লাহোরে মারকাজ প্রতিষ্ঠিত করতেই তাবলীগে বিভক্তি

লাহোরে মারকাজ প্রতিষ্ঠিত করতেই তাবলীগে বিভক্তি

পাথেয় রিপোর্ট : দিল্লি ও লাহোরের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে তাবলিগ জামাত। এই বিভক্তি অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশের দ্বন্দ্বে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের বড় অংশ যুক্ত হয়েছে। তারা একটি পক্ষকে সমর্থন দেওয়ায় সহজে এ বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না বলে মনে করছেন তাবলিগ জামাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢাকায় তাবলিগের দুই পক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাবলিগের বর্তমান আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দ্বন্দ্বের শুরু। ২০১৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের লাহোরের রাইবেন্ডে ইজতেমা চলার সময় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্যের একটি ‘আলমি শুরা’ গঠনের প্রস্তাব আসে। সাদ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তারপরও ইজতেমা শেষে রাইবেন্ড থেকে শুরা বোর্ড গঠনের একটি চিঠি বিভিন্ন দেশে তাবলিগের দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর এক পক্ষ সাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং আরেক পক্ষ আলমি শুরা গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
জানা যায়, তাবলিগের এই বিভক্তির জেরে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ ও মারামারি হয় ২০১৬ সালের ১৯ জুন দিল্লিতে সংগঠনটির মূল কেন্দ্র বা মারকাজে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় যুক্তরাজ্যেও, লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ মারকাজটি দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেয়।

মাওলানা সাদকে নিয়ে বাংলাদেশে বিভেদ প্রকাশ্যভাবে দেখা দেয় গত জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা থেকে। তাবলিগ জামাতের যে অংশটি সাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। প্রবল বিরোধিতার কারণে ইজতেমায় অংশ নিতে পারেননি মাওলানা সাদ। তখন মাওলানা সাদ ও তাঁর অনুসারীরা কাকরাইলে তাবলিগের প্রধান কেন্দ্র বা মারকাজে অবস্থান নেন। এরপর থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ছাত্রদের নিয়ে এসে কাকরাইলের মারকাজের নিয়ন্ত্রণ নেন মাওলানা সাদবিরোধীরা। পরদিন কয়েক হাজার মাওলানা সাদপন্থী কাকরাইলে উপস্থিত হলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

মাওলানা সাদবিরোধীদের কওমি মাদ্রাসার সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বলেন, তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং তিনি এখানকার আলেমদের পরামর্শ নিয়েই তাবলিগ পরিচালনা করতেন। মাওলানা সাদের বক্তব্যের বিষয়ে দেওবন্দের আলেমরা আপত্তি জানিয়েছেন। এ বিষয়টিই বাংলাদেশের আলেমদের এই বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলেছে।

এর সমাধান কী, এই প্রশ্নের জবাবে বেফাকের মহাসচিব বলেন, এ অবস্থায় মাওলানা সাদের নেতৃত্বে তাবলিগ আর পরিচালিত হতে পারে না।
দিল্লির মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) ১৯১০ সালে তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন। এর মূল মারকাজ দিল্লির হজরত নিজামউদ্দিনে অবস্থিত বেঙ্গলওয়ালি মসজিদে। ঢাকার কাকরাইল ও লাহোরের রাইবেন্ডের মারকাজ হলো শাখা মারকাজ। এই দুই স্থানে প্রতিবছর ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। কেবল বাংলাদেশের ইজতেমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলিগের অনুসারীরা যোগ দেন।
বাংলাদেশে তাবলিগের কার্যক্রম পরিচালনা করেন ১১ জন শুরা সদস্য। এর মধ্যে কাকরাইল মসজিদের খতিব, পার্শ্ববর্তী উলুমে দীনিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মুহাম্মাদ জুবায়েরসহ পাঁচজন মাওলানা সাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অবশ্য বশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা জুবায়েরও মাওলানা সাদের পক্ষে ছিলেন। কিছু আগে তিনি পাকিস্তান সফর করেছেন। পাকিস্তান সফরের পর থেকেই দিল্লী নিজামুদ্দীন মারকাজের বিরুদ্ধে রুখের দাঁড়িয়েছেন। পাকিস্তান থেকে পরিচালিত শূরার অনুসরণ শুরু করেছেন। মাওলানা সাদের পক্ষে রয়েছেন আরেক শুরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফ ইসলামের নেতৃত্বে বাকি ছয়জন। তাবলিগের এই বিরোধ নিয়ে কথা বলতে দুই পক্ষের সাতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনজন কথা বলেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে।

