রাজধানী ঢাকার আফতাব নগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসা মসজিদে পাঁচ দিন (১-৫ রমজান) নফল ই’তিকাফে বসেছেন জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার, মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
রোববার (২ মার্চ) ১ম রমজানে তারাবিহ নামাজের পর নফল ইতিকাফরত আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসল্লিদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করেন তিনি। পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য বয়ানের সারাংশের বঙ্গনুবাদ তুলে ধরা হলো–
হযরত বলেন–
আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহে আমরা পবিত্র মাহে রমজান পেয়েছি। আল্লাহ তাআলা, যিনি সকল কিছুর স্রষ্টা ও বিন্যস্তকারী। যিনি আমাদের মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আর এমন মানুষ বানিয়েছেন যারা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনিই দুনিয়াকে সাজিয়েছেন। সকল ক্ষমতার অধিপতি তিনি। আমাদের সম্মান-অসম্মান, পাপ-পুন্য, ভালো-মন্দ—সবকিছুই তাঁর ইচ্ছায় হয়।
দুনিয়াতে কিছু লোক আছে যারা আমার এই কথা মানবে না। কিন্তু সেই পবিত্র সত্ত্বা আমাকে বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন, যদিও আমি দুর্বল ও কম বিবেকসম্পন্ন। আমি এগুলো বিশ্বাস করি ও বুঝি। হয়তো কেউ আমাকে বলবে, তুমি প্রমাণ কর যে, সর্বশক্তিমান কেউ আছেন। যিনি সুপার পাওয়ারের অধিকারী। হয়তো আমি শত চেষ্টার পরেও এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হব।
সত্যের স্বীকৃতি সেই পায়, যার মস্তিষ্ক সুস্থ এবং যার অন্তর সঠিক পথে আছে। এটা চিরাচরিত সত্য যে—যে খোঁজে কেবল সেই পায়। যে ঘুমিয়ে আছে, তাকেই জাগানো যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি জেগে আছে, তাকে জাগানো যায় না। ঠিক তেমনিভাবে যে ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সে শুনবে না ও মানবেও না—তাকে কিভাবে বোঝানো যাবে? তাকে বোঝানো সম্ভব নয়।
আবার যার অন্তর সত্য গ্রহণে প্রস্তুত, যত যুক্তিতর্কের আলোকেই প্রমাণ হোক না কেন—সব কিছু একাকী হয়েছে, কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই—সে তা মানবে না। বরং সে বলবে—কোনো কিছু কিভাবে একাকী হয়ে গেল? কিভাবে সব কিছু চালকবিহীন পরিচালিত হচ্ছে? এটা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই কেউ আছেন, যিনি সব কিছু পরিচালনা করছেন।
কেউ একজন আছেন, যিনি সকল ক্ষমতার উৎস। তিনি এত ক্ষমতার মালিক যে, তাঁর কোনো সহযোগীর প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বাস করি, তিনিই সকল ক্ষমতার উৎস। তিনি যদি আমাদের আদেশ দেন নিজেদের জীবিত সন্তানকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিতে বা ইব্রাহিম (আ.)-এর মতো সন্তানকে কুরবানি করতে, তাহলে আমরা কী করতাম? তখন আমাদের সকলকে নিজ সন্তানকে কুরবানি করতে হতো। কারণ এটাই বিধান। আমাদেরকে সেটাই আদায় করার চেষ্টা করতে হতো।
আমরা এই সকল বিষয় জানি, কিন্তু মানি না। আমরা নিজেদের তাঁর হাতে সোপর্দ করি না। তিনিই তো প্রকৃত সকল ক্ষমতার মালিক।
ভুল থেকে বাঁচা খুবই সহজ। ভুল হয়ে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসাও সহজ। এটাকে তাওবা বলে। তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসা যায়। আমরা নিজেকে চিনতে পারিনি। আমরা যদি নিজেকেই চিনতে না পারি, তাহলে আমাদের রবকেও চিনতে পারবো না।
আজ আমরা তাঁর ঘরে, কেবল তাঁর জন্যই একত্রিত হয়েছি। এখন আমরা কী চাই? আমাদের কী করা উচিত, কখনো ভেবেছেন? কখনো এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি? হ্যাঁ, আমরা খুঁজেছি, কিন্তু অর্ধেক রাস্তা গিয়ে পথ ভুলে গেছি। আমাদের গন্তব্য ছিল সিলেট, কিন্তু আমরা রেলস্টেশনে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছি।
আপনারা কি আমার কথা বুঝতে পারছেন? কথা বুঝতে পারাটা কোনো বড় ব্যাপার নয়, বিষয় ও মর্ম বুঝতে পারাটাই বড় কথা।
হযরত ওমর রা. বলতেন—হায়, আমি যদি বৃক্ষ হতাম! তবে তো আমার হিসাব দিতে হতো না। হায়, আমি যদি পাথর হয়ে যেতাম! তিনি এতটা কান্না করতেন যে, চোখের পানির কারনে চেহারায় দাগ হয়ে যেত। তিনি এক ব্যাক্তিকে শুধু এই কারনেই নিয়োগ করেছিলেন সে যেন প্রতিদিন তাঁকে মৃত্যুর কথা স্মরন করিয়ে দেয়।
বন্ধুগণ, সবাই আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে জানে। সবাই কিছু না কিছু জানে। কোনো মানুষ এমন নেই যে কিছুই জানে না। প্রতিদিন কারো না কারো মৃত্যুর খবর তার কানে আসে। প্রতিদিন তার সামনে দিয়ে জানাযার খাটিয়া অতিক্রম করে। এসব কিছু দেখেও তার খেয়ালে কিছু আসে না? জানাযা দেখে কয়জন মৃত্যুর কথা চিন্তা করে? আজকে তার মৃত্যু হয়েছে, কাল আমার মৃত্যু হবে। কাল খাটিয়ায় চড়ে আমার লাশ যাবে, নাকি আজ যাবে, নাকি কিছুক্ষণ পরেই যাবে? কোনো কিছুই আমাদের জানা নেই। কোনো যুবকের সেই খবর নেই। কোনো বৃদ্ধও জানে না নিশ্চিত করে মৃত্যু কবে আসবে? আমাদের জিন্দেগীর সময়সীমা কতদিন?
