিউটিক্যালস এবং স্বাস্থ্য খাতকে বিনিয়োগের
সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
সৌরবিদ্যুৎ ও রুফটপ সোলারে চীনের সহায়তা প্রত্যাশা : ড. ইউনূস বলেন, বিশ্বে বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক দেশ হিসেবে চীন বাংলাদেশের সবুজ জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, রুফটপ সোলার প্যানেল, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে চীনা বিনিয়োগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বন্ধ পাটকল পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব : প্রধান উপদেষ্টা বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পুনরায় চালুর প্রস্তাব দেন। ‘এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটিকে শুধু পরিকল্পনায় নয়, বাস্তবে রূপ দিতে চাই,’ বলেন ড. ইউনূস।
এআই ও ই-কমার্স খাতে নতুন আগ্রহ : ইয়াং ডংনিং আেেরা জানান, চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) এবং ই-কমার্স খাতেও বিনিয়োগ সম্ভাবনা যাচাই করছে, যেখানে চীন ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে শিল্প স্থানান্তরের প্রস্তাব : প্রধান উপদেষ্টা চীনা বিনিয়োগকারীদের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ অঞ্চল সমুদ্র সংযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে চীনসহ উন্নত দেশগুলোতে পণ্য রফতানি সহজ হবে।
চীনের সাথে রেল সংযোগের প্রস্তাব : ড. ইউনূস আরো প্রস্তাব দেন, বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগ গড়ে তোলা হলে, নতুন শিল্প অঞ্চলগুলো থেকে পণ্য পরিবহন ও রফতানি আরো সহজ হবে। এটি আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বৈঠকের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা হংকংয়ের একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেন।
বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সচিব ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।


