পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে দফতর বণ্টন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো: মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানানো হয়। এছাড়া গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে সব মন্ত্রণালয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে কিভাবে শিক্ষার্থীদের এই কাজে সম্পৃক্ত করা হবে, সেই কাঠামো কী হবে, সেটি পরে ঠিক করা হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘সহকারী উপদেষ্টা’ বা এ রকম কোনো পদায়ন করে তাদেরকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তদারকির সুযোগ করে দেয়া হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সব মন্ত্রণালয়ে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সাথে কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্দোলনকারী ছাত্র প্রতিনিধিরা সম্পৃক্ত থাকবেন। এখন কিভাবে তারা সম্পৃক্ত থাকবেন, কাঠামো কী হবে, সেটা পরবর্তী সময়ে চিন্তা করা হবে।
মন্ত্রণালয়গুলোতে কিভাবে ছাত্ররা সম্পৃক্ত থাকবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে একটি সিদ্ধান্ত আগেও ছিল; সেটি হলো ‘সহকারী উপদেষ্টা’ বা এ রকমভাবে কোনো পদায়ন করে মন্ত্রণালয়ে ছাত্রদের তদারকির সুযোগ থাকা; সেই ব্যবস্থাটি থাকবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রসমাজ আমাদের দেশের একটি বড় শক্তি। নতুন সরকারের সাথে আমরা তাদেরও কাজের সুযোগ দিতে চাই। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের যে অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ছিল, বড় বড় দলগুলো কিন্তু সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে জায়গায় ছাত্রসমাজের মাধ্যমেই একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। এই ছাত্রদের ওপর আস্থা রেখেই জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। এখন আমাদের ছাত্রসমাজই যেহেতু সরকার এবং রাষ্ট্রের সংস্কার নিয়ে কথা বলছে, আমি আশা করব আমাদের সাধারণ জনগণও এই ছাত্রসমাজের ওপর আস্থা রাখবে। তিনি বলেন, আমাদের উপদেষ্টা প্যানেলে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ ব্যক্তিদের মনোনীত করেছি এবং ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমরা দু’জন উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছি। এর পাশাপাশি উপদেষ্টাদের সাথে সহকারী হিসেবে ছাত্ররা কাজ করার সুযোগ পাবে। বর্তমান সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যেহেতু আমরা আজই দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি, আমরা আজ থেকেই কাজ শুরু করব। আশা করছি দুয়েক দিনের মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমরা এখন থেকেই পুরোদমে কাজ শুরু করে দেবো।
দফতর বণ্টন : প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব পালন করবেন। এগুলো হলো- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়; সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ; শিক্ষা মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; খাদ্য মন্ত্রণালয়; গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়; ভূমি মন্ত্রণালয়; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়; কৃষি মন্ত্রণালয়; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; রেলপথ মন্ত্রণালয়; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়; পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়; মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়; তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়; মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়; পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে সালেহ উদ্দিন আহমেদ অর্থ মন্ত্রণালয়; পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়; ড. আসিফ নজরুল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়; আদিলুর রহমান খান শিল্প মন্ত্রণালয়; হাসান আরিফ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; মো: তৌহিদ হোসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; শারমীন এস মুরশিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ধর্ম মন্ত্রণালয়; ফরিদা আখতার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; নুরজাহান বেগম স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; মো: নাহিদ ইসলাম ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রধান উপদেষ্টাসহ ১৩ উপদেষ্টার বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ১৩ জন উপদেষ্টা শুক্রবার সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। প্রথমে ড. ইউনূস সকাল ১০টার দিকে ভারী বৃষ্টির মধ্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাগণ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে, অন্যান্য উপদেষ্টাদের সাথে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা আরো একটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তিনি দর্শনার্থী বইয়েও স্বাক্ষর করেন। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা হেলিকপ্টারযোগে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসে পৌঁছালে তিন বাহিনীর প্রধানগণ তাকে অভ্যর্থনা জানান। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করেন।
সরকারের মেয়াদ নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয় : বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে তা নিয়ে এখনই আলোচনা করা বা সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। কারণ আপনি কী সংস্কার চান সেটা না বোঝে মেয়াদের কথা বলতে পারব না। আর আপনারা যদি সংস্কার না চান, তখন আরেক কথা। কাজেই এখনই মেয়াদ-মেয়াদ করে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা সবাই যাতে একটি গণতান্ত্রিক দেশের যাত্রা শুরু করতে পারি, তার প্রস্তুতির জন্য এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই প্রস্তুতির জন্য যে সময় দরকার, সেটাই আমরা নেবো। শেষ পর্যন্ত আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাবো। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সিস্টেম পরিবর্তন করার জন্য তারা (শিক্ষার্থীরা) আন্দোলন করেছেন। সুতরাং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে, আজকে আমাদের বেশির ভাগ আলোচনা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে।
সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, ক্ষমতা একটা গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে পড়লে অসুবিধা হয় না। কিন্তু সরকার অগণতান্ত্রিক হলে তখন আইনের অপপ্রয়োগ হয়। তাই সাইবার নিরাপত্তা আইনের যে বিধানগুলো অপপ্রয়োগ করা যাচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বাতিল করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতির বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে এ উপদেষ্টা বলেন, বৈঠকে আইজিপিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তার কাছে কী তথ্য আছে? তাছাড়া পুলিশের অনেকগুলো থানাও সচল নয়। ফলে তার কাছে সব তথ্য থাকবে সেটাও আমরা মনে করি না। তাই আলোচনা হয়েছে যত দ্রুত সম্ভব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে নামানো, বিশেষ করে পুলিশ সদস্যদের।


