আজ মহান বিজয় দিবস

আজ মহান বিজয় দিবস

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আজ ১৬ ডিসেম্বর—মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বিজয়ের ৫৪ বছরে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এবারের বিজয় দিবস হোক জাতীয় জীবনে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে সূচিত নবযাত্রা রক্ষার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভাষা আন্দোলনের অবধারিত পরিণতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে স্বাধিকার চেতনার উন্মেষ, তা একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে আহ্বান জানান।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ অংশগ্রহণ করে। প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের ঘাটতি সত্ত্বেও বাংলার বীর সন্তানেরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।

বিজয়ের ৫৪ বছরে আত্মমূল্যায়ন

বিজয়ের পাঁচ দশক পেরিয়ে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে—এই প্রশ্নে বিশ্লেষকদের অভিমতও উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একাত্তরের যুদ্ধজয়ী জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা এখনো চলমান।

অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শ্রেণি, জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গীয় বৈষম্যবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মানুষের মুক্তির জন্য সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির আধিপত্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ও উদযাপন

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সড়কদ্বীপ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।

ভোরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবার, বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়েছে।

রাজধানীর পাড়ামহল্লা, সড়কের মোড়ে মোড়ে বাজছে মুক্তির গান। ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত ও যানবাহনে উড়ছে লাল-সবুজ পতাকা।

মহান বিজয় দিবস জাতির জন্য তাই শুধু উৎসব নয়—এটি আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ ও ভবিষ্যতের পথচলা নিয়ে নতুন করে ভাববার দিন।

Related Articles