আমাদের কোনো ক্ষমতাই নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই পূর্ন ক্ষমতার অধীকারী। একদিকে তিনি, আরেক দিকে আমরা। আমরা এও জানি যে, সব ইচ্ছা তারই অধীনে। আমাদের এটাও জানা আছে যে, যদি আমরা তাকে মানি ও বিশ্বাস করি, মুখ দিয়ে নয়। মুখ দিয়ে মানা তো সবচেয়ে সহজ কাজ। ’আমি তো মানি আল্লাহ এক। তিনিই মালিক। তিনিই সৃষ্টিকারী।’—এই কথা মুখ দিয়ে বলে দেয়া অনেক সহজ। কোনো মুসলমানকে জিজ্ঞেস করুন, খুব সহজেই এসব কথা বলে দিবে। আমি কোনো নতুন কথা বলছি না। সবই আপনাদের জানা আছে। কতটুকু মানি এটাকে পরিমাপ করতে হবে। পরিমাপ করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। কেউ জানে না আগামী রমজান পাবে কি পাবে না। পরিমাপ করতে হবে আমরা কোথায় আছি? আমাদের কী অর্জন করতে হবে আর বর্তমানে কোথায় আছি?
আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে নিজেকে চেনার জন্য। ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এই ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে আগে নিজেকে চিনতে হবে। তার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
একটা কথা মনে রাখবেন, কেউ যদি মনে করে সে একদম নিষ্পাপ। কখনই তার দ্বারা গুনাহের কাজ সংগঠিত হয় না। তাহলে সে যেন তার অন্তর থেকে এই ভুল ধারণা ঝেড়ে ফেলে। একমাত্র আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামই মাসুম ছিলেন। তাঁরা ব্যতীত প্রতিটি মানুষ গুনাহ করে। কিছু মানুষকে ভুলের দিকে দৃষ্টিপাত করে না। তারা ভুল খুঁজে পায় না। দিনের পর দিন ভুলের পর ভুল করে কাটিয়ে দেয়। আর কিছু মানুষ আছেন, যারা ভুল করলে সেখানেই থেমে যান। সেই ভুল পুনরায় না করার চেষ্টা করেন। পুরানো ভুলের জন্য তাওবা করেন। পুনারায় সঠিক রাস্তায় ফিরে আসে।
এই দুই ধরনের লোক আছে। প্রথম ধরনের লোক ভুল করে বুঝতে পারে না সে ভুল করেছে। সে সেখানেই থেমে যায় না। আরেক ধরণের লোক আছে যারা সতর্ক। তারা নিজেদের অন্তরকে চেনার চেষ্টা করে। এই চেষ্টাকে অথবা এই চেতনাকে জাগাতে কিছু কাজ করার দরকার পড়ে। কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। এই চেতনাকে যেন জাগানো যায়, এবং চেতনা যেন সর্বদা জাগরুক থাকে।
আরো পড়ুন:
ঈমান না থাকলে মানুষ হয়ে জন্মানোই বৃথা: মাওলানা মাহমুদ মাদানী
তওবা, ক্ষমা ও গিবত বিষয়ক মনোমুগ্ধকর বয়ানে মাওলানা মাহমুদ মাদানী
ভুল থেকে বাঁচা খুবই সহজ। ভুল হয়ে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসাও সহজ। এটাকে তাওবা বলে। তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসা যায়। আমরা নিজেকে চিনতে পারিনি। আমরা যদি নিজেকেই চিনতে না পারি, তাহলে আমাদের রবকেও চিনতে পারবো না। যে নিজের অন্তরকে চিনলো সে যেন তার স্রষ্টাকেই চিনলো। তালাশের এই পথ এতো কঠিন নয়। এখন থেকে তালাশ শুরু করুন। আপনার তালাশে আপনি ব্যর্থ হবেন না। আপনি আপনার নিজেকে খুঁজুন। নিজেকে না খুঁজলে আপনি হারিয়ে যাবেন। আপনার মনে হবে, আপনি অনেক কিছু করে ফেলেছেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। যদি আপনি নিজেকেই বুঝতে না পারেন, তাহলে কীভাবে বুঝবেন কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ?
আল্লাহ তাআলা তাঁর যতটা শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে এই দুনিয়াকে সাজিয়েছেন ও তাঁরই ইচ্ছায় আমাদেরকে ঈমানের নিয়ামত দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমাদের নিজেকে চেনার জন্য ঠিক সে ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চেষ্টা করলে আমরা সফল হবো, চেষ্টা না করলে তিনি তো অমুখাপেক্ষেী। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে নিজেকে চেনার জন্য। ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এই ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে আগে নিজেকে চিনতে হবে। তার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই আল্লাহ তাআলার সাহায্য আসবে। এটা একটা যাত্রা। এই যাত্রার ব্যাপারে আগামীকাল কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।
অনুবাদ ও শ্রুতিলিখন:
রাশেদ হাসান ও নাইম ইসলাম,
সহকারী সম্পাদক, পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম


