পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজার জনগণকে পুনর্বাসনের প্রস্তাব সাময়িক। গাজা দখল নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এ কথা বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, গাজা পুনর্নির্মাণের সময় সেখানকার বাসিন্দাদের অন্য কোথাও থাকতে হবে। গত বুধবার গুয়াতেমালা সফরকালীন সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব শত্রুতাপূর্ণ নয়। বরং এটি একটি ‘উদার পদক্ষেপ’, যা ওই এলাকার পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ প্রকাশ করে।
তিনি বলেন, গাজাবাসীদের সাময়িকভাবে অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং পুনর্নির্মাণের কাজ করা যেতে পারে। বুধবার হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট ট্রাম্পের মন্তব্য আরো স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গাজা ভূখণ্ডে ‘সেনা মোতায়েনের’ কোনো পরিকল্পনা করছে না। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, গাজার পুনর্গঠনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই প্রক্রিয়ায় বাসিন্দাদের সাময়িকভাবে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
লেভিট আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট গাজায় সেনা মোতায়েন করার প্রতিশ্রুতি দেননি, তবে সেখানে মার্কিন সেনা রাখার সম্ভাবনা উড়িয়েও দেননি। তার এই মন্তব্য ট্রাম্পের ওই প্রস্তাবের পর এসেছে, যেখানে তিনি গাজা উপত্যকাকে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার এবং এটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’-তে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনার কথা বলেন। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন যে এই স্থানচ্যুতি স্থায়ী হবে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে জনগণকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এর আগে গাজার দখল নেয়া বিষয়ে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন, তা ব্যাপক নিন্দা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র পুনর্বাসনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ ও এটির মালিকানা নেবে। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের’ চেয়ে ভালো কিছু ফিলিস্তিনিদের প্রাপ্য। তবে এমন পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং আরব নেতারা। গাজায় জাতিগত নির্মূল এড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতিবেশী কোনো দেশে পুনর্বাসিত করার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিটমহলটি যুক্তরাষ্ট্র দখলে নেবে, ট্রাম্প এমন প্রস্তাব করার পর জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব এমন পরামর্শ দেন।
বুধবার জাতিসঙ্ঘের এক কমিটির পূর্বনির্ধারিত এক বৈঠকে গুতেরেস বলেন, ‘সমাধানের সন্ধান করতে গিয়ে সমস্যাকে আরো খারাপ করে তুলতে পারি না আমরা। যেকোনো ধরনের জাতিগত নির্মূল এড়ানো অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, ‘(ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে) দ্বিরাষ্ট্রীক সমাধান আমাদের পুনঃনিশ্চিত করতে হবে।’ দুজারিক জানান, ওই বৈঠকের আগে গুতেরেস জর্দানের বাদশা আবদুল্লাহর সাথে গাজা ও সংলগ্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নিয়োগকৃত ফিলিস্তিনি দূত রিয়াদ মনসুর কমিটির বৈঠকে জানান, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরের সময় আবদুল্লাহ আরব রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত বার্তা ট্রাম্পের কাছে পৌঁছে দেবেন। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হিসেবে জাতিসঙ্ঘ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিরাষ্ট্রীক প্রস্তাবকে সমর্থন করে আসছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিরা স্বীকৃত ও নিরাপদ সীমানার মধ্যে পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রে বসবাস করবে।
ট্রাম্পকে উন্মাদ আখ্যা ফিলিস্তিনিদের
আলজাজিরা জানায়, ট্রাম্পের গাজা ‘দখলের’ পরিকল্পনা প্রকাশের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, ট্রাম্পের এই থ‘উল্লেখযোগ্য’ পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তবে গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা বলছেন, যাই হোক না কেন, আমরা গাজা ছেড়ে যাবো না। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গাজা উপত্যকার খান ইউনুসের আল-কাতিবা মহল্লায় ধ্বংসস্তূপে ঘুরে বেড়াতে থাকা ৭২ বছর বয়সী ফাতি আবু আল-সাঈদ বলেন, ‘এটি পাগলের প্রলাপ। আমরা আরবরা যেমনটা বলি, যদি বক্তা পাগল হয়, তবে শ্রোতাকে বুদ্ধিমান হতে দিন। লোকটি (ট্রাম্প) স্বদেশ, সংগ্রাম, বিদ্রোহ, গৌরব কিংবা ফিলিস্তিন সম্পর্কে কিছুই জানেন না।’ ট্রাম্পের মন্তব্যকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে সাঈদ মাথা নাড়েন। অবিশ্বাসের হাসি হেসে বলেন, ‘এটা যেকোনো বিশ্বনেতার করা সবচেয়ে সেরা কল্পনা। ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে জানেন এমন যেকোনো বিবেকবান মানুষ বোঝেন, মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়া আমাদের কাছে মৃত্যর সমান। ট্রাম্প কি সত্যিই ভেবেছেন যে আমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যাবো?’
ইসরাইলের পরিকল্পনা : এ দিকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায়’ গাজা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ গতকাল বৃহস্পতিবার এই নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জেরুসালেম পোস্ট। কাটজ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) এমন একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা গাজার বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় গাজা উপত্যকা ত্যাগের সুযোগ দেবে। ইসরাইল কাতজ বলেন, ‘এই পরিকল্পনার আওতায় স্থল সীমান্ত দিয়ে বের হওয়ার বিকল্পসহ সমুদ্র ও আকাশপথে বিশেষ ব্যবস্থায় গাজাবাসীদের বের হওয়ার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘হামাস গাজার বাসিন্দাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে, মানবিক সহায়তা নিজেদের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছে এবং গাজাবাসীদের বের হতে দেয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘গাজার বাসিন্দাদের মুক্তভাবে বের হওয়ার ও অভিবাসনের সুযোগ পাওয়া উচিত, যেমনটি বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান।’ তিনি আরো বলেন, গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণ করা আইনগতভাবে বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব।
সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি ও জেরুসালেম পোস্ট


