পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আজকের দিনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময়ের বিরতির পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টা চলবে ব্যালটের এই যুদ্ধ। ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে গণনা শুরু করবে এবং নবাব নওয়াব আলী সিনেট অডিটোরিয়ামে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
এই নির্বাচন কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই নয়, দেশের জাতীয় রাজনীতির জন্যও দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ডাকসু থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকেও প্রভাবিত করে।
এ বছর ডাকসুর ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৭০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে নারী প্রার্থী আছেন ৬২ জন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৪৪ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯ জন, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ৬২ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ভিপি পদে পাঁচজন, জিএস পদে একজন, এজিএস পদে চারজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
১৮টি হলের প্রতি হল সংসদে ১৩টি করে মোট ২৩৪টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক হাজার ১০৮ জন। নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৮৭৩ জন এবং ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯০২ জন। আটটি কেন্দ্রের ৮১০টি বুথে প্রত্যেক ভোটারকে ডাকসু ও হল সংসদের মোট ৪১টি পদে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। প্রার্থীর নামের পাশের বর্গাকৃতির ঘরে ক্রস চিহ্ন আকার মাধ্যমে ভোট দিবেন ভোটাররা। আটটি কেন্দ্রের ৮১০টি বুথে চলবে ভোটগ্রহণ। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঢাবি প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চৌকি। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, মোবাইল পেট্রোল, ডগ স্কোয়াড, বিশেষায়িত টিম, বোম এক্সপোজাল ইউনিট, সোয়াত টিম, ডিবি (সাদা পোশাকে), সিসিটিভি মনিটরিং সেল, স্ট্রাইকিং রিজার্ভ নিয়োজিত রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে বেশ চাপে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো প্রকার অঘটন সামাল দিয়ে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা, ভোট গণনা স্বচ্ছ করা, ফলাফল ঘোষণার পর কোনো প্রকার অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সৃষ্টি হলে তা সামাল দেয়া ও সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান প্রশাসনের জন্য যেন অগ্নিপরীক্ষা। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘন, সাইবার বুলিংসহ নানান অভিযোগ সামাল দিয়ে এ পর্যন্ত আসাটা কমিশনের বড় সার্থকতা।
এ দিকে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এই নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গুজব একটি সামাজিক ব্যাধি। কোনো ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু চার দিকে গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাবে ভোট গণনা-ফলাফল : ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা করা হবে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে। প্রত্যেক কেন্দ্রের বাইরে এলইডি স্ক্রিনে ফলাফল গণনা প্রদর্শিত হবে। প্রত্যেক কেন্দ্রের ফলাফল সেখানেই ঘোষণা করা হবে, পাশাপাশি স্ক্রিনেও দেখা যাবে। সবশেষে সিনেট ভবন মিলনায়তনে সব কেন্দ্রের মোট ফলাফল ঘোষিত হবে। তবে এর আগেই সব কেন্দ্রের ফলাফল যোগ করে যে কেউ মোট ফলাফল বের করতে পারবেন।
নির্বাচনে প্রতি ভোটারের জন্য একটি করে ছয় পৃষ্ঠার ওএমআর ফর্ম ব্যবহার হবে। এর মধ্যে পাঁচ পৃষ্ঠা কেন্দ্রীয় সংসদ এবং এক পৃষ্ঠা হল সংসদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এতে প্রার্থীদের নাম, ব্যালট নম্বর, পদবির নাম এবং ভোট দেয়ার জন্য নির্ধারিত ঘর থাকবে। ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা হবে ১৪টি অত্যাধুনিক স্ক্যানিং মেশিনে।
ভোটারদের সুবিধার্থে চলবে চক্রাকার শাটল : শিক্ষার্থীরা যেন আজ নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে পৌঁছতে পারেন, সেই লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে বিশেষ চক্রাকার শাটল সার্ভিস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভোটারদের সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করতে আজ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত শাটল সার্ভিস চলবে।
ডাকসু নিয়ে সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে : ঢাবি ভিসি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। সোমবার বিকেলে ডাকসু নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ১১ মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতি, হাজারো শিক্ষার্থীর আকাক্সক্ষা আর নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। ডাকসুকে ঘিরে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রক্টরিয়াল টিম, বিএনসিসি, ভলান্টিয়ার টিমসহ সবাই মাঠে রয়েছে। তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
প্রার্থীদের উদ্দেশ্য করে ভিসি বলেন, আপনারা একে-অপরের প্রতি সহনশীল হোন। হার-জিত যাই হোক, আমাদের মধ্যে এমন কিছু নেই যাতে বড় কোনো সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয়। যদি তবুও কেউ আইন ভঙ্গ করে তবে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জাল ডিএমপির : ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে ও ক্যাম্পাসের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তারই লক্ষ্যে আগামীকাল ২০৯৬ জন পুলিশ, ডগ স্কোয়াড, সোয়াত টিম, বিশেষায়িত টিম, সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাদ আলী। তিনি বলেন, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন থেকে ইউনিফর্মধারী ১,৭৭১ জন নিয়োজিত আছেন, আগামীকাল তা বেড়ে হবে ২০৯৬ জন। এর বাইরে সাদা পোশাকে ডিবি, র্যাব ও বিজিবির সদস্যরা থাকবেন। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাদ আলী বলেন, আজ (সোমবার) রাত ৮টা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত লাইসেন্সধারী ব্যক্তিরাও অস্ত্র বহন করতে পারবেন না। আমি আমার ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করলাম।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা নেই : চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা
ডাকসু নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন ডাকসু প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। সোমবার বিকেলে ডাকসু নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। কোনো ধরনের শঙ্কা আমরা দেখছি না। ভোটগ্রহণ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে। যদি ৪টার সময় ও কেউ ভোটকেন্দ্রের সামনে অবস্থান করে তাদের ও সুযোগ দেয়া হবে। এবারের নির্বাচন হবে একটি মডেল নির্বাচন, যা বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করতে পারে এমন দৃষ্টান্ত ঢাবি শিক্ষার্থীরা সৃষ্টি করবে।’
শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থী সবাই যেন ভোট দিতে আসে তাদের প্রতি সেই অনুরোধ থাকবে। আমরা আটটি কেন্দ্রে ৮১০টি বুথ স্থাপন করেছি। আমরা অংশীজনের সহযোগিতা চাই। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে আমরা সব অংশীজনের সহায়তা চাই।’
সাইবার বুলিংয়ের জবাব ব্যালটের মাধ্যমে দিতে হবে : আবিদুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেছেন, যারা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে না পেরে সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে চায়, তাদের ব্যালটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতিহত করবে। গতকাল দুপুরে মধুর ক্যান্টিনের সামনে সাইবার অ্যাটাক নিয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা ৫ আগস্টের পরে সুস্থ রাজনীতি চর্চা করতে গিয়ে অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি। আমাদের পথচলা ক’দিনের না। ২০১৬ সাল থেকে আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এখানে এসেছি। দেশের স্বাধীনতা ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্নে কখনো আপস করিনি, অন্যায় মেনে নেইনি। ৫ আগস্টের পর একই নোংরামির শিকার হতে হবে এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
আবিদ আরো বলেন, আমরা কখনো পেছন থেকে আঘাত করার চেষ্টা করিনি। যোগ্যতার বিরুদ্ধে যোগ্যতা, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুস্থ রাজনীতি করে এসেছি। এখন একদল রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে একটি গোষ্ঠী সাইবার অ্যাটাকের পথ বেছে নিয়েছে। মিথ্যার শক্তিতে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। সত্যের জয় সুনিশ্চিত। আগামীকাল ঝড়, বৃষ্টি বা প্রতিকূল পরিস্থিতি হোক না কেন আপনারা ভোটকেন্দ্র আসবেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সমীকরণ : এবারের নির্বাচনে মোট ২৮টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৭১ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ৪৫, জিএস পদে ১৯ এবং এজিএস পদে ২৮ জন লড়ছেন। সবশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ডাকসু নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ৩৯ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ডাকসু নির্বাচন শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এবারের নির্বাচন ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হলেও তাদের সমর্থক শামীম নামের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভিপি পদে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া বামপন্থী শিক্ষার্থী সংগঠন, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, ছাত্রঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয়।
আলোচিত প্রার্থীরা : ভিপি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত আবু সাদিক কায়েম, ছাত্রদল সমর্থিত আবিদুল ইসলাম খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আবদুল কাদের এবং ছাত্র অধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লা আলোচনায় আছেন। জিএস পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদল সমর্থিত শেখ তানভীর বারী হামিম, শিবির সমর্থিত এস এম ফরহাদ, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আবু বাকের মজুমদার ও সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদের ফাতেহা শারমিন এ্যানি।