মাওলানা সাদবিরোধী একজন শুরা সদস্য বলেন, মাওলানা সাদ বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এর বিরুদ্ধে ভারতের দেওবন্দের আলেমরা অবস্থান নেন এবং এ জন্য মাওলানা সাদকে ক্ষমা চাইতে বলেন।

এদিকে মাওলানা সাদের অনুসারীরা বলছেন, মাওলানা সাদ তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু বিরোধিরা বিরোধিতার জন্যই তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকায় মাওলানা সাদবিরোধী শুরা সদস্যদের একজন বলেন, মাওলানা সাদ কেবল হজরত মুসা (আ.)-কে নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু এ রকম আরও অন্তত ৮৫টি মন্তব্য তিনি করেছেন, যার জন্য ক্ষমা চাননি।

অন্যদিকে সাদপন্থী শুরা সদস্যরা বলছেন, মাওলানা সাদের বক্তব্য মুখ্য বিষয় নয়। তাবলিগের নিয়ন্ত্রণ দিল্লির মারকাজ থেকে সরিয়ে রাইবেন্ডে নিয়ে যাওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য। মাওলানা সাদ প্রায় ২২ বছর ধরে ইজতেমায় বক্তব্য দিচ্ছেন। এত দিন কোনো আপত্তি ছিল না। নেতৃত্ব নিয়ে লাহোরের রাইবেন্ডের অবস্থানের পরপরই তাঁর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দেওবন্দী আলেম বলেন, বাংলাদেশের কিছু আলেম পাকিস্তানে পড়াশোনা করে এসে সবক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানেরই অনুসরণ করেনে। পাকিস্তানকে রাজনৈতিক গুরু যেমন মানেন তেমনি ধর্মীয় ক্ষেত্রে তবলীগের মারকাজ বানানোর ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন।

তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভীর (রহ.) মৃত্যুর পর থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরাই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইলিয়াসের (রহ.) মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ আমির হন। বংশপরম্পরায় বিভিন্ন ব্যক্তির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় আমিরের দায়িত্বে আছেন মাওলানা সাদ।

একজন বর্ষীয়ান আলেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৪৭-এর পর দেশ ভাগের পর থেকেই পাকিস্তানীরা তাবলীগের মারকাজকে সরানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল। সে আলোকেই রায়বেন্ডে তারা জায়গা ক্রয় করে রেখেছিল।

আজকের সব চক্রান্ত ৪৭-এর মাথা ব্যথা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

দেশের একশ্রেণির আলেমগণ মাওলানা সাদের বিরোধিতা করে আলেমদের নেতৃত্বের কথা বল্লেও কার্যত মসজিদগুলোতে সাধারণদের হাতেই তাবলীগের নেতৃত্ব আছে বলে জানা যায়। রাজধানীর বেশকটির মসজিদ ঘুরে এসে প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন গত সপ্তাহে মসজিদগুলোতে যারা তালীম করেছেন তারা বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। বেশিরভাগ মসজিদের জিম্মাদারও সাধারণ মানুষ। অনেকে দাবি করে বলেছেন, আলেমগণ এগিয়ে এলে দেশে তাবলীগের কাজে আরও বেশি গতি আসতো।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মারকাজে একজন সিনিয়র আলেম সাপ্তাহিক বয়ান করলেও কীভাবে তাশকিল করতে হবে তিনি জানেন না। পরে অন্য আরেকজনকে ডেকে তিনি বয়ানের আসন থেকে উঠে যান।
সূত্র : জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত কলাম, খবর ও সরাসরি কথা বলে রচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *