পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : অবিরাম বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় এবার হাওরাঞ্চলের মানুষের ঈদের আনন্দ মাটি হয়েছে। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে গেলবারের মতো ভয়াল বন্যার আশঙ্কা। সোমবার (১৭ জুন) ঈদের দিন ভোরেই সুরমা নদীর পানি উপচে সুনামগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার মধ্যেই মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করতে পারলেও অনেকেই যথাসময়ে পশু কোরবানি করতে পারেননি। বৃষ্টি থামার পর দুপুর থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করে। মঙ্গলবারও (১৮ জুন) সারাদিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। তবে এতে সাময়িক সময়ের জন্য মানুষের মনে স্বস্তি ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস তাদের জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনতে পারছে না। পূর্বাভাসে বলা আগামী কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কার কথা শুনে ২০২২ সালের ভয়াল বন্যার পুনরাবৃত্তির আতঙ্ক নিয়ে নির্ঘুম রাত পার করেছেন সুনামগঞ্জের মানুষ।
আবহাওয়া পূর্বাভাসের বিভিন্ন মডেল বলছে, আজ বুধবার (১৯ জুন) ভোরেই আবারও শুরু হচ্ছে ভারী বৃষ্টিপাত। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায়ও বৃষ্টিপাত হবে। এতে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২২ সালের ১৭ জুন ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে গিয়েছিল সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বেশিরভাগ এলাকা। গভীর রাতে চোখের পলকেই তলিয়ে যায় পুরো শহর। একতলা বাড়ির বাসিন্দারা সাঁতরে বেরিয়ে উঁচু ঘরবাড়িতে আশ্রয় নেন। যারা নিচু ঘরে ছিলেন, তারা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে বানের পানি, বিষাক্ত পোকামাকড় ও সাপের কামড়ের ভয় নিয়ে বিভীষিকাময় সময় পার করেছেন। ভেসে চলে যায় বহু গবাদিপশু। এখনো সেই দুঃস্মৃতি তাড়া করে সুনামগঞ্জের মানুষকে, বৃষ্টি হলেই বড় বন্যার ভয়ে তারা শিউরে ওঠেন।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) সকাল থেকে সুনামগঞ্জে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। দুপুরের পর বৃষ্টি থেমে যায়। এসময় সুরমা নদীর পানির উচ্চতা কিছুটা কমে এলেও শহরের ভেতরের অন্য অনেক এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করে। নিচু এলাকাগুলোর বাসাবাড়ির ভেতর আগেই পানি প্রবেশ করেছে। তুলনামূলক উঁচু কয়েকটি এলাকাতেও সন্ধ্যার দিকে পানি উঠতে শুরু করে বলে জানা যায়। এছাড়া জেলা সদরের আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সংযোগ সড়কও তলিয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারী লাইব্রেরিয়ান শাহ ওমর ফারুক বলেন, বন্যা ধীরে ধীরে ভয়াবহ হচ্ছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে সারারাত জেগে ছিলাম। প্রতি ১০ মিনিট পর পর পানির উচ্চতা মেপে দেখেছি।
হাসন নগরের বাসিন্দা সাদিকুল আলম জানান, পৌর শহরের নবীননগর, নতুনপাড়া, হাসন নগর, শহীদ আবুল হোসেন রোড, উত্তর আরপিননগর, তেঘরিয়া, কাজির পয়েন্ট, ষোলঘর, সবজি বাজার, শান্তিবাগ, বাঁধনপাড়াসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় হাঁটু সমান পানি। মানুষের ঘর ছাড়াও দোকানপাটের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জালালাবাদ ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. শাহরিয়ার জানান, ঈদের দিন রাতেও যেখানে জুতো-পায়ে হাঁটতে পেরেছি, সকালে উঠে দেখি সেখানে হাঁটুসমান পানি। যেভাবে পানি বেড়ে চলেছে, তাতে বড় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা আনোয়ার হোসাইন জানান, সন্ধ্যার পর থেকে আলীপাড়ায় পানির উচ্চতা প্রায় এক ফুট বেড়েছে। বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু আবার বৃষ্টি শুরুর হওয়ার পর থেকে আতঙ্কে আছি।
সাংবাদিক শামসুল কাদির মিসবাহ বলেন, রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমার ঘরে পানি ঢুকেছে। বৃষ্টি ছাড়াই ধীরগতিতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর পানি কমলেও কোথাও কোথাও সেই পানি হাওর হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে।

এদিকে আগামী কয়েকদিন ভারী বর্ষণ হওয়ার ব্যাপারে মঙ্গলবার (১৮ জুন) সকালেই সতর্কতা দিয়েছিল বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটির আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক সতর্কবাণীতে বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানায়, বুধবার (১৯ জুন) থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টার পর থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মেঘালয় পর্বতের পূর্ব-খাসি হিল পর্বত এলাকায় ৭৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে চেরাপুঞ্জিতে ৪৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, আজ বুধবার ভোর ৪টার পর থেকে দুপুর ২টার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় চেরাপুঞ্জিতে ৬০০ থেকে ১০০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে সুনামগঞ্জ জেলার কোনো কোনো স্থানে নদীর পানি সাময়িকভাবে কমলেও বুধবার সকাল থেকে তা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসের বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, আজ ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খুবই ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এমনটা ঘটলে সুনামগঞ্জ জেলার যেসব এলাকা এখনো প্লাবিত হওয়া বাকি আছে, সেসব এলাকাও প্লাবিত হবে। ভারি বৃষ্টি আগামী পাঁচদিন অব্যাহত থাকার প্রবল আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, অর্থাৎ ২৩ জুন পর্যন্ত সিলেট বিভাগের সকল নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তিনি আরও জানান, চলতি জুন মাসে সিলেট জেলায় বৃষ্টিপাতের সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ হতে চলেছে। সিলেটে জুন মাসে গড়ে বৃষ্টিপাত হয় ৮৪১ মিলিমিটার। অথচ এবছর এই মাসের প্রথম ১৭ দিনেই বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৫৪৬ মিলিমিটার। এটি গড় অপেক্ষা ৮৪ শতাংশ বেশি। বাকিদিনগুলোতে মোট সংখ্যাটি আরও বড় হবে। এর আগে ২০২২ সালে চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিপাত ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ১২২ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল।
আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ ইত্তেফাক ডিজিটালকে আরও বলেন, ২০২২ সালের বন্যায় যেসব এলাকার মানুষ চরম বিপদে ছিলেন, তাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া উচিত। মেঘালয় পর্বত এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। সেক্ষেত্রে ২০২২ সালের মতোই বড় আকারের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলা যাচ্ছে। তবে গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ ফ্লাড প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের কোর্ডিনেটর রবিন আহমেদ ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার অনেকেই বড় বন্যা মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। পানি রাতারাতি বাড়েনি, প্রস্তুতির কিছুটা সময় পাওয়া গেছে। আমরাও ফেসবুক ও হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে সতর্কতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছি। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের উঁচু বাসাবাড়িতে রাখার উদ্যোগ নিয়েছি। বন্যায় সুপেয় পানির সংকট হতে পারে, সেজন্য বৃষ্টির পানির সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কথাও বলছি। বড় দুর্যোগ হোক বা না হোক, প্রস্তুতি রাখলে তো ক্ষতি নেই। সামাজিক সংগঠন সোশ্যাল চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক নাসিম চৌধুরী জানান, তারা কোরবানির মাংস ও ভাত রান্না করে বন্যার্তদের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছেন। আরও অনেকেই বন্যার্তদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবিলায় সুনামগঞ্জ জেলায় ৫১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর ও জগন্নাথপুরে ৫ টন করে জি.আর চাল দেয়া হয়েছে। ৬০০ টন জি.আর চাল মজুদ রয়েছে। শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও গো-খাদ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায় এ পর্যন্ত নগদ ১০ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, প্রতিবছর সুনামগঞ্জ বন্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। ২০২২ সালের বন্যার পর থেকেই সবাই আতঙ্কে থাকেন। এই জনপদকে নিরাপদ করতে যা যা করা দরকার, তার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর সবাইকে নিয়ে বসে সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে গবেষণা করে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিবছর এইধরনের বন্যা পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য শর্ট-টার্ম, মিডটার্ম ও লংটার্ম প্ল্যানিং করতে হবে।
তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার, ওষুধপত্র বা স্যালাইন পৌঁছানো ব্যবস্থা করা হয়েছে। রান্না করা খাবারও বিতরণ করা হবে। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি, তাদের নৌকা বা বিভিন্ন পরিবহন দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসক, সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। ত্রাণ মন্ত্রণালয়েও কথা বলেছি। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সরেজমিনে বন্যার্তদের অবস্থা দেখেছি। বন্যায় যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়ানো না হয়, সেজন্য মহাজন ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলেছি। তাদের অনুরোধ করে বলেছি, দুঃসময়ে-দুর্যোগে মানবকল্যাণই বড়। তারা যেন নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করেন।
এছাড়া স্থানীয়দের উদ্দেশে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন, সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পানি আরও বাড়তে পারে। আতঙ্কিত হবেন না, সতর্ক হোন। নিরাপদ স্থানে থাকার চেষ্টা করুন। এই দুর্যোগের সময়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়ান। সবাই মিলেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। আমরা সম্মিলিতভাবে ২০২২ সালের সেই ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করেছি। এবারও সবাই মিলে সেই চেষ্টাই করব, ইনশাআল্লাহ।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক


