পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : লুটপাটে বিরাণভূমি হওয়ার পর দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরের পাথর ফেরাতে সক্রিয় হয়েছে প্রশাসন। হয়েছে তদন্ত কমিটি, পরিদর্শন করেছে দুদক টিম। লুণ্ঠিত পাথর পুনঃস্থাপন ও রক্ষায় নেয়া হয়েছে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত। এর মধ্যে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সাদাপাথরে গত কয়েক বছরে আনুমানিক ৪ কোটি ঘনফুট পাথর লুটপাট করা হয়েছে। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর নজিরবিহীন পাথরশূন্য হওয়ার ঘটনায় গত কয়েক দিন দেশজুড়ে তোলপাড়ের পর বুধবার রাত থেকে অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে লুট হওয়া আনুমানিক ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করে সেগুলো সাদাপাথরে এনে ফেলা হচ্ছে। বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ওই সব পাথর উদ্ধার হয়েছে। এ সময় ভোলাগঞ্জ, জাফলংয়ে ১৭০টি ট্রাকে তল্লাশি করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের সূত্র জানিয়েছে। তবে অবাধ লুটপাটের পর প্রশাসনের এমন তৎপরতায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। অনেকের মন্তব্য, রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার এসেছে।
বুধবার রাত সোয়া ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর গভীর রাত থেকেই অভিযানে নামে যৌথবাহিনী। সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধার করে আগের অবস্থানে নেয়া, পাথর চুরি-লুটের সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে যৌথবাহিনীর সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের আলোকে রাতেই অভিযানে নামে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। ভোলাগঞ্জের বিভিন্ন পাথর ভাঙার মেশিনে এবং সড়ক ও বাসাবাড়ির আশেপাশে মজুদ রাখা পাথর উদ্ধার করে তারা সাদাপাথরে এনে ফেলে দেন। এভাবে সাদা পাথরের খালি জায়গা আবার আগের মতো পূরণ করা হচ্ছে। গতকাল দুপুরে এ রিপোর্ট লেখার সময়ও কাজ চলছিল বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার গভীর রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এ সময় শত শত পাথর বোঝাই গাড়ি সড়কে আটকা পড়ে। এ ছাড়া যৌথবাহিনী জাফলং ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে সব ধরনের পাথরবোঝাই ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ গতকাল দুপুরে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন পাথর লুটপাট ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এরপরও পাথর লুটপাট হয়েছে। এরই কারণে বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। দ্রুতই এর ফল দেখা যাবে। যেকোনো মূল্যে পাথরখেকো চক্রের অপতৎপরতা ঠেকানো হবে ইনশা আল্লাহ।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে সিলেটের ছয়টি কোয়ারি থেকেই পাথর লুটপাট করা হয় দেদার। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির সাদা পাথর পর্যটন স্পট থেকে লুটপাট শুরু হয় প্রকাশ্যে। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকায় দেশের সর্ববৃহৎ ‘রেলওয়ের সংরক্ষিত বাঙ্কার’ এলাকা থেকে বিপুল পাথর লুটপাট করা হয়। এসবের পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। অন্য দিকে এই লুটপাটে জড়িত নানা স্তরের মানুষ। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার পাথর লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এই লুটপাট চলছে।
কয়েক শ’ কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ হয়েছে বলছে দুদক : এ দিকে বিরানভূমি সাদাপাথরের রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় অবশেষে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার দুপুরে দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক রাফী মোহাম্মদ নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি তদন্ত দল সরেজমিন পরিদর্শন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের রাফী মোহাম্মদ নাজমুস সাদাত বলেন, এটা মূলত স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। প্রশাসনের আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল। তাদের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার ছিল। এ ছাড়া খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোসহ যেসব বিভাগের সাথে যুক্ত তাদের লুট ঠেকাতে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, এখানে কয়েক শ’ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পর্যটকরা সাদাপাথরে এসে হতাশ হচ্ছেন। এত সুন্দর পাথরগুলো লুটে নেয়ায় তারা আফসোস করছেন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে।
কারা এই লুটের সাথে জড়িত এমন প্রশ্নে দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, আশপাশে অনেক স্টোন ক্রাশার মিল। এগুলোতে এখান থেকে পাথর নিয়ে ভাঙা হয়। এ ছাড়া এর সাথে এখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্থানীয় লোকজন, আরো অনেক উচ্চস্তরের ব্যবসায়ীরা জড়িত বলে শুনতে পাচ্ছি। আমরা এসব তথ্য নিয়ে আরো কাজ করব। তিনি আরো বলেন, আজকের পরিদর্শনের প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠাব। তারপর তাদের নির্দেশনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। যারা এই লুটের সাথে যুক্ত তাদের সবাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
হাইকোর্টে রিট : সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর লুটের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। রিটে আবেদন করা হয়েছে যেন ওই ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেয় এবং সেখানে যেন অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মীর এ কে এম নূরুন নবী এ রিট করেন।
এ ছাড়া সিলেটের পর্যটন এলাকা ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর লুটের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তার ব্যাখ্যা চেয়ে একটি রুল জারিরও আবেদন করা হয় রিটে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ টিমের তদারকির তথ্য : সিলেটের সাদা পাথরসহ বাকি ছয়টি কোয়ারিতে গত কয়েক বছর ধরে সীমাহীন লুটপাটের বিষয় তলিয়ে দেখতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একটি টিম সিলেটে কাজ শুরু করেছেন বলে একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা গেছে। এই সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে না জানিয়ে এই টিম কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সাদাপাথর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি পর্যটনকেন্দ্র। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথর মহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় পাথর। ঢলের তোড়ে সেখানে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে একবার পাথর জমা হয়েছিল। সেসব পাথরকে ‘ধলাসোনা’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২৭ বছরের মাথায় ফের পাথর জমা হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পাহারায় সংরক্ষিত হয়।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু হয় আদালতের নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ থাকা পাথররাজ্যে লুটপাট। শাহ ভোলাগঞ্জের আরেফিন টিলা, রোপওয়ে বাংকার থেকে প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন করে এখন ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
সর্বাত্মক অভিযান, পাথর উদ্ধার : লুট হওয়া সাদা পাথর উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে বুধবার রাতেই প্রায় ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত পাথরগুলো রাতেই পুনরায় নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাদাপাথর এলাকা থেকে চুরি হওয়া পাথর উদ্ধারে জেলা প্রশাসনের অভিযান জোরদার হয়েছে। এ ছাড়া কলাবাড়ি এলাকায় পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু যন্ত্রের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে চুরি হওয়া পাথর ফেরত না আসা পর্যন্ত অভিযান চলমান থাকবে। চুরির সাথে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সাদাপাথর থেকে চুরি হওয়া পাথর উদ্ধারে আমরা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে অভিযান ও চেক পোস্ট পরিচালনা করছি। এসএমপির আওতাধীন এলাকায় অবস্থানরত অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর আগে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের বল্লাঘাট, ঝুমপাহাড় ও জিরো পয়েন্ট এলাকায়ও বুধবার বেলা ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন ঠেকাতে অভিযান চালানো হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান আটক : কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডিবি পুলিশের অভিযানে ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনকে আটক করা হয়েছে। তিনি পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। বৃহস্পতিবার ভোর রাতে তার বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। জানা গেছে, আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বালু পাথর চুরির একটি মামলার ওয়ারেন্ট থাকায় তাকে আটক করেছে ডিবি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর সাদাপাথর লুটপাটের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। সে সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তার নৌকা আটক করে তাকে সতর্ক করে ছিলেন এর পর থেকে তখন আর তিনি কোনো নৌকা সাদাপাথরে পাঠাননি বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন।


