- তামীমুল ইসলাম ফরিদী
রাত পোহালেই বহুল আলোচিত-সমালোচিত (আমার ভাষায় বহুল আকাংখিত ও প্রত্যাশিত) স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তব শুভ উদ্বোধন। এ সেতুর উদ্বোধনের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে দেশের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জেলায় যাতায়াতের নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে আশাবাদী আমি। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক কাঠামোতে।
এ মেগা প্রকল্পের ফলে পদ্মার ওপর দিয়ে ছুটবে গাড়ি, কিছু বিরতির পর হয়তো চলবে ট্রেন ও। এতদিন এই সেতুর অভাবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ কতটা দুর্দশার মধ্যে ছিল আসলে শুধুমাত্র বিরোধিতার জন্য বিরোধিতাকারী জনগোষ্ঠীকে বুঝানো সম্ভব নয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু কতটা জরুরি ছিল সেটা ওই পথে চলাচলের অভিজ্ঞতা ছাড়া আসলে বোঝা অসম্ভব। প্রথমে দুটি ঈদের কথাই ধরুন! কী পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয় তাতো গোটা দেশের মানুষই নিউজে দেখতে পায় । জীবন বাজি রেখে কতটা কষ্ট করে মানুষ নদী পার হয়।
আর শীতকালে যে কী অবস্থা হয়, সেটা কেবল তারাই বলতে পারবে যাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার ওপরে আবার নানা সময়ে নিম্নচাপ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে তো কোন কথাই নেই, সারা রাত ফেরি বন্ধ। আহ ফেরিঘাটে আটকে পড়া আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের সে কী বিভৎস দৃশ্য। মনে করতেই গা শিউরে ওঠে।
বছর জুড়ে নানা সময়ে গাড়ির সিরিয়াল যখন শুরু হয়, বিকেল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ঘাটে বসে থাকতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। শতশত মালবাহী ট্রাক থাকে অপেক্ষায়, কাঁচামাল তো ঘাটেই পচে যায়, আর এসবই নিত্যদিনের ঘটনা। এরপর যদি নদীর স্রোতে ঘাট ভেঙে যায়, যন্ত্রণা তখন আরও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার হয়, যখন কোনো মুমূর্ষু রোগী নদী পার হওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে। প্রতিটি মিনিট তখন মনে হয় একেকটা দিন। আটকে পড়া পরিবার তখন কতটা অসহায় থাকে, কেউ ওই অবস্থায় না পড়লে বোঝা দায়। ঘাটেই রোগী মারা গেছে, ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানো যায়নি, এ রকম উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে। প্লেনে বা হেলিকপ্টারে রোগী আনার সামর্থ্য কজনেরই বা আছে? তাই পদ্মা বহুমুখী সেতুকে কেবল কংক্রিট, রড আর সিমেন্টের নির্মাণ কাঠামোতে সীমাবদ্ধ করলে এই মহত প্রকল্পের অবমাননা করা হবে বলেই আমি মনে করি।
যন্ত্রণার দিনগুলো শেষ হতে চলছে আজ রাত পোহানোর পর। অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে। কোটি কোটি মানুষের কাছে এটা অনেক বড় কিছু। অনেকে কখনও কল্পনাও করতে পারেননি, নিজের জীবদ্দশায় পদ্মার ওপর সেতু দেখতে পাবেন। তাই আমি বলবো পদ্মা বহুমুখী সেতু অলীক ধুসরতাকে ছাপিয়ে বাস্তবে রূপ নেয়া এক পরম আবেগ-অনুভূতির প্রতিশব্দ। যুগ-যুগান্তরে চলে আসা এসব সমস্যার সমাধান তো এখন হবেই, পাশাপাশি এই অঞ্চলে এখন শিল্প-কল কারখানা গড়ে উঠবে, বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে। গোটা দক্ষিণাঞ্চলের চেহারা বদলে যাবে ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখিত এসব সংকট সমাধানে একমাত্র ম্যাজিক হলো পদ্মা বহুমুখী সেতু।
সকল প্রকার নেতিবাচক কর্মকান্ড, বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে যার অকৃত্রিম ইচ্ছা, সৎ সাহস ও অদম্য স্পৃহায় আলোর মুখ দেখছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, তিনি আর কেউ নন তিনিই হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। দক্ষিনাঞ্চলের একজন অধিবাসী হিসেবে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভ কামনা।
সেই সাথে রাব্বেকারীমের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি ঐ মহৎ মানুষটির জন্য, যিনি কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে একচ্ছত্র ভূমিকা রেখেছেন। আল্লাহ পাক যেন কাল কেয়ামতের ময়দানে কঠিন মুসিবতের সময় পুলসিরাত কে পাড়ি দেয়া তাঁর জন্য সহজ করে দেন, আমীন।
লেখক: শিক্ষক ও ইসলামী আলোচক


