ইসরাইলের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক

ইসরাইলের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : গাজা ভূখণ্ড নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নতুন পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি সভা ডেকেছে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় রোববার এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। শুক্রবার ইসরাইলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় গাজা দখলের বিষয়ে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার অনুমোদন দেয়া হয়। এ অনুমোদনের পর জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জোট এর নিন্দা জানায়। বুয়েনস আইরেস থেকে লন্ডন এবং ইস্তাম্বুল পর্যন্ত বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয়েছে। বিশ্ব নেতাদের গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। ইসরাইলের তেল আবিবেও শনিবার রাতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নতুন গাজা পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। তারা প্রায় দুই বছর ধরে চলমান যুদ্ধ অবসান ও অবিলম্বে বন্দীদের মুক্তির দাবি তোলেন।

শুক্রবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছিল, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা সিটি দখলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমত তীব্রভাবে বিভক্ত এবং সামরিক বাহিনী সতর্ক করেছে যে, এ পদক্ষেপ জিম্মিদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গাজায় বন্দী ওমরি মিরানের স্ত্রী বলেন, এটি শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানান।

আলজাজিরা ও ডয়চে ভেলে জানায়, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি, অস্ট্রিয়া, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক যৌথ বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর এই পরিকল্পনাকে বাতিল করে দেয়া হয়। এমন পরিকল্পনা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবন খারাপ করে তুলবে বলে আশঙ্কা করে এর নিন্দা জানান জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এই পরিকল্পকনাকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সদস্য, ফ্রান্স, সেøাভেনিয়া, ডেনমার্ক, গ্রিস ও ব্রিটেন নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানায়।

ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ছাড়াল ৬১,৩৬৯

গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক হামলা থামার কোনো লক্ষণ নেই। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৬১ হাজার ৩৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আহত হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫০ জনের বেশি মানুষ। এ সময়ে গাজায় নতুন করে অনাহারে মারা গেছে অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি।

এক বিবৃতিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গাজার বিভিন্ন হাসপাতাল আরো ৩৯ জনের লাশ নিয়েছে। একই সময়ে ইসরাইলি হামলায় আরো ৪৯১ জন আহত হয়েছে। এখনো অসংখ্য লাশ ধ্বংসস্তূপের নিচে ও রাস্তায় পড়ে রয়েছে, কিন্তু অব্যাহত হামলার কারণে উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছতে পারছেন না।

এ ছাড়া মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে আরো অন্তত ২১ জন নিহত ও ৩৪১ জন আহত হয়েছেন। চলতি বছরের ২৭ মে থেকে এ পর্যন্ত সহায়তা নিতে গিয়ে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৩ জনে এবং আহত হয়েছে ১২ হাজার ৫৯০ জনের বেশি।

এ দিকে গাজায় দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিজনিত মৃত্যুও দ্রুত বাড়ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনাহারে আরও ১১ জন মারা গেছে, যাদের মধ্যে কয়েকটি শিশু। এ নিয়ে দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২১২ জনে, এর মধ্যে ৯৮ জন শিশু। অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে। কারণ, ইসরাইল মে মাসের শেষের দিকে আংশিক অবরোধ শিথিল করলেও ত্রাণ প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে। উত্তর গাজার আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া সতর্ক করে বলেন, শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, অপুষ্টি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মৃত্যু ডেকে আনে।

মার্চের ১৮ তারিখ থেকে ইসরাইলি সেনারা নতুন করে গাজায় হামলা শুরু করে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৮৬২ জন নিহত এবং ৪০ হাজার ৮০৯ জন আহত হয়েছে। এতে জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তি কার্যত ভেঙে গেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এ ছাড়া গণহত্যার দায়ে ইসরাইল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলার মুখোমুখি হচ্ছে।

বিমান থেকে ফেলা ত্রাণের বাক্সের নিচে চাপা পড়ে কিশোর নিহত

আলজাজিরা জানায়, গাজা উপত্যকায় উড়োজাহাজ থেকে ফেলা ত্রাণ বোঝাই বাক্সের নিচে চাপা পড়ে ১৫ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার গাজার নেতজারিম করিডোরের কাছে এ ঘটনা ঘটে। ওই কিশোরের নাম মুহান্নাদ জাকারিয়া ঈদ। গাজা উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহর দখল করতে ইসরাইলের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা চলার মধ্যে এ ঘটনা ঘটল।

গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় বিমান থেকে ফেলা ত্রাণের বাক্সের আঘাতে কমপক্ষে ২৩ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন এবং ১২৪ জন আহত হয়েছেন। ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজার নেতজারিম করিডোরের কাছে কিশোর ঈদের চারপাশে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে আছেন। কেউ কেউ ছেলেটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। তার মুখ রক্তাক্ত ছিল। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে আলজাজিরা। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই কিশোরের ভাই তাকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তার বাবা নুসাইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে তার লাশ আঁকড়ে ধরে আছেন।

রয়টার্সকে ঈদের ভাই বলেন, তার ভাই ত্রাণ নিতে গিয়েছিল। বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা হচ্ছিল। ওই সময় একটি বাক্স সরাসরি তার ভাইয়ের ওপর পড়লে তার মৃত্যু হয়। ঈদের ভাই আরও বলেন, ‘তারা (যে দেশগুলো সাহায্য পাঠাচ্ছে) সীমান্ত দিয়ে সরাসরি সাহায্য দিতে পারছে না। তারা ওপর থেকে ত্রাণের বোঝা ফেলছে। এতে আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে।’ জাতিসঙ্ঘ বারবার বলেছে, বিমান থেকে ত্রাণ ফেলাটা বিপজ্জনক। এগুলো কার্যকরও নয় এবং এতে খরচও বেশি। গাজায় স্থলসীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে দেয়ার জন্য বারবার ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে জাতিসঙ্ঘ।

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব

অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে শনিবার ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের দফায় দফায় হামলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেনা অভিযানে দুই ফিলিস্তিনি কিশোরকে আটক করা হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক ও তাদের সহায়-সম্পত্তির ওপর হামলা চালিয়েছে বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনীর একটি দল নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা শহরে ব্যাপক গোলাবর্ষণের পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে ছুড়তে প্রবেশ করে। পরে দুই ভাইকে আটক করে তারা এলাকাটি ত্যাগ করে। মধ্য পশ্চিম তীরে, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের উত্তরে কালান্দিয়া শরণার্থী শিবির এবং কাফর আকাব শহরেও অভিযান চালায় ইসরাইলি বাহিনী। সেখানে তাদের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হেবরনের পুরনো শহরে কয়েক ডজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী মিছিল বের করলে ইসরাইলি সেনারা সেখানকার দোকান মালিকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের হেবরন চুক্তি অনুসারে, ইব্রাহিমি মসজিদসহ হেবরনের পুরনো শহরটি ইসরাইলের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ওয়াফার খবর অনুসারে, বেথলেহেমের দক্ষিণে খালেট আল-নাহলেহ এলাকায় তিন ফিলিস্তিনি কৃষকের ওপর নৃশংস হামলা চালায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, বসতি সম্প্রসারণের জন্য কৃষি জমি দখলের উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় তারা বারবার হামলা চালাচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উত্তর জর্দান উপত্যকার খিরবেত সামরার বেদুইন সম্প্রদায়ের এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সশস্ত্র অবস্থায় ঘুরতে দেখা গেছে। ‘বেদুইন অধিকার রক্ষা সংস্থা আল-বায়দার’ জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা আল-হিম্মা এলাকার একটি ঝর্ণায় হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের তাদের পশুপালকে পানি পান করাতে বাধা দেয়। এমনকি, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে তারা তাঁবুর কাছে মৃত পশু ফেলে রেখে যায়।

মানবাধিকার সংস্থাটি আরো জানায়, মধ্য পশ্চিম তীরের রামাল্লার পশ্চিমে অবস্থিত আইন আইয়ুব গ্রামের বেদুইনদের তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেয় বসতি স্থাপনকারীরা, এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ছাড়া, রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আল-খালায়েল এলাকার কাবনেহ বেদুইন সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও জমি ছেড়ে দেয়ার জন্য দুই সপ্তাহের চরমপত্র দিয়েছে হামলাকারীরা। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হাতে কমপক্ষে এক হাজার ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং সাত হাজারজনের বেশি আহত হয়েছেন।

Related Articles