পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারতের নির্বাচনে পাট চুকে গেছে। ৪ জুনের ফলাফলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না পেলেও শরিকদের নিয়ে সরকার গঠনে তোড়জোড় শুরু করেছে বিজেপি। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশটির নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে বিস্ময়কর ইতিহাস রচিত হয়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের জেলার নীলফামারীর ঠিক অপরপাশে, আসামের ধুবড়িতে। এই লোকসভা আসনে ১০ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী রকিবুল হুসেন।
বিস্ময়কর ব্যাপার হল রকিবুল যাকে হারিয়েছেন তিনিও একজন মুসলিম তবে কোনও সাদামাটা প্রার্থী নন, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) এর প্রধান বদরুদ্দিন আজমল। তার দলকে আসামের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আসামের ১৪টি আসনের মধ্যে মাত্র তিনটি জিতেছে কংগ্রেস। এরমধ্যে একটি রকিবুলের ধুবড়ি।
রকিবুল যে ধুবড়িতে এত বড় ব্যবধানে জিতলেন সেটা তার নিজের এলাকা নয়। সেখান থেকে প্রায় তিনশো কিলোমিটার দূরে সামাগুড়ি থেকে তিনি বারবার বিধায়ক হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকেই জিতে আসছেন রকিবুল। ২০১১ সালে প্রফুল্ল মহন্তাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি সেবার আসামের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। ২০১৬ সালে যখন বিজেপির জোয়ার চলছিল তখনও সামাগুরিতে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন তিনি।
রকিবুল হুসেন জয়ী হওয়ার কিছুক্ষণ পরে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাকে ‘হিরো অব দ্যা ডে’ (দিনের নায়ক) বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, তার আলোচনা সামনে আসা উচিত।
অথচ এই হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে রকিবুলের সম্পর্ক খুবই উত্তেজনাকর! এমনকি নির্বাচনের আগে হিমন্তের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন রকিবুল।
৪ জুনের ফলাফল শুধু ধুবড়িতে নির্বাচনী ইতিহাসই রচনা করেনি, রাকিবুলের মেধার প্রমাণ যেমন হয়েছে তেমনি যারা তার প্রার্থিতা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন তাদেরও চুপ করিয়ে দিয়েছে।
ভূমিধস বিজয়ের পর স্ত্রী এবং ছেলেকে নিয়ে নির্বাচনী কার্যালয় থেকে শংসাপত্র গ্রহণ করতে যান রকিবুল। যে কাগজটি হয়তো শোভা পাবে তার ড্রয়িং রুম কিংবা রিডিং রুমের দেয়ালে। যাতে রকিবুলের নামের পাশে ভোটের সংখ্যাটি ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৫। যেখন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজমলের নামে পাশে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪০৯ ভোট। বিজয়ের ব্যবধান বিস্ময়কর, ১০ লাখ ১২ হাজার ৪৭৬ ভোট।
এর পরেও কাগজে কলমে রকিবুল এবারের লোকসভা নির্বাচনের সর্বোচ্চ ব্যবধানে বিজয়ী নন। এক্ষেত্রে তার উপরে আছেন ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২ ভোটে বিজয়ী ইন্দোরের বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর লালওয়ানি। যদিও তার প্রাপ্ত ভোট রকিবুলের চেয়ে অনেক কম, ১২ লাখ ২৬ হাজার ৭৫১। ভোটের আগেই এই আসনে নাটকীয়তা নিয়ে ভারতজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ভোটের আগ মুহূর্তে কংগ্রেসের প্রার্থী অক্ষয় কান্তি বাম রহস্যজনকভাবে তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন এবং বিজেপিতে যোগ দেন। নির্বাচনের ফলাফলেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ইন্দোরে ২ লাখ ১৮ হাজার ভোট পড়ে। ‘নোটা’র বা ‘নান অব দ্য অ্যাবাভ’ (ওপরের প্রার্থীদের মধ্যে কেউই নন!) ভারতের নির্বাচনী পদ্ধতির একটি বিশেষ ব্যবস্থা। নির্বাচনে কোনও প্রার্থীকেই যদি পছন্দ না হয় তাহলে ভোটাররা তা ব্যালট পেপার বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে জানাতে পারেন।
ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী ভারতীয় সাংবাদিক রাভিশ কুমারের মতে, সবকিছু বিবেচনা করলে রকিবুল হুসেনকেই এগিয়ে রাখতে হবে। রকিবুলের এমন বিজয়কে আসামের রাজনীতিতে নতুন নেতা উঠে আসার বার্তা হিসেবে মনে করেন তিনি।
এই নির্বাচন, যেটাকে মোদির নির্বাচন বলা হচ্ছিল সেখানে কংগ্রেসের একজন প্রার্থী ১০ লাখ ভোটে জিতলেন, তাও একজন মুসলিম প্রার্থী, যখন সব রাজনৈতিক দল মুসলমানদের মনোনয়োন দিতে ভয় পায়! রাকিবুল হুসেনের জয় বিশেষ মাহাত্ম্য রাখে। তার মতো নেতার রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আসা উচিত এবং ন্যায়ের নেতৃত্ব তৈরি করা উচিত।
জানা যায়, রাকিবুল হোসেনের জন্ম ৭ আগস্ট ১৯৬৪। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি সামাগুড়ি থেকে বিধায়ক এবং ২০২১ সাল থেকে আসাম বিধানসভায় বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবার ধুবড়ি থেকে ইতিহাস গড়া জয় পেয়ে লোকসভায় যাবার অপেক্ষায় আছেন।
তার বাবা আলহাজ নুরুল হোসেনও বিধায়ক ছিলেন। রকিবুল ২০০১ সাল থেকে আসাম বিধানসভার সামাগুড়ি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন। ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তরুণ গগৈ সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিত্বও করেছেন। আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কংগ্রেস সরকারেও মন্ত্রীত্ব করেছেন। হেমন্তর মতো তুখোড় নেতাও একবার নির্বাচনে হেরেছেন কিন্তু রকিবুল কখনও হারেননি।
সূত্র: এনডিটিভি


